দ্বীনি দাওয়াতের পারিশ্রমিকের জন্য চুক্তি

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 7280
Questioner: Md Rasel
Question Asked: 23 Oct 2026, 07:04 AM
Reviewed & Published: 23 Oct 2026, 07:14 AM
Views: 17
Tokens: 3,503
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কোনো বক্তার জন্য বা কোনো দ্বায়ীর জন্য দিনের দাওয়াতের দর কসাকসির মাধ্যমে অগ্রীম চুক্তি করা জায়েজ? ইসলাম কি বলে?

Answer

দ্বীনি দাওয়াতের পারিশ্রমিকের জন্য অগ্রীম চুক্তি — ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

কোনো বক্তা (খতীব/ওয়ায়েজ) বা দাওয়াতদাতা (দায়ী) যদি দিনের দাওয়াতের বিনিময় হিসেবে নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক (দর) আগেই চুক্তি করে নেন — এটি জায়েজ কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।

সংক্ষিপ্ত উত্তর

হ্যাঁ, জায়েজ — তবে শর্তসাপেক্ষে। দ্বীনি দাওয়াত, ওয়াজ-নসীহত, শিক্ষাদান ইত্যাদির জন্য নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক (উজরত/জুয়ালা) আগেই নির্ধারণ করে চুক্তি করা শরীয়তসম্মত। এটি ইজারা বা জুয়ালা (মজুরি) চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। তবে কয়েকটি শর্ত অবশ্যই পালনীয়:

  1. পারিশ্রমিক নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট হতে হবে — অজ্ঞাত বা অনির্দিষ্ট (মাজহুল) হলে চুক্তি ফাসিদ হবে।
  2. কাজটি নির্দিষ্ট হতে হবে — কত দিন, কত সময়, কী কাজ (ওয়াজ, দরস, খুতবা) — সব স্পষ্ট থাকতে হবে।
  3. দ্বীনি খেদমতকে ব্যবসায়িক লোভের মাধ্যম বানানো যাবে না — নিয়ত ইখলাসপূর্ণ হতে হবে।
  4. মসজিদের বায়তুলমাল বা সাধারণ মুসল্লিদের ওপর জুলুমকারী বোঝা চাপানো যাবে না।
  5. ফরজে আইন বা ওয়াজিব কাজের জন্য পারিশ্রমিক নেওয়া অনুচিত — তবে শিক্ষাদানে পারিশ্রমিক নেওয়া অনেক ফকীহের মতে জায়েজ।

দলিল ও ব্যাখ্যা

১. কুরআন

«وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ» "তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা।" (সূরা নিসা: ২৯)

এ আয়াতের ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্মতিতে নির্ধারিত পারিশ্রমিক বৈধ।

«فَإِنْ أَرْضَعْنَ لَكُمْ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ» "যদি তারা তোমাদের সন্তানকে দুধ পান করায়, তবে তাদের পারিশ্রমিক দাও।" (সূরা তালাক: ৬)

এখানে ইজারা (মজুরি) চুক্তির বৈধতার মূলনীতি প্রতিষ্ঠিত।

২. হাদিস

  • হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত: নবী (সা.) বলেছেন, "তোমরা কুরআনের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করো।" (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৫৭৩৭)
  • হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.): একদল সাহাবী এক গোত্রে গিয়ে সর্দারকে ঝাড়ফুঁক করেন এবং পারিশ্রমিক হিসেবে বকরি নেন; নবী (সা.) তা অনুমোদন করেন। (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৫৭৩৬; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২২০১)
  • হযরত আবু হুরায়রা (রা.): নবী (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি জেনে-বুঝে কুরআন শিক্ষা দেয়, তার পারিশ্রমিক নেওয়া দোষণীয় নয়।" (তিরমিজি, হাদিস নং ২০৬৯ — তবে হাদিসটি দুর্বল)
  • শরহে মাআনিল আসার (ইমাম তাহাবী): ইজারার বৈধতা সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরামের আমল বর্ণিত হয়েছে।

৩. হানাফি ফিকহের মূলনীতি

ইজারা ও জুয়ালা চুক্তির শর্তাবলি:

  • আল-হিদায়া (মারগিনানী): "ইজারা বৈধ হওয়ার জন্য মজুরি নির্দিষ্ট হওয়া শর্ত।" (আল-হিদায়া, কিতাবুল ইজারা)
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): "যদি কাজ ও পারিশ্রমিক উভয়ই স্পষ্ট হয়, তবে ইজারা সহীহ; অজ্ঞাত হলে ফাসিদ।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, কিতাবুল ইজারা)
  • ফাতাওয়া আলমগিরি: "ওয়াজ, তালিম ও ইমামতির জন্য নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক চুক্তি করা জায়েজ।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল ইজারা)
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): দ্বীনি শিক্ষা ও তাবলিগের কাজে পারিশ্রমিক নেওয়া জায়েজ, তবে ইখলাস রক্ষা করা জরুরি। (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী): "ওয়াজের পারিশ্রমিক নেওয়া জায়েজ, তবে তা যেন দ্বীনের কাজকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম না বানায়।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪)
  • বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী): ইমামত ও শিক্ষাদানের পারিশ্রমিক প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

৪. বিশেষ সতর্কতা

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত: ইমামত ও আযানের পারিশ্রমিক নেওয়া মাকরুহ — কারণ এটি ইবাদত। তবে শিক্ষাদান ও ফতোয়া প্রদানের পারিশ্রমিক জায়েজ।
  • ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত: ইমামতের পারিশ্রমিকও জায়েজ, বিশেষত যখন ইমামের জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজন হয়। (আল-হিদায়া)
  • ইমাম তাহাবী (রহ.): দ্বীনি খেদমতে পারিশ্রমিক নেওয়া জায়েজ, তবে নিয়ত পরিশুদ্ধ রাখা শর্ত।

ব্যবহারিক নির্দেশনা

  1. চুক্তিপত্রে কাজের বিবরণ, সময়, স্থান ও পারিশ্রমিক স্পষ্টভাবে লিখুন।
  2. পারিশ্রমিক অগ্রিম, বিলম্বিত বা কিস্তিতে — যেকোনোভাবে নির্ধারণ করা যাবে, শর্ত হলো স্পষ্টতা।
  3. দাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য যেন আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকে; পারিশ্রমিক গৌণ বিষয়।
  4. মসজিদ কমিটি বা দাওয়াতদাতার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপানো যাবে না।
  5. ফরজে আইন (যেমন নিজের নামাজ শেখা) শিক্ষার জন্য পারিশ্রমিক নেওয়া থেকে বিরত থাকাই উত্তম।

উপসংহার

দ্বীনি দাওয়াতের পারিশ্রমিক আগেই নির্ধারণ করে চুক্তি করা শরীয়তসম্মত ও জায়েজ, যদি পারিশ্রমিক ও কাজ উভয়ই স্পষ্ট হয় এবং নিয়ত ইখলাসপূর্ণ থাকে। এটি ইজারা/জুয়ালা চুক্তির অন্তর্ভুক্ত, যা কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের মূলনীতি দ্বারা প্রমাণিত।


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.