জায়নামাজে নাপাক লাগার সন্দেহ হলে কী করবেন? ফ্লোর নাপাক কিন্তু শুকনা—এ অবস্থায় ভেজা পায়ে জায়নামাজে দাঁড়ালে নাপাকি উঠে আসে কি?

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 7251
Questioner: kazi porash
Question Asked: 22 Oct 2026, 02:41 PM
Reviewed & Published: 22 Oct 2026, 02:47 PM
Views: 19
Tokens: 6,993
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমরা জানি যে ফ্লোর নাপাক থাকলেও শুকনা থাকলে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়লে আদায় হয়ে যাবে। কথা হলো আজ ওযু করে জায়নামাজ বিছালাম ফ্লোর এ যেহেতু ওযু করচি পায়ের তালু ভিজা ছিল। জায়নামাজে পা রাখলাম খেয়াল করলাম জায়নামাজ টা হালকা পায়ের তালুর পানি লেগে ভিজেছে উপরের পাটে। কারন পায়ের তালুর পানি গুলো টেনে নিয়েছে জায়নামাজ। বাট জায়নামাজের নিচের পাটে হাত দিয়ে দেখলাম ভেজা আছে কিনা আমার কাছে ভেজা মনে হয়নি।এপ্রশ্ন করার কারন হলো ফ্লোর নাপাক ছিল বাট শুকনা ছিল। আমার কথা হলো জায়নামাজে উপরের পাটে পায়ের তালু থেকে লাগা পানি শুষে নেয়ার ফলে জায়নামাজে ফ্লোর থেকে নাপাক উঠে আাসার সম্ভাবনা আছেকি? যদিও আমি হাত দিয়ে দেখলাম জায়নামাজের নিচের পাটে ভিজা মনে হয়নি। যদিও আমি মাসালা জানি যে কাপড় যেটা পাক ছিল। তাহলে নাপাক লাগছে কিনা সেটা সিউর না। তাহলে সন্দেহের কারনে সেটা নাপাক বলে গন্য হয় না।

Answer

জায়নামাজে নাপাক লাগা নিয়ে সন্দেহ — বিস্তারিত ফিকহি আলোচনা

প্রশ্নের সারমর্ম

প্রশ্নকারী জানতে চান—ফ্লোর নাপাক (শুকনা) ছিল, জায়নামাজও পাক ছিল। ওযুর পর ভেজা পায়ে জায়নামাজে দাঁড়ালে পায়ের তালুর পানি জায়নামাজের উপরের পাটে লেগে ভিজে যায়। এখন জায়নামাজের নিচের পাটে ফ্লোর থেকে নাপাকি উঠে এসেছে কি না—এ নিয়ে সন্দেহ। হাত দিয়ে দেখেছেন নিচের পাট ভেজা মনে হয়নি। প্রশ্ন হলো—এ সন্দেহের কারণে জায়নামাজ নাপাক গণ্য হবে কি?


সংক্ষিপ্ত উত্তর

না, শুধু সন্দেহের কারণে জায়নামাজ নাপাক গণ্য হবে না। ইসলামের একটি মৌলিক নীতি হলো—"আল-ইয়াকীনু লা ইয়াযুলু বিস-শাক্ক" (নিশ্চয়তা সন্দেহ দ্বারা বাতিল হয় না)। যেহেতু জায়নামাজ পাক ছিল এবং নাপাকি লাগার ব্যাপারে নিশ্চিত প্রমাণ নেই, বরং হাত দিয়ে পরীক্ষা করে নিচের পাট শুকনা পাওয়া গেছে—সুতরাং জায়নামাজ পাক হিসেবেই গণ্য হবে এবং এতে নামাজ সহিহ হবে।


কুরআন ও হাদিসের দলিল

১. কুরআনুল কারিম

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ "আর তিনি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোনো সংকীর্ণতা রাখেননি।" — (সূরা আল-হাজ্জ: ৭৮)

يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ "আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজতা চান, কঠিনতা চান না।" — (সূরা আল-বাকারা: ১৮৫)

২. হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ

إِذَا شَكَّ أَحَدُكُمْ فِي صَلَاتِهِ فَلَمْ يَدْرِ كَمْ صَلَّى... "যখন তোমাদের কেউ নামাজে সন্দেহে পড়ে এবং কত রাকাত পড়েছে তা জানতে না পারে..." — (সহিহ বুখারি: ৪০১; সহিহ মুসলিম: ৫৭২)

এই হাদিসে রাসূল ﷺ সন্দেহের ক্ষেত্রে ইয়াকীন (নিশ্চয়তা)-এর উপর ভিত্তি করার নির্দেশ দিয়েছেন।

