এই অবস্থায় প্রবাহিত রক্তে অজু থাকবে কি? সালাত হবে?

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 7248
Questioner: Taj
Question Asked: 22 Oct 2026, 01:59 PM
Reviewed & Published: 22 Oct 2026, 03:03 PM
Views: 12
Tokens: 4,675
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

পা এর এক অংশ কেটে গিয়েছে। প্রবাহিত রক্ত বের হয়। আমি যদি ব্যান্ডেজ করে বা কোনোভাবে রক্ত পড়া আটকিয়ে রাখি। যেমন টিস্যু দিয়ে তার উপর tape দিয়ে আটকিয়ে রাখি। তখন টিস্যু তো রক্ত চুষে নিবে। কিন্তু রক্ত তো তখনও প্রবাহিত হচ্ছে। আমার কি ওযু থাকবে? সালাত পড়তে পারব? নাকি রক্তথামা পর্যন্ত অপেক্ষা করব

Answer

প্রবাহিত রক্ত ও ওযু: বিস্তারিত ফিকহি আলোচনা

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

পায়ের একাংশ কেটে গেছে, সেখান থেকে প্রবাহিত (flowing) রক্ত বের হচ্ছে। টিস্যু ও টেপ দিয়ে চেপে রাখলে টিস্যু রক্ত শুষে নেয়, কিন্তু ভেতরে রক্ত প্রবাহিতই থাকে। এ অবস্থায় ওযু বহাল থাকবে কি? সালাত আদায় করা যাবে কি? নাকি রক্ত বন্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে?


ফিকহি মূলনীতি (হানাফি মাযহাব)

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, ওযু ভঙ্গের কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো—শরীরের কোনো স্থান থেকে রক্ত, পুঁজ বা পানি এমনভাবে বের হওয়া যা নিজে নিজে প্রবাহিত হয় (সাইল = flowing), অর্থাৎ ক্ষতস্থান ছাড়িয়ে আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে।

দলিল:

  • আল-হিদায়া (কিতাবুত তাহারাত, নাওয়াকিজুল ওযু অধ্যায়): "وَمَا خَرَجَ مِنْ بَدَنِهِ مِنْ دَمٍ أَوْ قَيْحٍ أَوْ مَاءٍ سَائِلٍ" — শরীর থেকে প্রবাহিত রক্ত, পুঁজ বা পানি বের হলে ওযু ভঙ্গ হয়।
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন) ১/১৫৪: "السَّائِلُ هُوَ الَّذِي يَسِيلُ بِنَفْسِهِ إِلَى مَحَلٍّ آخَرَ" — সাইল হলো তা, যা নিজে নিজে অন্য স্থানে গড়িয়ে যায়।
  • ফাতাওয়া আলমগিরি ১/১০: একই মাসআলা বর্ণিত।
  • বাদায়েউস সানায়ে (কাসানি) ১/২৭: রক্ত প্রবাহিত হওয়ার শর্ত উল্লেখ করেছেন।

গুরুত্বপূর্ণ শর্ত:

রক্ত প্রবাহিত (সাইল) হতে হবে। অর্থাৎ—

  1. ক্ষতস্থান থেকে বের হয়ে আশপাশে ছড়িয়ে পড়বে, অথবা
  2. বিন্দু বিন্দু হয়ে গড়িয়ে পড়বে, অথবা
  3. এত পরিমাণ হবে যে নিজে নিজে প্রবাহিত হওয়ার শক্তি রাখে।

শুধু ক্ষতস্থানে রক্ত জমে থাকা বা টিস্যুতে শোষিত হওয়া—এটি প্রবাহিত হওয়ার হুকুমে পড়ে না, যদি না তা ক্ষতস্থান ছাড়িয়ে বাইরে গড়িয়ে পড়ে।


আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর

১. টিস্যু ও টেপ দিয়ে চেপে রাখলে কী হবে?

এখানে দুটি দিক বিবেচ্য:

(ক) যদি রক্ত টিস্যুতে শোষিত হয় এবং বাইরে গড়িয়ে না পড়ে:

  • হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, রক্ত প্রবাহিত (সাইল) হিসেবে গণ্য হবে না, কারণ তা ক্ষতস্থান ছাড়িয়ে বাইরে প্রবাহিত হচ্ছে না।
  • তবে সতর্কতা (এহতিয়াত) হিসেবে—যদি ভেতরে রক্ত প্রবাহমান থাকে এবং টিস্যু ভিজে যায়, তবে অনেক ফকিহ এটিকে প্রবাহিত রক্তের কাছাকাছি ধরেছেন। ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর বর্ণনায় সতর্কতা রয়েছে।

(খ) যদি রক্ত টিস্যু ভেদ করে বাইরে এসে গড়িয়ে পড়ে বা টেপের নিচ দিয়ে বের হয়:

  • তখন তা সাইল (প্রবাহিত) হিসেবে গণ্য হবে এবং ওযু ভঙ্গ হবে।

২. ওযু থাকবে কি?

সিদ্ধান্ত:

  • যদি রক্ত শুধু টিস্যুতে শোষিত হয় এবং বাইরে গড়িয়ে না পড়ে, তাহলে হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ (জাহিরুর রিওয়ায়াত) মত অনুযায়ী ওযু ভঙ্গ হবে না।
  • কিন্তু যদি রক্ত টিস্যু ভেদ করে বাইরে আসে বা গড়িয়ে পড়ে, তাহলে ওযু ভঙ্গ হবে।

ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী, ১/১৩৫): "اگر خون بہتا ہو اور بند نہ ہو تو وضو ٹوٹ جائے گا" — রক্ত প্রবাহিত হলে ওযু ভঙ্গ হবে। ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি, ১/২৮৮): প্রবাহিত রক্ত ওযু ভঙ্গের কারণ।

৩. সালাত পড়া যাবে কি?

  • যদি ওযু বহাল থাকে (রক্ত বাইরে না আসে): সালাত পড়া যাবে।
  • যদি ওযু ভেঙে যায় (রক্ত বাইরে গড়িয়ে পড়ে): সালাত পড়া যাবে না, নতুন ওযু করতে হবে।

৪. রক্ত বন্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করব?

না, বাধ্যতামূলক নয়—যদি রক্ত বাইরে প্রবাহিত না হয় এবং ওযু বহাল থাকে। তবে সতর্কতামূলক (এহতিয়াত) হিসেবে—

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মূল মত: রক্ত বাইরে না গড়ালে ওযু ভঙ্গ হয় না।
  • সাহেবাইন (ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ.)-এর মত: কিছু ক্ষেত্রে সতর্কতা রয়েছে।

মুফতি তাকি উসমানি (ফাতাওয়া উসমানি) ও মুফতি মুহাম্মদ শফি (ইমদাদুল মুফতিয়িন)-এর পরামর্শ: যদি রক্ত প্রবাহমান থাকে এবং বারবার ওযু ভাঙার আশঙ্কা থাকে, তবে হানাফি মাযহাবের জাহিরুর রিওয়ায়াত অনুসারে আমল করুন—রক্ত বাইরে না গড়ালে ওযু ভঙ্গ হবে না। আর যদি বাইরে গড়িয়ে পড়ে, তবে প্রতিটি সালাতের জন্য নতুন ওযু করতে হবে (মাযহাবের রুখসত অনুযায়ী)।


বিশেষ মাসআলা: ক্ষতস্থানে ওযু করার পদ্ধতি

রাদ্দুল মুহতার (১/২৭১) ও ফাতাওয়া আলমগিরি (১/১০)-এ বর্ণিত:

  • ক্ষতস্থানে পানি পৌঁছানো ক্ষতিকর হলে মাসেহ করবেন।
  • মাসেহ করাও ক্ষতিকর হলে ছেড়ে দিবেন, এবং পরে কাযা করার প্রয়োজন নেই (যদি পুরো সালাতের সময় ওযু বহাল থাকে)।

ব্যবহারিক পরামর্শ

  1. টিস্যু ও টেপ ব্যবহার করুন—যাতে রক্ত বাইরে না গড়ায়। এতে ওযু বহাল থাকবে (জাহিরুর রিওয়ায়াত অনুযায়ী)।
  2. প্রতিটি সালাতের আগে টিস্যু পরিবর্তন করুন এবং দেখুন রক্ত বাইরে এসেছে কি না।
  3. যদি রক্ত বাইরে গড়িয়ে পড়ে, তবে নতুন ওযু করে সালাত আদায় করুন।
  4. সন্দেহ হলে এহতিয়াত: নতুন ওযু করে নিন—এতে সাওয়াব বেশি, এবং কোনো মাযহাবের মতবিরোধ থেকে মুক্ত থাকবেন।
  5. ব্যান্ডেজের উপর মাসেহ: যদি ক্ষতস্থান ধোয়া ক্ষতিকর হয়, তবে ভেজা হাতে ব্যান্ডেজের উপর মাসেহ করুন (ফাতাওয়া উসমানি ১/২৯০)।

সারসংক্ষেপ সিদ্ধান্ত

| অবস্থা | ওযু | সালাত | |--------|------|-------| | রক্ত শুধু টিস্যুতে শোষিত, বাইরে গড়ায় না | বহাল (জাহিরুর রিওয়ায়াত) | জায়েয | | রক্ত টিস্যু ভেদ করে বাইরে আসে/গড়ায় | ভঙ্গ | নতুন ওযু করে পড়তে হবে | | সন্দেহ | এহতিয়াত: নতুন ওযু | নতুন ওযু করে পড়া উত্তম |

মূল কথা: রক্ত প্রবাহিত (সাইল) হওয়াই ওযু ভঙ্গের কারণ। টিস্যুতে শোষিত হওয়া প্রবাহিত হওয়ার হুকুমে পড়ে না—যদি না তা বাইরে গড়িয়ে পড়ে। তাই আপনি টিস্যু ও টেপ দিয়ে রক্ত আটকে রাখলে এবং বাইরে না গড়ালে ওযু বহাল থাকবে এবং সালাত পড়া যাবে। তবে সতর্কতামূলক নতুন ওযু করা উত্তম।


আরবি দলিল (মূল ইবারত)

আল-হিদায়া:

"وَمَا خَرَجَ مِنْ بَدَنِهِ مِنْ دَمٍ أَوْ قَيْحٍ أَوْ مَاءٍ سَائِلٍ نَاقِضٌ"

রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন) ১/১৫৪:

"قَوْلُهُ: سَائِلٌ، أَيْ يَسِيلُ بِنَفْسِهِ إِلَى مَحَلٍّ آخَرَ، فَلَوْ كَانَ فِي مَكَانِهِ لَا يَنْقُضُ"

ফাতাওয়া আলমগিরি ১/১০:

"الدَّمُ إِذَا سَالَ عَنِ الْجُرْحِ نَقَضَ الْوُضُوءَ، وَإِنْ لَمْ يَسِلْ لَمْ يَنْقُضْ"

ইমদাদুল ফাতাওয়া ১/১৩৫:

"خون بہتا ہو تو وضو ٹوٹ جاتا ہے، بہتا نہ ہو تو نہیں ٹوٹتا"


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.