স্ত্রীর সাথে রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়ার হুকুম

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 7191
Questioner: Abdullah
Question Asked: 21 Oct 2026, 11:34 AM
Reviewed & Published: 21 Oct 2026, 01:00 PM
Views: 14
Tokens: 8,916
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু 'আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লহ। আমি জেনারেল শিক্ষায় শিক্ষিত কিন্তু তাবলীগের মেহনতের মাধ্যমে আলহামদুলিল্লাহ দীনের বুঝ পেয়েছি। আর আমার স্ত্রী কওমি মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ড এর আবার পাশাপাশি জেনারেল লাইনেও পড়াশোনা করছেন। আমাদের উভয়ের পরিবারই জেনারেল শিক্ষিত কিন্তু আমার স্ত্রীর মায়ের দিকের লোকজন একজন হক্কানী আলেমের সাথে সম্পর্কে রেখে চলেন বিধায় তারা তাদের বর্তমান প্রজন্মকে কওমী লাইনে পড়াচ্ছেন ও পড়িয়েছেন।

তো কওমী লাইনে পড়া সত্ত্বেও পরিবারের সবাই মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের না হওয়ায় এবং ঢাকায় বড় হওয়ায় আমার স্ত্রীর মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্য বা প্রবণতা আছে যা আসলে অনেকটা সাধারণ জনগণের মতন। এর মধ্যে হোটেলে বা রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া অন্যতম।

বর্তমান রেস্টুরেন্টগুলোতে খাবারের হালাল হারাম হওয়া নিয়ে একটা শঙ্কা থাকে আবার প্রায় সব রেস্টুরেন্টেই উচ্চস্বরে লাউডস্পিকারে গান বাজনা চলতে থাকে। এই কারণে আমি চেষ্টা করি যতটা সম্ভব বাহিরে খাওয়া এড়িয়ে চলতে। কিন্তু আমার স্ত্রীর আসলে সপ্তাহে ১ বার বাহিরে না খেলে হয়না। এই অভ্যাসটা তার বিয়ের আগে থেকেই ছিলো। তাকে আমি বেশ কয়েকবার বিষয়টা বোঝানোর চেষ্টা করেছি কিন্তু তার প্রতি আবেগের কারণে আমার মাঝেমাঝেই তাকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে যেতে হয়। এবং স্বাভাবিকভাবেই সে রেস্টুরেন্টগুলোতে লাউডস্পিকারে উচ্চস্বরে গান বাজতে থাকে। এবং বেশিরভাগ সময় রেস্টুরেন্টের ম্যানেজারকে বলা সত্ত্বেও তারা গান বন্ধ করার প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপ করেন না। তো ওইরকম গানের পরিবেশেই আমাদেরকে খেয়ে উঠে আসতে হয়।

এখন এই অবস্থায় আমার করণীয় কী হবে? বউ এর মন রক্ষার জন্য এরকম গান বাজনা যুক্ত রেস্টুরেন্টে যাওয়া কী শরীয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য হবে?? যদি না হয় তাহলে আমার করণীয় কী হবে জানালে ভালো হয়।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

** উত্তর:** না, শুধু স্ত্রীর মন রক্ষার জন্য গান-বাজনা ও হালাল-হারামের শঙ্কাযুক্ত ও নারীদের জন্য আলাদা পর্দাঘেরা পরিবেশ নেই এমন রেস্টুরেন্টে যাওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।

এটি সরাসরি গুনাহের পরিবেশে উপস্থিত থাকা ও গুনাহে সহযোগিতা (تعاون على الإثم) এর অন্তর্ভুক্ত।

প্রয়োজন ছাড়া তাকে বাহিরে খেতে না নিয়ে যাওয়া,বিশেষ প্রয়োজনে অপারগতা বশত বাহিরে খেতে হলে নারীদের জন্য পর্দাঘেরা আলাদা পরিবেশে খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে ,এমন রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাওয়া পাশাপাশি শর্ত হলো গান-বাজনা ও শরীয়তের শঙ্কামুক্ত স্থানে হতে হবে।

বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ঘরে সুন্দর খাবার ব্যবস্থা করা, কিংবা তাকে ধীরে ধীরে দ্বীনি বুঝ দান করা।

তাকে জোরপূর্বক কিছু চাপিয়ে দেওয়া বা ঝগড়া করা ইসলামে কাম্য নয়; ধৈর্য, হিকমত ও ভালোবাসার সাথে সংশোধনই কাম্য।


