খামারে বিনিয়োগ করে লাভের অর্ধেক নেওয়া এবং মূলধন ফেরত নেওয়ার শর্ত কি সুদ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
সুদ ও ইসলামের বিরোধী কিনা — বিস্তারিত ফিকহি বিশ্লেষণ
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী একজনকে টাকা দিচ্ছেন খামার (গবাদিপশু/কৃষি) পরিচালনার জন্য। শর্ত হলো—
- খামার থেকে লাভ হলে প্রতি তিন মাস পর লাভের অর্ধেক প্রশ্নকারী পাবেন;
- নির্দিষ্ট সময় পর মূলধন (আসল টাকা) ফেরত পাবেন।
প্রশ্ন: এটি কি সুদের অন্তর্ভুক্ত?
সংক্ষিপ্ত উত্তর (ফতোয়া)
হ্যাঁ, প্রশ্নে বর্ণিত লেনদেনটি সুদের অন্তর্ভুক্ত — এটি একটি সুস্পষ্ট রিবা (সুদ) ভিত্তিক চুক্তি। কারণ এতে দুটি সুদের উপাদান একত্রে বিদ্যমান:
- মূলধনের নিশ্চিত প্রত্যাবর্তনের গ্যারান্টি (যা মুদারাবা/শিরকাতের শর্তবিরোধী), এবং
- মুনাফার একটি নির্দিষ্ট অনুপাত (অর্ধেক) নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ — যা আসলে মূলধনের উপর নির্ধারিত "রিটার্ন"-এ পরিণত হয়েছে।
এটি শরিয়তের পরিভাষায় "মুদারাবা" নয়; বরং "রিবা" — কারণ মুদারাবায় ক্ষতির ঝুঁকি (দামান) মুদারিব (ব্যবসায়ী) বহন করে এবং মূলধন হারানোর ঝুঁকি রাব্বুল মাল (মূলধনদাতা) বহন করে। এখানে মূলধন ফেরতের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, ফলে ঝুঁকি শূন্য করে দেওয়া হয়েছে — আর ঝুঁকিমুক্ত নিশ্চিত মুনাফাই সুদের মূল ভিত্তি।
কুরআন থেকে দলিল
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" — সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৫
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।" — সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৮
فَإِن لَّمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ "যদি তোমরা তা না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা গ্রহণ করো।" — সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৯
মা'আরিফুল কুরআন-এ মুফতি মুহাম্মদ শাফি (রহ.) উল্লেখ করেন — সুদ হলো এমন এক বিনিময় যা বিনা প্রতিদানে অতিরিক্ত আদায় করা; আর এখানে মূলধন নিশ্চিত রেখে নির্দিষ্ট মুনাফা নেওয়া প্রকৃতপক্ষে "নিশ্চিত বিনিময়" — যা রিবার অন্তর্ভুক্ত। (মা'আরিফুল কুরআন, ১ম খণ্ড, সূরা বাকারা ২৭৫-২৭৯ এর তাফসীর)
হাদীস থেকে দলিল
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ نَفْعًا فَهُوَ رِبًا "প্রত্যেক এমন ঋণ যা উপকার (মুনাফা) টেনে আনে — তা সুদ।" — ইমাম বাইহাকী, সুনানুল কুবরা; ইমাম ইবনু আবি শাইবা, মুসান্নাফ; (হাদীসটি যদিও সনদগতভাবে বিতর্কিত, তবে ফকীহগণ এর অর্থের উপর ইজমা করেছেন)
مَنْ أَسْلَفَ فَلَا يَشْتَرِطْ إِلَّا الْقَضَاءَ "যে ব্যক্তি ঋণ দেয়, সে যেন কেবল ফেরত ছাড়া অন্য কোনো শর্ত না করে।" — ইমাম তহাবী, শারহু মা'আনিল আছার; ইমাম দারাকুতনী
