হায়েজ ও নামাজ নিয়ে বিস্তারিত ফিকহি উত্তর—টিস্যু দিয়ে চেক করা রক্ত হায়েজ হবে কি না, হলুদ স্রাব (সফরা) ও ৭ম দিনে অল্প রক্তের হুকুম কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২। এরপর ৩ দিনে আমি দেখি হলুদ হলুদ স্রাব আর বেশি ভিতরে চাপ দিলে টিস্যু দিয়ে দেখলে রক্ত হায়েজের পরে আমি নামায পড়ছি এরপর এর ১ দিন পরে আমি দেখি হায়েজের রক্ত আসছিল তবে তা মোটামোটি ভিতরে টিস্যু দিয়ে দেখলে। এটা কি হায়েজ? আমি নামায চালিয়ে যাচ্ছি এখনো।
৩। আমার সাধারণত ৯/১০ দিনই হায়েজ থাকে আজ ৭ম দিন আজ অনেকটা ভিতরে টিস্যু দিয়ে দেখি হায়েজের রক্ত আর আবার তুল দিয়ে রেখেছিলাম তখনো দেখেছি হায়েজের রক্ত তবে এক ছোট টুকরা খুব সামান্য। এখন কি আমি হায়েজ ধরব আমার নাকি নামাজ পড়ব?
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রথমে একটি মৌলিক বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: হায়েজ নির্ণয়ের মূল মানদণ্ড হলো রক্ত বা স্রাবের স্বাভাবিক প্রবাহ (নিজে থেকে বের হওয়া), টিস্যু বা তুলা ঢুকিয়ে ভেতর থেকে টেনে বের করা নয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী, লজ্জাস্থানের ভেতরে প্রবেশ করানো বস্তুতে (টিস্যু/তুলা) যে রক্ত লেগে আসে, তা যদি নিজে থেকে প্রবাহিত না হয়, তবে তা হায়েজ হিসেবে গণ্য হয় না; বরং তা সাধারণ স্রাব বা ভেতরের আর্দ্রতা হিসেবে বিবেচিত হয়। এ কারণেই ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন—রক্ত বের হওয়ার ক্ষেত্রে "خروج" (বহির্গমন) শর্ত, শুধু ভেতরে উপস্থিতি নয়।
১. টিস্যু/তুলা দিয়ে চেক করার পর রক্ত দেখা গেলে তা হায়েজ গণ্য হবে কি, নাকি গড়িয়ে পড়া শর্ত?
উত্তর: এটি হায়েজ বলেই গণ্য হবে।
- শরঈ বিধান: ফিকহে হানাফী অনুযায়ী হায়েজ সাব্যস্ত হওয়ার জন্য রক্ত শরীর থেকে নিচ দিকে গড়িয়ে পড়া শর্ত নয়। বরং রক্তের অংশ বিশেষ যোনির বহিরাংশে (ফারজে খারেজ) পৌঁছানো বা সেখানে রাখা টিস্যু/তুলা/কুরসুফ-এ রক্তের চিহ্ন বা দাগ লেগে প্রকাশ পাওয়াই রক্ত বের হওয়ার (খুরূজ) জন্য যথেষ্ট।
- করণীয়: আপনি যখন আপনার হায়েজের নির্ধারিত তারিখে টিস্যু দিয়ে চেক করে রক্ত দেখেছেন, তখন থেকেই আপনাকে ঋতুবতী (হায়েজগ্রস্ত) হিসেবে গণ্য করা হবে।
কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১১৩ (অধ্যায়: তাহারাত, ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদ: 'মহিলাদের রক্তসমূহের বিবরণ', ১ম অনুচ্ছেদ: 'হায়েযের বিবরণ' — "হায়েযের অবস্থায় রক্ত প্রবাহিত (বা গড়িয়ে পড়া) শর্ত নয়।")
- নূরুল ঈযাহ: বাংলা সংস্করণ, পৃষ্ঠা: ৮৮–৮৯ (পরিচ্ছেদ: 'হায়েয, নেফাস ও ইস্তেহাযা')
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৯৯–২০০