১. গান-বাজনার বিধান (সংক্ষেপে)

কুরআন-হাদীস ও হানাফী ফিকহ অনুযায়ী বাদ্যযন্ত্র ও গান-বাজনা শ্রবণ করা হারাম। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

وَمِنَ النَّاسِ مَن يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ ۚ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا ۚ أُولَـٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ

"আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আছে যারা আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করার জন্য অর্থহীন কথাবার্তা (لهو الحديث) ক্রয় করে এবং তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। তাদের জন্যই রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।" (সূরা লুকমান: ৬)

সাহাবী ইবনে মাসউদ (রাযি.) ও অন্যান্য সালাফ এই আয়াতে "لهو الحديث" এর তাফসীরে গান-বাজনাকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। (তাফসীরে ইবনে কাসীর, সূরা লুকমান: ৬)

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّونَ الْحِرَ وَالْحَرِيرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ

"আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোক আসবে যারা যিনা, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল (বৈধ) বলে গণ্য করবে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৫৯০)

ইমাম আবু হানীফা (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে যে, গান-বাজনা শ্রবণ করা ফিসক (গুনাহ)। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৪৮-৩৪৯; ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৫২)


২. গুনাহের পরিবেশে উপস্থিত থাকা ও সহযোগিতা

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ

"নেকী ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহযোগিতা করো, আর গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)

যেখানে প্রকাশ্যে গান-বাজনা বাজছে এবং ম্যানেজারকে বলার পরও বন্ধ করা হচ্ছে না—সেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে গিয়ে বসে খাওয়া গুনাহের পরিবেশকে সমর্থন দেওয়ার শামিল। হাদীসে এসেছে:

مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلاَ يَجْلِسْ عَلَى مَائِدَةٍ يُدَارُ عَلَيْهَا الْخَمْرُ

"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন এমন খানার দস্তরখানে না বসে যেখানে মদ আবর্তিত হয়।" (সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৮০১ — হাসান)

গান-বাজনা মদের মতোই একটি প্রকাশ্য গুনাহ; তাই একই নীতি প্রযোজ্য। ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ গুনাহের মজলিসে উপস্থিত থাকার ব্যাপারে স্পষ্ট নিষেধ উল্লেখ করেছেন। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৪৯-৩৫০)


৩. খাবারের হালাল-হারামের শঙ্কা

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

الْحَلَالُ بَيِّنٌ وَالْحَرَامُ بَيِّنٌ وَبَيْنَهُمَا أُمُورٌ مُشْتَبِهَاتٌ لَا يَعْلَمُهُنَّ كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ فَمَنِ اتَّقَى الشُّبُهَاتِ اسْتَبْرَأَ لِدِينِهِ وَعِرْضِهِ

"হালাল সুস্পষ্ট, হারামও সুস্পষ্ট; আর এ দুয়ের মাঝে কিছু সন্দেহজনক বিষয় রয়েছে যা অনেক মানুষ জানে না। যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকবে, সে তার দ্বীন ও সম্মান রক্ষা করবে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৫৯৯)

যেখানে হালাল-হারামের শঙ্কা রয়েছে এবং গান-বাজনা প্রকাশ্য—সেখানে বারবার যাওয়া তাকওয়ার পরিপন্থী। ইমাম তহতাবী ও ইবনে আবিদীন (রহ.) স্পষ্ট করেছেন, সন্দেহযুক্ত খাদ্য এড়িয়ে চলাই উত্তম ও কর্তব্য। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৪৮)


৪. স্ত্রীর মন রক্ষা ও তার প্রতি আচরণ

ইসলামে স্ত্রীর সাথে সদাচরণ ও ধৈর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا

"নারীদের ব্যাপারে তোমরা কল্যাণের وصية (নির্দেশ) গ্রহণ করো।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫১৮৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৪৬৮)

কিন্তু "সদাচরণ" মানে গুনাহে সহযোগিতা করা নয়। ইমাম আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বেহেশতী যেওর"-এ স্ত্রীর অবৈধ দাবি পূরণ না করে হিকমতের সাথে বুঝানোর নির্দেশ দিয়েছেন। (বেহেশতী যেওর, খণ্ড ১, "স্ত্রীর হক" অধ্যায়)

আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা করো।" (সূরা তাহরীম: ৬)

স্ত্রীকে গুনাহের পরিবেশ থেকে রক্ষা করা স্বামীর দ্বীনি দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.