ওযুর সময় ফ্লোর থেকে পানি গায়ে ছিটে এলে কি অপবিত্রতা হবে?
Taharah Purity · Hanafi
Question
Answer
মাসআলা: ওযুর সময় ফ্লোরের পানির ছিটা গায়ে লাগলে কি অপবিত্রতা হবে?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
ওযু করার সময় ট্যাপ ছেড়ে দিয়ে ওযু করলে ফ্লোর থেকে পানি গায়ে ছিটা এলে তা কি অপবিত্রতা (নাপাকি) গণ্য হবে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
না, এতে অপবিত্রতা হবে না। ফ্লোরের সেই পানির ছিটা সাধারণত পাক (পবিত্র) থাকে, যতক্ষণ না নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে ফ্লোরে নাপাকি (যেমন প্রস্রাব, পায়খানা, রক্ত ইত্যাদি) মিশে আছে। শুধু সন্দেহ বা ওয়াসওয়াসার কারণে পানি নাপাক হয় না।
কুরআন ও হাদীসের দলিল
১. মূলনীতি: সন্দেহে পবিত্রতা বিনষ্ট হয় না
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"তিনি (আল্লাহ) তোমাদের উপর কোনো সংকীর্ণতা রাখেননি।" (সূরা আল-হজ, ২২:৭৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের অন্তরে ওয়াসওয়াসা (সন্দেহ) নিক্ষেপ করে।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২০)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
"যখন তোমাদের কেউ তার পেটে কিছু অনুভব করে, তখন সে যেন (নামাজ) না ভাঙে, যতক্ষণ না শব্দ শোনে বা গন্ধ পায়।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৬১)
ফিকহী মূলনীতি (কায়েদা):
"আল-ইয়াকীনু লা ইয়াযূলু বিস-শাক্ক" — নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না। (মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ, মাদ্দা ৪; রাদ্দুল মুহতার, ১/১৮৭)
২. পবিত্র পানি সম্পর্কে হাদীস
রাসূলুল্লাহ ﷺ পানি সম্পর্কে বলেন:
"পানি পবিত্র, কোনো কিছু তাকে অপবিত্র করে না।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৬৭; সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৬৬ — হাসান সহীহ)
হানাফী ফিকহের বিশ্লেষণ
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মত
ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, সন্দেহের কারণে কোনো পানি বা স্থান নাপাক সাব্যস্ত হয় না; বরং নাপাকির বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ প্রয়োজন।
ইমাম মুহাম্মদ আশ-শায়বানী (রহ.)-এর বক্তব্য
"যে পানি সম্পর্কে নিশ্চিত জানা নেই যে তা নাপাক, তা পাক হিসেবে গণ্য হবে।" (আল-আসার, পৃ. ৪৮)
ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) — রাদ্দুল মুহতার
"الأصل في الماء الطهارة حتى يثبت النجس بيقين" "পানির মূল অবস্থা পবিত্রতা; যতক্ষণ না নিশ্চিতভাবে নাপাকি প্রমাণিত হয়।" (রাদ্দুল মুহতার, ১/১৮৭; ১/৩০১)
ইবনে আবিদীন আরও লেখেন:
"যদি কোনো ব্যক্তি সন্দেহ করে যে তার গায়ে বা কাপড়ে নাপাকি লেগেছে কি না, তবে তা পাক হিসেবেই গণ্য হবে।" (রাদ্দুল মুহতার, ১/৩০১)
ফাতাওয়া আলমগীরী
"الماء المستعمل في الطهارة طاهر، وما شك في نجاسته فهو طاهر" "পবিত্রতার কাজে ব্যবহৃত পানি পবিত্র; আর যে পানির নাপাকি সম্পর্কে সন্দেহ, তা পবিত্র।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/১৩)
ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী)
"ফ্লোরের পানি যদি নাপাকির সাথে মিশ্রিত না হয়, তবে তা পাক। ওযুর সময় ছিটে আসা পানি পাক; এতে কোনো সমস্যা নেই।" (ফাতাওয়া উসমানী, ১/২৩৫ — অনুরূপ)
ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী রহ.)
"শুধু সন্দেহের কারণে পানি নাপাক হয় না; বরং নাপাকির নিশ্চিত প্রমাণ দরকার।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/৪৫)
বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী রহ.)
"যদি কোনো পানি বা স্থান সম্পর্কে সন্দেহ হয় যে নাপাক, তবে তা পাক ধরবে।" (বেহেশতী জেওর, পৃ. ৪৮)
বিস্তারিত মাসআলা
১. ফ্লোরের পানি কখন নাপাক হবে?
ফ্লোরের পানি নাপাক হবে কেবল তখনই, যখন নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে সেখানে নাপাকি (প্রস্রাব, পায়খানা, রক্ত, মদ ইত্যাদি) মিশেছে এবং পানির রং, গন্ধ বা স্বাদ পরিবর্তিত হয়েছে। (রাদ্দুল মুহতার, ১/৩০১)
২. ছিটে আসা পানির হুকুম
ওযুর সময় ফ্লোর থেকে ছিটে আসা পানি যদি:
- রং, গন্ধ, স্বাদ স্বাভাবিক থাকে → পাক (পবিত্র)
- নাপাকির চিহ্ন স্পষ্ট না থাকে → পাক
- নিশ্চিতভাবে নাপাকি মিশে থাকে → নাপাক
৩. ওয়াসওয়াসা থেকে সতর্কতা
শয়তান ওযু ও পবিত্রতার বিষয়ে বেশি ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"দ্বীনের মধ্যে কঠোরতা (বাড়াবাড়ি) ধ্বংস ডেকে আনে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৯)
ব্যবহারিক নির্দেশনা
- ফ্লোর শুকনো রাখার চেষ্টা করুন — ওযুর সময় পানি ছিটকে পড়া কমাতে।
- সন্দেহ হলে পানি পাক ধরুন — ওয়াসওয়াসায় পড়বেন না।
- নিশ্চিত নাপাকি থাকলে — ফ্লোর ধুয়ে নিন, তারপর ওযু করুন।
- গায়ে ছিটা লাগলে — যদি নিশ্চিত নাপাকি না হয়, তবে শুধু মুছে ফেলাই যথেষ্ট; ধোয়া আবশ্যক নয়।
- নামাজের আগে — সন্দেহ হলে কাপড় বা শরীর ধোয়ার প্রয়োজন নেই।
উপসংহার
ফ্লোর থেকে ছিটে আসা পানি সাধারণত পাক এবং এতে অপবিত্রতা হয় না, যতক্ষণ না নিশ্চিতভাবে নাপাকি মিশে থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। শুধু সন্দেহ বা ওয়াসওয়াসার কারণে পানি নাপাক সাব্যস্ত করা যাবে না। এটি হানাফী মাযহাবের সুস্পষ্ট ও প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত।
তথ্যসূত্র
- আল-কুরআনুল কারীম (সূরা আল-হজ, ২২:৭৮)
- সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩৭, ৩৯
- সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২০, ৩৬১
- সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৬৭
- সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৬৬
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ১/১৮৭, ১/৩০১
- ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/১৩
- ফাতাওয়া উসমানী, ১/২৩৫
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/৪৫
- বেহেশতী জেওর, পৃ. ৪৮
- মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ, মাদ্দা ৪
আল্লাহ ভালো জানেন।