নেইল পলিশ ব্যবহার ও ফরজ গোসল

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 7273
Questioner: Anamika islam0317
Question Asked: 23 Oct 2026, 12:18 AM
Reviewed & Published: 23 Oct 2026, 01:00 AM
Views: 22
Tokens: 5,488
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার হায়েজ অবস্থায় আমি আমার নখে "nail polish" ব্যবহার করেছিলাম। তারপর নামায শুরু হওয়ার সাথে সাথে আমি nail polish উঠিয়ে ফরজ গোসল করেছিলাম এবং নামাজও পরেছিলাম। কিন্তু এখন আমি হঠাৎ করে দেখি আমার নখের এক কোণে একটু nail polish লেগে আছে, যা আমি আগে খেয়াল করিনি। এখন কি আমার পূণরায় ফরজ গোসল করা লাগবে? নাকি হাতের সেই অংশটুকুতে শুধু পানি ব্যবহার করতে হবে?

আমি জানি আমার ফরজ ওয়াজিব নামাযগুলো সব কাযা করতে হবে। তবে আমি এটা জানিনা যে এখন আমার আবার ফরজ গোসল করতে হবে নাকি। যেহেতু নোখের কোনায় একটু নেইল পলিশ লেগে ছিলো যেখানে গোসলের সময় পানি পৌছায়নি। আমি এখন জানতে চাচ্ছি যে আমার এখন করনীয় কি??

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

সংক্ষিপ্ত উত্তর

আপনার পুনরায় সম্পূর্ণ ফরজ গোসল করা লাগবে না। শুধু নখের যে কোণে নেইল পলিশ লেগে ছিল এবং যেখানে গোসলে পানি পৌঁছায়নি, সেই অংশটুকু সরিয়ে/পরিষ্কার করে পানি পৌঁছানো যথেষ্ট। তবে যে নামাযগুলো আপনি ওই অপবিত্র নখ নিয়ে পড়েছিলেন, সেগুলো পুনরায় পড়তে হবে (কাযা)।


বিস্তারিত দলিলসহ আলোচনা

১. ফরজ গোসলে "সম্পূর্ণ শরীরে পানি পৌঁছানো" শর্ত — কিন্তু যা পানি পৌঁছাতে বাধা দেয় তা অপসারণ করা আবশ্যক

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আর যদি তোমরা জানাবাত অবস্থায় থাকো, তবে বিশেষভাবে পবিত্র হও (গোসল করো)।"
— (সূরা মায়িদা: ৬)

হাদিসে উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"আমি কি তোমাদেরকে সেই নারীর কথা জানাবো না, যে তার মাথার চুলের বেণি খুলে ফেলে? সে শুধু তিনবার মাথায় পানি ঢালবে...।"
— (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৩৩০; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২৫১)

আরও বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ গোসলের সময় শরীরের প্রতিটি অঙ্গে পানি পৌঁছাতেন। (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ২৪৮; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৩১৭)

ফিকহি মূলনীতি: ফরজ গোসলে শরীরের প্রতিটি অংশে পানি পৌঁছানো ফরজ। কিন্তু যদি কোনো বস্তু (যেমন নেইল পলিশ, মোম, রং) ত্বক বা নখের উপর এমনভাবে লেগে থাকে যা পানি পৌঁছাতে বাধা দেয়, তবে তা অপসারণ করা আবশ্যক। অপসারণ না করে গোসল করলে ওই অংশ পবিত্র হয় না এবং গোসল সহীহ হয় না।

২. হানাফি মাযহাবের ফুকাহায়ে কেরামের বক্তব্য

আল্লামা ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে উল্লেখ করেন:

যদি নখের উপর এমন কিছু লেগে থাকে যা পানি পৌঁছাতে বাধা দেয় (যেমন রং বা ময়লা যা জমে গেছে), তবে তা অপসারণ করা ওয়াজিব। কেননা ফরজ গোসলে সমস্ত শরীরে পানি পৌঁছানো শর্ত।
— (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৫৪-১৫৫, দারুল ফিকর)

আল্লামা হাসকাফি (রহ.) "আদ-দুররুল মুখতার" গ্রন্থে বলেন:

"যে বস্তু পানি পৌঁছাতে বাধা দেয় তা অপসারণ করা ফরজ।"
— (আদ-দুররুল মুখতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৫৪)

ফতোয়ায়ে আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে:

"যদি নখের উপর আটা, ময়দা বা রং শুকিয়ে যায় এবং তা পানি পৌঁছাতে বাধা দেয়, তবে তা অপসারণ করা আবশ্যক।"
— (ফতোয়ায়ে আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৩)

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) "মাআরিফুল কুরআন"-এ সূরা মায়িদার ৬ নং আয়াতের তাফসীরে বলেন:

"গোসলে শরীরের প্রতিটি অঙ্গে পানি পৌঁছানো ফরজ। যদি কোনো বস্তু পানি পৌঁছাতে বাধা দেয়, তবে তা সরানো আবশ্যক।"
— (মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৬৮)

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) "ফতোয়ায়ে উসমানি"-তে নেইল পলিশ সম্পর্কে বলেন:

"নেইল পলিশ যদি এমন হয় যা পানি পৌঁছাতে বাধা দেয়, তবে তা অপসারণ করা ফরজ। অপসারণ না করে গোসল করলে গোসল সহীহ হবে না।"
— (ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৮৭)

৩. আপনার নির্দিষ্ট প্রশ্নের বিশ্লেষণ

আপনি গোসলের সময় নেইল পলিশ উঠিয়েছিলেন, কিন্তু নখের এক কোণে অল্প একটু লেগে ছিল যা আপনি লক্ষ্য করেননি। এখন প্রশ্ন হলো:

আপনার গোসল কি সহীহ হয়েছে?