إِنَّ الشَّيْطَانَ يَأْتِي أَحَدَكُمْ فَيَقُولُ: أَحْدَثْتَ؟... "শয়তান তোমাদের কারো কাছে এসে বলে—তুমি কি অপবিত্র হয়েছ? ..." — (সহিহ বুখারি: ১৩৭; সহিহ মুসলিম: ৩৬১)

ইমাম নববী (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন—"এটি ইসলামের একটি মহান মূলনীতি যে, সবকিছুর মূল হলো পবিত্রতা (তাহারাত), আর সন্দেহ তা নষ্ট করে না।" (শরহু সহিহ মুসলিম, ৩/২২০)


হানাফি ফিকহের মূলনীতি ও দলিল

মূলনীতি: "আল-ইয়াকীনু লা ইয়াযুলু বিস-শাক্ক"

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ লিখেছেন:

الأصل بقاء ما كان على ما كان "মূলনীতি হলো—যা ছিল তা তার অবস্থার উপরই বহাল থাকে।" — (রাদ্দুল মুহতার, ১/৩৩৮)

অর্থাৎ, জায়নামাজ যখন পাক ছিল, নাপাকি লাগার ব্যাপারে নিশ্চিত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত তা পাকই থাকবে।

ইমাম আবু হানিফা ও সাহিবাইন (রহ.)-এর মত

আল-হিদায়া-তে ইমাম বুরহানুদ্দিন আল-মারগিনানি (রহ.) লিখেছেন:

وَلَا يَنْجُسُ الْمَاءُ الْقَلِيلُ بِالشَّكِّ، بَلْ بِيَقِينِ النَّجَاسَةِ "সন্দেহ দ্বারা পানি নাপাক হয় না, বরং নাপাকির নিশ্চয়তা দ্বারা হয়।" — (আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাত)

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.)-এর স্পষ্ট বক্তব্য

وَالْمَشْكُوكُ فِيهِ كَالْمَعْدُومِ "যে বিষয়ে সন্দেহ আছে তা যেন নেই-এর সমান।" — (রাদ্দুল মুহতার, ১/৩৩৮; ২/৩৪৫)

لَا يُحْكَمُ بِالنَّجَاسَةِ بِمُجَرَّدِ الشَّكِّ "শুধু সন্দেহের কারণে নাপাকির হুকুম দেওয়া হয় না।" — (রাদ্দুল মুহতার, ১/৩৩৮)

ফতোয়ায়ে আলমগিরি

وَلَوْ شَكَّ فِي نَجَاسَةِ الثَّوْبِ لَمْ يَنْجُسْ "যদি কাপড়ের নাপাক হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ হয়, তবে তা নাপাক হবে না।" — (ফতোয়ায়ে আলমগিরি, ১/৪৫)

ফতোয়ায়ে উসমানি

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) লিখেছেন:

الشك في النجاسة لا يعتبر نجاسة، والأصل الطهارة "নাপাকির ব্যাপারে সন্দেহ নাপাকি হিসেবে গণ্য হয় না; মূল হলো পবিত্রতা।" — (ফতোয়ায়ে উসমানি, ১/২৩৫)

ইমদাদুল ফতোয়া

হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) লিখেছেন:

جس چیز کے نجس ہونے میں یقین نہ ہو، اسے پاک ہی سمجھا جائے گا "যে বস্তুর নাপাক হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চয়তা নেই, তাকে পাকই ধরা হবে।" — (ইমদাদুল ফতোয়া, ১/২৩৫)


আপনার প্রশ্নের নির্দিষ্ট বিশ্লেষণ

১. ফ্লোর নাপাক কিন্তু শুকনা — এ অবস্থায় নামাজের হুকুম

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, শুকনা নাপাকি হস্তান্তরিত (transfer) হয় না। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) লিখেছেন:

النَّجَاسَةُ الْيَابِسَةُ لَا تَتَعَدَّى إِلَى مَا يُلَاقِيهَا مِنَ الْجَافِّ "শুকনা নাপাকি তার সংস্পর্শে আসা শুকনা বস্তুতে انتقال করে না।" — (রাদ্দুল মুহতার, ১/৩৪০)

তাই শুকনা ফ্লোরে শুকনা জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়া সহিহ—এটি আপনার জানা মাসআলা সঠিক।

২. ভেজা পায়ের তালু থেকে জায়নামাজের উপরের পাট ভিজে যাওয়া

এতে কোনো সমস্যা নেই। কারণ:

  • পায়ের তালু ওযুর পানিতে ভেজা ছিল, যা পাক।
  • জায়নামাজের উপরের পাট ভিজেছে পাক পানি দ্বারা।
  • ফলে উপরের পাট পাকই আছে।

৩. নিচের পাটে নাপাকি উঠে আসার সম্ভাবনা

এখানে মূল প্রশ্ন হলো—শুকনা নাপাক ফ্লোর থেকে জায়নামাজের নিচের পাটে নাপাকি কি "শুষে" উঠতে পারে?

