ইন্টারেস্টের (সুদের) টাকা গরিব আত্মীয় বা ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে সাওয়াবের আশা ছাড়া দেওয়া যাবে কি?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 7292
Questioner: 0057
Question Asked: 23 Oct 2026, 10:06 AM
Reviewed & Published: 23 Oct 2026, 10:11 AM
Views: 7
Tokens: 4,083
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

গরিব আত্মীয় কে সোয়াবের আশা না করে ইন্টারেস্টের টাকা দেওয়া যাবে। একটা বড় এমাউন্টের ইন্টারেস্টেড টাকা দেওয়া যাবে। কারণ উনি টাকা পরিশোধ করতে পারবে না তাই ইন্টারেস্টের টাকা সোয়াবের আশা না করে দেওয়া যাবে।

Answer

ইন্টারেস্টের টাকা গরিব আত্মীয়কে দেওয়া যাবে কি?

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারী জানতে চান—ব্যাংক বা কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত ইন্টারেস্টের (সুদের) টাকা গরিব আত্মীয়কে সাওয়াবের আশা ছাড়া দেওয়া যাবে কি না, বিশেষত এমন ব্যক্তিকে যিনি ঋণ পরিশোধ করতে অক্ষম। বড় অঙ্কের সুদের টাকাও কি এভাবে দেওয়া যাবে?

সংক্ষিপ্ত উত্তর

হ্যাঁ, যাবে। তবে কয়েকটি শর্তসাপেক্ষে:

  1. সুদের টাকা নিজের সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না; বরং তা "খাবীস" (অপবিত্র/নাপাক মাল) হিসেবে গণ্য।
  2. এই টাকা সাওয়াবের নিয়তে দেওয়া যাবে না—কারণ এতে সাওয়াবের আশা করা বৈধ নয়; বরং এটি নিছক সুদ থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়।
  3. গরিব, অভাবী, ঋণগ্রস্ত (গারিমীন) ব্যক্তিকে দেওয়া যাবে—এমনকি আত্মীয় হলেও।
  4. ধনী বা সচ্ছল ব্যক্তিকে দেওয়া যাবে না (যেমন: যাকাতের ক্ষেত্রে ধনীকে দেওয়া নিষিদ্ধ)।
  5. নিজের উপর নির্ভরশীল (যাদের ভরণপোষণ ওয়াজিব) যেমন স্ত্রী, সন্তান, পিতা-মাতা—তাদেরকে এই টাকা দেওয়া যাবে না; কারণ এতে নিজের দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, যা সুদের টাকা "নিজের কাজে ব্যবহার"-এর শামিল।
  6. মসজিদ, মাদরাসা, দাতব্য প্রতিষ্ঠান ইত্যাদিতে সুদের টাকা দেওয়া যাবে না (হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত)।

বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. সুদের টাকার হুকুম

সুদ (রিবা) ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৮)

রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদ গ্রহণকারী, দাতা, লেখক ও সাক্ষী—সবাইকে লা'নত করেছেন (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৫৯৮; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৩৩৩)।

২. সুদের টাকা কী করবেন?

হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ মত হলো—সুদের টাকা গ্রহণ করা হারাম, তবে যদি কোনো কারণে তা হাতে এসে যায় (যেমন ব্যাংক স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা করে), তাহলে তা নিজের সম্পদ হিসেবে ব্যবহার না করে অভাবীকে সদকা করে দেওয়া ওয়াজিব। এটি "সদকা" হিসেবে সাওয়াবের নিয়তে নয়, বরং "তামরীফ" বা অপবিত্র মাল থেকে মুক্তি হিসেবে।

আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে লিখেছেন:

"সুদের মাল গ্রহণ করা জায়েয নয়; তবে যদি তা হাতে আসে, তবে তা ফকীরকে সদকা করা ওয়াজিব—সাওয়াবের নিয়তে নয়, বরং অপবিত্র মাল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য।" (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৮৫-৩৮৬)

ইমাম আত-তাহাবী (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে যে, সুদের মাল সদকা করা যায়, কিন্তু সাওয়াবের আশা করা যায় না। (শারহু মাআনিল আসার, কিতাবুল বুয়ূ', খণ্ড ৩)

মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) "মাআরিফুল কুরআন"-এ উল্লেখ করেছেন যে, সুদের টাকা সদকা করা "নাজাতের" জন্য, "সাওয়াবের" জন্য নয়। (মাআরিফুল কুরআন, সূরা বাকারা ২৭৬-এর তাফসীর)

মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানী" গ্রন্থে বলেছেন:

"সুদের টাকা নিজের সম্পদে শামিল করা জায়েয নয়। তবে তা অভাবীকে সদকা করা জায়েয—সাওয়াবের নিয়ত ছাড়া।" (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ৩, পৃ. ৩৩৫-৩৩৬)

৩. কাদেরকে দেওয়া যাবে?

সুদের টাকা যাকাতের ৮টি খাতের অনুরূপ অভাবী ব্যক্তিদের দেওয়া যাবে। বিশেষত:

  • ফকীর (অভাবী)
  • মিসকীন (নিঃস্ব)
  • গারিমীন (ঋণগ্রস্ত, যিনি ঋণ পরিশোধে অক্ষম)

প্রশ্নে উল্লেখিত ব্যক্তি যেহেতু "টাকা পরিশোধ করতে পারবে না"—তিনি গারিমীন শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, তাই তাকে দেওয়া জায়েয।

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বেহেশতী জেওর"-এ লিখেছেন:

"সুদের টাকা মসজিদ বা মাদরাসায় দেওয়া জায়েয নয়; বরং তা অভাবীকে সদকা করা ওয়াজিব।" (বেহেশতী জেওর, ৭ম অংশ, সুদের বিবরণ)

৪. কাদেরকে দেওয়া যাবে না?

  • ধনী বা সচ্ছল ব্যক্তি (যাকাতের নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক)
  • নিজের উপর ওয়াজিব ভরণপোষণভুক্ত ব্যক্তি (স্ত্রী, সন্তান, পিতা-মাতা)—কারণ এতে নিজের দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়
  • মসজিদ, মাদরাসা, দাতব্য সংস্থা—হানাফি মাযহাব অনুযায়ী
  • সৈয়দ/হাশেমী বংশের লোক (যদি যাকাতের বিধান প্রযোজ্য হয়)

ইমাম মুহাম্মদ আশ-শায়বানী (রহ.) থেকে বর্ণিত—সুদের মাল সদকা করা যায়, তবে মসজিদ নির্মাণে নয়। (আল-আসার, কিতাবুল কিরাহিয়্যাহ)

৫. বড় অঙ্কের টাকা প্রসঙ্গে

বড় অঙ্কের সুদের টাকা একবারে বা কিস্তিতে অভাবীকে দেওয়া জায়েয। তবে মনে রাখতে হবে:

  • এটি সাওয়াবের নিয়তে নয়; বরং "সুদ থেকে মুক্তি" ও "অপবিত্র মাল পরিষ্কার" করার নিয়তে।
  • যদি একাধিক অভাবী থাকে, তাদের মধ্যে বণ্টন করা উত্তম।
  • নিজের কাছে রাখা বা নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নাজায়েয।

উপসংহার

প্রশ্নে উল্লিখিত অবস্থায়—গরিব আত্মীয় যিনি ঋণ পরিশোধে অক্ষম—তাকে ইন্টারেস্টের টাকা সাওয়াবের আশা না করে দেওয়া জায়েয। এটি তার জন্য "সদকা" হিসেবে গণ্য হবে, তবে দাতার জন্য সাওয়াবের আশা করা যাবে না। বড় অঙ্কের টাকাও এভাবে দেওয়া যাবে, তবে শর্ত হলো—প্রাপক অভাবী/ঋণগ্রস্ত হবেন এবং দাতার ওয়াজিব ভরণপোষণভুক্ত না হবেন।

সতর্কতা: সুদ থেকে সম্পূর্ণ বেঁচে থাকা ফরজ। ব্যাংকে সুদী হিসাব রাখা থেকে বিরত থাকাই উত্তম। যদি কোনো কারণে সুদ হাতে আসে, তবে তা অভাবীকে সদকা করে দেওয়াই শরীয়তসম্মত পন্থা।


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.