২. হলুদ স্রাব ও মাঝে রক্ত দেখা গেলে নামায পড়ার হুকুম:
উত্তর: হায়েজের দিনগুলোতে দেখা যাওয়া হলুদ স্রাব এবং ১ দিন পর দেখা যাওয়া রক্ত—এগুলো সবই হায়েজের অন্তর্ভুক্ত। তাই এ সময়ে আপনার নামায পড়া সঠিক হয়নি।
- শরঈ বিধান:
- হানাফী ফিকহ অনুযায়ী হায়েজের মেয়াদের ভেতরে দেখা যাওয়া ৬টি রঙের স্রাবই হায়েজ গণ্য হয় (যথা: লাল, কালো, হলুদ, সবুজ, মাটি বর্ণ ও ধূসর বর্ণ)। অতএব, পিরিয়ডের দিনগুলোতে নির্গত হলুদ স্রাবও হায়েজের রক্ত হিসেবেই বিবেচিত।
- হায়েজের মেয়াদের ভেতরে (সর্বোচ্চ ১০ দিনের মধ্যে) রক্ত আসা, বন্ধ হওয়া এবং আবার লাল বা হলুদ স্রাব আসা—এই পুরো সময়টাই হায়েজের অন্তর্ভুক্ত।
- করণীয়: উক্ত দিনগুলোতে যে নামাযগুলো আপনি ভুলবশত পড়ে ফেলেছেন, সেগুলোর জন্য আল্লাহর কাছে তাওবা-ইস্তিগফার করবেন। হায়েজ অবস্থায় পড়া সেই নামাযগুলোর পরবর্তীতে কোনো কাযা পড়তে হবে না (কারণ হায়েজের দিনের নামাযের কাযা নেই)।
কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১১৩–১১৪ (অধ্যায়: তাহারাত, ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদ — "হায়েযের রক্ত ছয় রঙের যেকোনো এক রঙ বিশিষ্ট হওয়া আবশ্যক... যেমন: লাল, হলুদ, মাটি বর্ণ ইত্যাদি।")
- নূরুল ঈযাহ: বাংলা সংস্করণ, পৃষ্ঠা: ৮৮–৮৯
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৯৯–২০০
৩. ৭ম দিনে খুব সামান্য হলেও রক্ত/টিস্যুতে রক্ত দেখা গেলে করণীয় (অভ্যাস ৯/১০ দিন হলে):
উত্তর: আপনাকে অবশ্যই হায়েজ ধরতে হবে এবং নামায পড়া বন্ধ রাখতে হবে।
- শরঈ বিধান:
- আপনার সাধারণ অভ্যাস (আদাত) হলো ৯ বা ১০ দিন। আজকে যেহেতু আপনার পিরিয়ডের মাত্র ৭ম দিন, যা আপনার স্বাভাবিক অভ্যাসের দিনগুলোর ভেতরেই অবস্থিত এবং হায়েজের সর্বোচ্চ সময়সীমা ১০ দিনের ভেতরে।
- এই ৭ম দিনে টিস্যু বা তুলায় যে সামান্য পরিমাণ বা টুকরা রক্ত দেখেছেন, তা স্পষ্ট হায়েজের রক্ত।
- করণীয়: এখন আপনি নামায পড়া ও রোযা রাখা বন্ধ রাখবেন। রক্ত বা স্রাব পুরোপুরি বন্ধ হয়ে সাদা স্বাভাবিক স্রাব দেখা যাওয়া পর্যন্ত (বা আপনার অভ্যাস ৯/১০ দিন পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত) অপেক্ষা করবেন। এরপর গোসল করে পবিত্র হয়ে নামায শুরু করবেন।
কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১১৩–১১৪ (অধ্যায়: তাহারাত, ১ম অনুচ্ছেদ — "আদাত (অভ্যাস) অনুযায়ী দিন অতিবাহিত হওয়া এবং হায়েযের মেয়াদের ভেতরে দেখা যাওয়া রক্ত হায়েয হিসেবেই নির্ধারিত হবে।")
- নূরুল ঈযাহ: বাংলা সংস্করণ, পৃষ্ঠা: ৮৮–৮৯
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া: ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৯৯
واللہ أعلم بالصواب।