ব্যাংকে সুদ পরিশোধের পর মোটরের পানি ব্যবহার করা যাবে কি না?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নের সারমর্ম: মোটর বসাতে প্রায় ৪০ হাজার টাকা ঋণ করতে হয়েছে। মা ব্যাংক থেকে ৪ হাজার টাকা সুদ (সুদ/রিবা) দিয়ে দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো—এই মোটরের পানি ব্যবহার করা যাবে কি না, এবং সুদের টাকা পরিশোধের বিধান কী?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: মোটরের পানি ব্যবহার করা যাবে; মোটরটি নিজেই হারাম হয়ে যায় না। তবে ব্যাংকে প্রদত্ত ৪ হাজার টাকা সুদ হিসেবে দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ। সুদ দেওয়া-নেওয়া উভয়ই কুরআন-হাদিসে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তবে বাধ্যবাধকতা বা ভয়ের কারণে সুদ পরিশোধ করা হলে তা গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নয়; বরং সুদগ্রহীতার কাছে ফেরত দেওয়া ছাড়া উপায় না থাকলে তা দেওয়া জায়েজ, কিন্তু সুদ নেওয়া বা সুদী চুক্তি করা কখনো জায়েজ নয়।
১. সুদের বিধান (কুরআন ও হাদিস)
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا “আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (সূরা বাকারা: ২৭৫)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ “হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।” (সূরা বাকারা: ২৭৮)
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদদাতা, সুদগ্রহীতা, লেখক ও সাক্ষী—সবাইকে লানত করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৫৯৮; মুসনাদে আহমাদ)
হযরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ، وَقَالَ: هُمْ سَوَاءٌ “রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক ও তার দুই সাক্ষীকে লানত করেছেন এবং বলেছেন, তারা সবাই সমান (গুনাহে)।” (সহিহ মুসলিম: ১৫৯৮)
হানাফি ফিকহের বক্তব্য: ইমাম কাসানি (রহ.) «বাদায়েউস সানায়ে»-তে এবং ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ সুদকে ‘হারামে কাতয়ি’ (নিশ্চিত হারাম) বলেছেন। সুদ দেওয়া-নেওয়া, সুদী চুক্তি করা, সুদের হিসাব লেখা—সবই গুনাহ। (রাদ্দুল মুহতার: ৫/১৬৬-১৭০; বাদায়েউস সানায়ে: ৫/১৮৩)
২. মোটরের পানি ব্যবহারের বিধান
মোটরটি যদি হালাল উপায়ে কেনা হয় এবং শুধু তার মূল্য পরিশোধে সুদ দেওয়া হয়, তাহলে মোটরটি নিজে হারাম হয় না। কারণ হারাম হলো সুদের লেনদেন, মোটরের বস্তু নয়। সুতরাং মোটরের পানি ব্যবহার করা জায়েজ। তবে সুদের টাকা পরিশোধ করা গুনাহ, এর জন্য তাওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে সুদী লেনদেন থেকে বিরত থাকতে হবে।
তবে সতর্কতা: যদি ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণই সুদী ঋণ হয় (অর্থাৎ ব্যাংক সুদসহ টাকা নেয়), তাহলে ওই ঋণ নেওয়া নিজেই গুনাহ। কিন্তু মোটরটি হালাল কাজে ব্যবহার করলে এবং তার পানি ব্যবহার করলে তা হারাম হবে না। হানাফি ফিকহে ‘হারাম মাল দিয়ে কেনা বস্তু’র বিধান আলাদা; এখানে মোটরটি হারাম মাল দিয়ে কেনা হয়নি, বরং সুদ পরিশোধ করা হয়েছে। তাই মোটরের পানি ব্যবহারে নিষেধ নেই।
৩. করণীয়
১. তাওবা করুন: সুদ দেওয়ার গুনাহ থেকে আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করুন। ভবিষ্যতে সুদী লেনদেন থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন।
২. সুদ পরিশোধ: ব্যাংক যদি সুদ দাবি করে এবং তা না দিলে আইনি সমস্যা হয়, তাহলে বাধ্যবাধকতায় সুদ পরিশোধ করা যাবে; কিন্তু তা গুনাহ থেকে মুক্তি নয়, বরং বাধ্যবাধকতার কারণে। তবে সুদ নেওয়া বা সুদী চুক্তি করা কখনো জায়েজ নয়।
৩. ভবিষ্যতে বিকল্প: সুদমুক্ত ইসলামি ব্যাংকিং বা হালাল ঋণের ব্যবস্থা করুন। প্রয়োজনে স্থানীয় মুফতি সাহেবের পরামর্শ নিন।
৪. মায়ের সাথে সদাচরণ: মাকে ধৈর্য ধরতে বলুন এবং সুদী লেনদেন থেকে বিরত থাকার জন্য বুঝান। বাবার absence-এ আপনি দায়িত্বশীল; আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
৪. হানাফি কিতাবের রেফারেন্স
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): ৫/১৬৬-১৭০ — সুদের সংজ্ঞা ও হারাম হওয়ার বিস্তারিত।
- বাদায়েউস সানায়ে (কাসানি): ৫/১৮৩ — সুদী লেনদেনের বিধান।
- ফাতাওয়া আলমগিরি: ৩/২৩০ — সুদ ও রিবার বিধান।
- আল-হিদায়া (মারগিনানি): ৩/৭৮ — সুদের অধ্যায়।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী): ৩/২৪ — সুদী লেনদেন ও ব্যাংক সুদের বিধান।
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): ২/৩৩৫ — ব্যাংক সুদ ও আধুনিক লেনদেন।
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি): সূরা বাকারা ২৭৫-২৭৯ এর তাফসির।
উপসংহার: মোটরের পানি ব্যবহার করা যাবে। তবে সুদ দেওয়া হারাম; এর জন্য তাওবা করুন এবং ভবিষ্যতে সুদী লেনদেন এড়িয়ে চলুন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب