গর্ভপাতের পর নামাজ পড়া নিয়ে জানতে চাই

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 7247
Questioner: Nahiyan Nabu
Question Asked: 22 Oct 2026, 01:57 PM
Reviewed & Published: 22 Oct 2026, 02:40 PM
Views: 26
Tokens: 5,043
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ
আমার বেবী কনসিভ হয়েছে প্রায় ১০সপ্তাহ রানিং হঠাৎ রক্তপাত হওয়ার কারনে ডাক্তার বলেছে বেবীর হার্টবিট আসেনি অর্থাৎ বেবিটা আর জীবিত নেই এইজন্য আমাকে এইটা ক্লিয়ার করার জন্য ওষুধ দিয়েছে ওষুধ খাওয়ার পর থেকে ব্লিডিং হচ্ছে এই অবস্থায় কি আমি নামাজ পড়তে পারবো??

ডাক্তার আরও বলেছে ওষুধের মাধ্যমে নাহলে আমাকে দুইদিন পর হয়তো D&C করতে হবে যদি সেটা করা হয় তারপর আমি নামাজ পড়তে পারবো কিনা?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর

হ্যাঁ, আপনি নামাজ পড়তে পারবেন। তবে এ অবস্থায় আপনার জন্য প্রত্যেক ওয়াক্তের নামাজের জন্য নতুন করে অজু করা ওয়াজিব (ফরজ), এবং রক্ত বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ওয়াক্তের ভেতরেই নামাজ আদায় করা জরুরি। আর D&C (বা ওষুধের মাধ্যমে গর্ভ সাফ) হওয়ার পরও আপনি নামাজ পড়তে পারবেন — তখন হুকুম হবে নেফাস (নিফাস) বা ইস্তিহাযা-এর বিধান অনুযায়ী, যা নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো।


বিস্তারিত ফতোয়া

১. প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি

গর্ভপাত হওয়ার পর যে রক্ত আসে, তা নেফাস হিসেবে গণ্য হবে কি না — এতে ফকিহদের বিস্তারিত আলোচনা আছে। হানাফি মাযহাবের মুফতিয়ানে কেরাম (যেমন মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ. ও মুফতি তাকী উসমানী দা.বা.)-এর বক্তব্য অনুযায়ী:

  • যদি বাচ্চার কোনো অঙ্গ (হাত, পা, আঙুল ইত্যাদি) তৈরি হয়ে যায় এবং তা স্পষ্ট হয়, তাহলে সেই রক্ত নেফাস হিসেবে গণ্য হবে।
  • আর যদি বাচ্চা শুধু মাংসের পিণ্ড (মুদগা) বা জমাট রক্তের টুকরা হয়, যাতে কোনো অঙ্গ তৈরি হয়নি, তাহলে তা নেফাস নয়; বরং তা ইস্তিহাযা (অসুস্থতার রক্ত)-এর হুকুমে হবে।

আপনার বাচ্চা মাত্র ১০ সপ্তাহের — সাধারণত এ সময়ে অঙ্গ গঠিত হয়ে যায় না (চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় অঙ্গ গঠন শুরু হয় ৮ সপ্তাহের পর, তবে স্পষ্ট অঙ্গ সাধারণত আরও পরে)। তাই আপনার ক্ষেত্রে সম্ভবত ইস্তিহাযার হুকুম প্রযোজ্য হবে — অর্থাৎ রক্ত আসা সত্ত্বেও আপনি নামাজ পড়বেন, রোজা রাখবেন, কুরআন তিলাওয়াত করবেন। তবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য চিকিৎসকের কাছে জেনে নিন বাচ্চার কোনো অঙ্গ তৈরি হয়েছিল কি না।

২. ইস্তিহাযার অবস্থায় নামাজের বিধান

হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, ফাতিমা বিনতে আবু হুবাইশ রা. রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করলেন যে তিনি ইস্তিহাযায় আক্রান্ত, রক্ত বন্ধ হয় না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন:

«إِنَّمَا ذَلِكِ عِرْقٌ وَلَيْسَ بِالْحَيْضَةِ، فَإِذَا أَقْبَلَتِ الْحَيْضَةُ فَدَعِي الصَّلَاةَ، وَإِذَا أَدْبَرَتْ فَاغْسِلِي عَنْكِ الدَّمَ وَصَلِّي» — সহীহ বুখারী, হাদিস ৩০৬; সহীহ মুসলিম, হাদিস ৩৩৩

অর্থাৎ “এটা তো একটি শিরার রক্ত, হায়েজ নয়। যখন হায়েজ আসবে তখন নামাজ ছাড়বে, আর যখন চলে যাবে তখন রক্ত ধুয়ে নামাজ পড়বে।”

ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর মতে, ইস্তিহাযার রক্ত অজু ভঙ্গ করে না, কিন্তু ওয়াক্ত প্রবেশের পর প্রত্যেক নামাজের জন্য নতুন অজু করা ওয়াজিব। (দেখুন: আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাত; রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ১, পৃ. ২৯৮-৩০০; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৩৭)

সুতরাং আপনার করণীয়:

  1. প্রত্যেক ওয়াক্তের নামাজের জন্য নতুন অজু করুন (এক অজুতে এক ওয়াক্তের ফরজ নামাজ আদায় করুন; তবে একই ওয়াক্তের ভেতর ফরজ-সুন্নত-নফল সবই পড়া যাবে)।
  2. রক্ত বের হওয়া সত্ত্বেও নামাজ, রোজা, কুরআন তিলাওয়াত, তাওয়াফ সবই জায়েয।
  3. নামাজের সময় প্যাড/স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করুন এবং রক্ত যেন কাপড়ে না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখুন; কাপড়ে লাগলে সেই অংশ ধুয়ে নিন।
  4. নামাজে দাঁড়ানো, রুকু-সিজদা স্বাভাবিকভাবে করতে অসুবিধা হলে বসে বা ইশারায় নামাজ আদায় করুন — এতে কোনো সমস্যা নেই।

৩. ওষুধ খাওয়ার পর ব্লিডিং হলে

ওষুধ খাওয়ার পর যে ব্লিডিং হচ্ছে — এটি যদি ইস্তিহাযার রক্ত হয় (যা সম্ভবত), তাহলে নামাজ মোটেও ছাড়বেন না। শুধু প্রতি ওয়াক্তে নতুন অজু করবেন। আর যদি চিকিৎসকের ভাষ্যমতে বাচ্চার অঙ্গ তৈরি হয়ে থাকে এবং তা নেফাস হয়, তাহলে নেফাসের সর্বনিম্ন সময় তিন দিন — এর ভেতর রক্ত বন্ধ হলে গোসল করে নামাজ শুরু করবেন; আর তিন দিন পূর্ণ হওয়ার পর রক্ত বন্ধ হলে গোসল করে নামাজ পড়বেন। (দেখুন: আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাত; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ২৮২)

৪. D&C করার পর নামাজ

D&C (Dilation and Curettage) হলো জরায়ুর ভেতর পরিষ্কার করার চিকিৎসা পদ্ধতি। এর পরও আপনার হুকুম উপরোক্ত নীতির ভেতরেই পড়বে:

  • যদি বাচ্চার অঙ্গ তৈরি হয়ে থাকে (নেফাসের হুকুম): D&C-এর পর যে রক্ত আসবে তা নেফাস। তখন সর্বোচ্চ ৪০ দিন পর্যন্ত নামাজ-রোজা বন্ধ থাকবে; ৪০ দিনের আগে রক্ত বন্ধ হলে গোসল করে নামাজ শুরু করবেন। (দেখুন: আল-হিদায়া; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৩৭; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ২৮৩)
  • যদি অঙ্গ তৈরি না হয়ে থাকে (ইস্তিহাযার হুকুম): D&C-এর পরও রক্ত আসলেও নামাজ ছাড়বেন না; শুধু প্রতি ওয়াক্তে নতুন অজু করবেন।

সতর্কতা: D&C-এর পর রক্ত যদি ৪০ দিনের বেশি চলতে থাকে, তাহলে ৪০ দিন পর্যন্ত নেফাস গণ্য করে তারপর ইস্তিহাযার হুকুমে নামাজ শুরু করবেন। (দেখুন: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ২৮৩)

৫. ব্যবহারিক পরামর্শ

  • চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করুন: “বাচ্চার কোনো অঙ্গ (হাত/পা) তৈরি হয়েছিল কি না?” — এটাই আপনার হুকুম নির্ধারণের মূল বিষয়।
  • নিশ্চিত না হলে এবং রক্ত চলমান থাকলে সতর্কতামূলক পথ হলো: ইস্তিহাযার হুকুম ধরে নিয়ে প্রতি ওয়াক্তে নতুন অজু করে নামাজ পড়া — কারণ ইস্তিহাযার অবস্থায় নামাজ পড়া ফরজ, আর ভুল করে নেফাসের সময় নামাজ পড়লে তা কবুল হবে না। তবে ইস্তিহাযার হুকুমে পড়লে ইনশাআল্লাহ তা আদায় হয়ে যাবে।
  • বেশি রক্তক্ষরণে দুর্বলতা থাকলে বসে বা শুয়ে ইশারায় নামাজ পড়ুন — ইসলাম অসুস্থ ব্যক্তির জন্য সহজতা দিয়েছে।

সারসংক্ষেপ

| অবস্থা | নামাজের হুকুম | |---|---| | ওষুধ খাওয়ার পর ব্লিডিং (অঙ্গ তৈরি হয়নি — সম্ভাব্য) | নামাজ পড়বেন, প্রতি ওয়াক্তে নতুন অজু | | বাচ্চার অঙ্গ তৈরি হয়েছে (নেফাস) | রক্ত বন্ধ হলে গোসল করে নামাজ; সর্বোচ্চ ৪০ দিন পর্যন্ত বন্ধ | | D&C-এর পর (অঙ্গ তৈরি হয়নি) | নামাজ পড়বেন, প্রতি ওয়াক্তে নতুন অজু | | D&C-এর পর (অঙ্গ তৈরি হয়েছে) | নেফাসের হুকুম — রক্ত বন্ধ হলে গোসল করে নামাজ |

আল্লাহ তাআলা আপনার স্ত্রীকে সুস্থতা দান করুন এবং আপনার সন্তানকে জান্নাতের পাখি বানিয়ে দিন। আমিন।


References (মূল আরবি কিতাব)

  1. সহীহ বুখারী, হাদিস ৩০৬ — ইস্তিহাযার বিধান
  2. সহীহ মুসলিম, হাদিস ৩৩৩
  3. আল-হিদায়া (মারগিনানি), কিতাবুত তাহারাত — ইস্তিহাযা ও নেফাস অধ্যায়
  4. রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ১, পৃ. ২৮২-৩০০ — ইস্তিহাযা ও নেফাসের বিস্তারিত
  5. ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৩৭ — ইস্তিহাযার অজু
  6. ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী রহ.), খণ্ড ১ — নেফাস ও ইস্তিহাযা
  7. ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী দা.বা.), খণ্ড ১ — নেফাস-ইস্তিহাযা সংক্রান্ত
  8. মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ.) — সূরা বাকারার হায়েজ-ইস্তিহাযা আয়াতের তাফসীর

আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.