উত্তর: না, ওই অংশে পানি পৌঁছায়নি বলে গোসল সহীহ হয়নি। কারণ ফরজ গোসলে সমস্ত শরীরে পানি পৌঁছানো শর্ত, এবং নখও শরীরের অংশ। যেখানে নেইল পলিশ ছিল সেখানে পানি পৌঁছায়নি, তাই ওই অংশ অপবিত্রই থেকে গেছে।

এখন কী করবেন?

দুটি বিষয় আলাদা করতে হবে:

(ক) পবিত্রতা (তাহারাত) অর্জন:
যেহেতু গোসল সহীহ হয়নি, তাই আপনি এখনও জানাবাত (অপবিত্র) অবস্থায় আছেন। এখন আপনার উপর ফরজ গোসল করা আবশ্যক। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো — আপনাকে কি সম্পূর্ণ শরীর ধুতে হবে, নাকি শুধু ওই অংশ ধুলেই হবে?

হানাফি মাযহাবের সঠিক মত: যেহেতু আপনি ইতিমধ্যে সমস্ত শরীর ধুয়েছিলেন এবং শুধুমাত্র নখের একটি ক্ষুদ্র অংশে পানি পৌঁছায়নি, তাই শুধু সেই অংশটুকু ধুয়ে নিলেই আপনার গোসল পূর্ণ হয়ে যাবে — সম্পূর্ণ শরীর পুনরায় ধোয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ গোসলে যা বাকি ছিল তা পূর্ণ করা হয়, পুনরায় শুরু করা হয় না।

আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:

"যদি গোসলে কোনো অংশ বাদ পড়ে যায় এবং পরে স্মরণ হয়, তবে শুধু সেই অংশ ধুয়ে নিলেই যথেষ্ট হবে, সম্পূর্ণ গোসল পুনরায় করতে হবে না।"
— (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৫৬)

ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া-তে উল্লেখ আছে:

"যদি ব্যক্তি গোসলের পর জানতে পারে যে তার শরীরের কোনো অংশে পানি পৌঁছায়নি, তবে শুধু সেই অংশ ধুয়ে নেবে।"
— (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬)

তবে সতর্কতা: যেহেতু আপনি ইতিমধ্যে নামায পড়েছেন এবং অন্যান্য কাজ করেছেন, তাই আপনার পবিত্রতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। নিরাপদ ও সঠিক পদ্ধতি হলো — নখের সেই অংশ পরিষ্কার করে ধুয়ে নিন, তারপর নতুন করে ওযু করে নামায পড়ুন। তবে সম্পূর্ণ ফরজ গোসল পুনরায় করা আবশ্যক নয়, শুধু বাকি অংশ পূর্ণ করাই যথেষ্ট।

(খ) নামাযসমূহের হুকুম:
যেহেতু আপনি অপবিত্র (জানাবাত) অবস্থায় নামায পড়েছেন, তাই যে নামাযগুলো আপনি ওই অবস্থায় পড়েছেন, সেগুলো কাযা করা আবশ্যক। আপনি নিজেই বলেছেন যে আপনি জানেন ফরজ ও ওয়াজিব নামাযগুলো কাযা করতে হবে — এটা সঠিক।

আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বেহেশতী জেওর"-এ বলেন:

"অপবিত্র অবস্থায় পড়া নামায কখনো সহীহ হয় না, তা পুনরায় পড়তে হবে।"
— (বেহেশতী জেওর, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৮)


করণীয় (ধাপে ধাপে)

  1. নখের সেই কোণ থেকে নেইল পলিশ সম্পূর্ণরূপে সরিয়ে ফেলুন (নেইল পলিশ রিমুভার বা অন্য উপায়ে)।
  2. সেই অংশে পানি পৌঁছান — এতে আপনার ফরজ গোসল পূর্ণ হয়ে যাবে (সম্পূর্ণ শরীর পুনরায় ধোয়ার প্রয়োজন নেই)।
  3. নতুন করে ওযু করুন (যদি নামায পড়তে চান)।
  4. যে নামাযগুলো অপবিত্র অবস্থায় পড়েছিলেন, সেগুলো কাযা করুন — ফরজ ও ওয়াজিব নামাযসমূহ।
  5. ভবিষ্যতে গোসেলের আগে নখ, চুল, ত্বক ইত্যাদি ভালোভাবে পরীক্ষা করে নিন যাতে কোনো বস্তু পানি পৌঁছাতে বাধা না দেয়।

একটি গুরুত্বপূর্ণ নোট

কিছু মানুষ মনে করেন যে নেইল পলিশ শুধু "সৌন্দর্যবর্ধক" বস্তু, তাই এর জন্য গোসল ভঙ্গ হয় না — এটি ভুল ধারণা। হানাফি মাযহাবের সকল প্রামাণ্য ফতোয়ায় স্পষ্ট যে, যা পানি পৌঁছাতে বাধা দেয় তা অপসারণ করা ফরজ। নেইল পলিশ পানি প্রতিরোধক (waterproof) হওয়ায় তা অবশ্যই অপসারণ করতে হবে।


উপসংহার: আপনার সম্পূর্ণ ফরজ গোসল পুনরায় করা লাগবে না — শুধু নখের সেই অংশ পরিষ্কার করে পানি পৌঁছালেই গোসল পূর্ণ হবে। তবে অপবিত্র অবস্থায় পড়া নামাযগুলো কাযা করা আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিকভাবে দ্বীন বোঝার তাওফিক দান করুন। আমিন।

والله أعلم بالصواب
وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.