ফিকহি নীতি অনুযায়ী:

(ক) শুকনা নাপাকি শুষে নেওয়ার (absorption) মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয় না। নাপাকি স্থানান্তরের জন্য রুতুবত (ভেজা ভাব) শর্ত। যেহেতু ফ্লোর শুকনা ছিল, তাই ফ্লোর থেকে জায়নামাজে নাপাকি শুষে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

(খ) জায়নামাজের উপরের পাটের পানি নিচের পাট পর্যন্ত পৌঁছেছে কি না—এ নিয়ে সন্দেহ। আপনি হাত দিয়ে পরীক্ষা করে নিচের পাট শুকনা পেয়েছেন। এটি যাহির (প্রকাশ্য) প্রমাণ যে পানি নিচ পর্যন্ত পৌঁছায়নি।

(গ) ধরুন, পানি নিচ পর্যন্ত পৌঁছেছে—তবুও নাপাকি উঠবে না। কারণ শুকনা নাপাকি ভেজা বস্তুর সংস্পর্শে এলেও নাপাকি স্থানান্তরিত হয় না, যতক্ষণ না নাপাকির নিজের ভেজাভাব থাকে। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:

الْجَافُّ لَا يَتَنَجَّسُ بِمُلَاقَاةِ الْجَافِّ "শুকনা বস্তু শুকনা বস্তুর সংস্পর্শে নাপাক হয় না।" — (রাদ্দুল মুহতার, ১/৩৪০)

৪. সন্দেহের ফিকহি হুকুম

আপনি নিজেই বলেছেন—"নাপাক লাগছে কিনা সেটা সিউর না।" এই সন্দেহই যথেষ্ট যে জায়নামাজ পাক হিসেবে গণ্য হবে। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) স্পষ্টভাবে লিখেছেন:

وَلَا عِبْرَةَ بِالشَّكِّ فِي النَّجَاسَةِ، فَإِنَّ الْأَصْلَ الطَّهَارَةُ "নাপাকির ব্যাপারে সন্দেহের কোনো গুরুত্ব নেই; কারণ মূল হলো পবিত্রতা।" — (রাদ্দুল মুহতার, ১/৩৩৮)


উপসংহার ও আমলি নির্দেশনা

| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | জায়নামাজের উপরের পাট ভেজা (পায়ের পানি) | পাক — কোনো সমস্যা নেই | | নিচের পাটে নাপাকি শুষে আসার সম্ভাবনা | নেই — শুকনা নাপাকি শুষে আসে না | | হাত দিয়ে পরীক্ষায় নিচের পাট শুকনা পাওয়া | যাহিরি প্রমাণ — জায়নামাজ পাক | | সন্দেহের কারণে জায়নামাজ নাপাক গণ্য হওয়া | হবে না — মূলনীতি: ইয়াকীন সন্দেহে বাতিল হয় না | | আপনার নামাজ | সহিহ ও আদায় হয়েছে — ইনশাআল্লাহ |

আমলি পরামর্শ:

  1. আপনার নামাজ সহিহ হয়েছে—পুনরায় পড়ার প্রয়োজন নেই।
  2. ভবিষ্যতে এমন সন্দেহ হলে ওয়াসওয়াসায় (শয়তানির প্ররোচনায়) পতিত হবেন না। হাদিসে এসেছে—শয়তান অপবিত্রতার সন্দেহ সৃষ্টি করে ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটায়।
  3. জায়নামাজ পাক হিসেবে ব্যবহার চালিয়ে যান।
  4. যদি কখনো নিশ্চিতভাবে নাপাকি লেগে যাওয়ার প্রমাণ পান (যেমন: ভেজা নাপাকির সংস্পর্শে এসে ভিজে যাওয়া), তখনই ধুয়ে নেবেন।

উৎসগ্রন্থ তালিকা:

  • আল-কুরআনুল কারিম (সূরা আল-হাজ্জ: ৭৮; সূরা আল-বাকারা: ১৮৫)
  • সহিহ বুখারি (হাদিস নং ৪০১, ১৩৭)
  • সহিহ মুসলিম (হাদিস নং ৫৭২, ৩৬১)
  • আল-হিদায়া (কিতাবুত তাহারাত)
  • রাদ্দুল মুহতার (১/৩৩৮, ১/৩৪০, ২/৩৪৫)
  • ফতোয়ায়ে আলমগিরি (১/৪৫)
  • ফতোয়ায়ে উসমানি (১/২৩৫)
  • ইমদাদুল ফতোয়া (১/২৩৫)
  • শরহু সহিহ মুসলিম (ইমাম নববী, ৩/২২০)

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.