لَا تَبِيعُوا الذَّهَبَ بِالذَّهَبِ إِلَّا مِثْلًا بِمِثْلٍ... "স্বর্ণকে স্বর্ণের বিনিময়ে বিক্রি করো না সমান-সমান ছাড়া..." — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৫৮৪
ইমাম তহাবী (রহ.) তাঁর শারহু মা'আনিল আছার-এ উল্লেখ করেন — "কোনো ঋণে অতিরিক্ত শর্তারোপ করা হলে তা রিবা; কেননা রিবার মূল ভিত্তি হলো বিনা প্রতিদানে অতিরিক্ত গ্রহণ।"
হানাফী ফিকহের বিশ্লেষণ
১. মুদারাবা ও শিরকাতের শর্ত
আল-হিদায়া (ইমাম বুরহানুদ্দীন আল-মারগীনানী) ও রাদ্দুল মুহতার (ইমাম ইবনে আবিদীন শামী) — উভয় কিতাবেই মুদারাবার শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে:
- মুদারাবায় মুনাফার অনুপাত (যেমন ১/২, ১/৩) নির্ধারিত হবে — টাকার পরিমাণ নয়;
- ক্ষতির ঝুঁকি মুদারিব (ব্যবসায়ী) বহন করবে;
- মূলধন হারানোর ঝুঁকি রাব্বুল মাল (মূলধনদাতা) বহন করবে;
- মূলধন ফেরতের নিশ্চয়তা দেওয়া যাবে না — কারণ এতে মুদারাবা বাতিল হয়ে যায় এবং তা ঋণে পরিণত হয়।
রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
"وَلَوْ شَرَطَ الْمُضَارِبُ ضَمَانَ الْمَالِ بَطَلَتِ الْمُضَارَبَةُ" "যদি মুদারিবের উপর মূলধনের নিশ্চয়তা শর্ত করা হয়, তবে মুদারাবা বাতিল হয়ে যাবে।" — রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল মুদারাবা
আর ফতোয়ায়ে আলমগীরী-তে উল্লেখ আছে:
"الْمُضَارَبَةُ شَرِكَةٌ فِي الرِّبْحِ لَا فِي الْمَالِ" "মুদারাবা হলো মুনাফায় অংশীদারত্ব — মূলধনে নয়।" — ফতোয়ায়ে আলমগীরী, কিতাবুল মুদারাবা
২. প্রশ্নের লেনদেন কেন সুদ
প্রশ্নে বর্ণিত চুক্তিতে:
| শর্ত | শরিয়তের বিধান | ফলাফল | |------|----------------|--------| | মূলধন নির্দিষ্ট সময় পর ফেরতের নিশ্চয়তা | মুদারাবায় নিষিদ্ধ | চুক্তি ঋণে পরিণত → সুদ | | মুনাফার অর্ধেক নির্দিষ্টভাবে নেওয়া | মুদারাবায় বৈধ (তবে ঝুঁকি থাকতে হবে) | ঝুঁকি না থাকায় এটি "নিশ্চিত রিটার্ন" → সুদ | | ক্ষতির ঝুঁকি কে বহন করবে — অস্পষ্ট | মুদারাবায় মুদারিব বহন করবে | ঝুঁকি বণ্টন না হলে সুদ |
মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) তাঁর "ফিকহুল বুয়ূ ওয়া আত-তামويلুল ইসলামী" ও "ইসলামী অর্থনীতি ও ব্যাংকিং" গ্রন্থে স্পষ্টভাবে বলেন — "মুদারাবায় মূলধনের নিশ্চয়তা দেওয়া হলে তা আর মুদারাবা থাকে না; বরং তা ঋণে পরিণত হয় এবং মুনাফা নেওয়া সুদ হয়।" (দ্রষ্টব্য: ফিকহুল বুয়ূ, মুদারাবা অধ্যায়)
মুফতি মুহাম্মদ শাফি (রহ.) "ইসলামী অর্থনীতি" ও "মাসআলায়ে সুদ" গ্রন্থে বলেন — "ব্যাংক বা ব্যক্তি যদি গ্রাহককে মূলধন দিয়ে নির্দিষ্ট মুনাফা শর্ত করে, তবে তা সুদ; কেননা এতে ব্যবসার ঝুঁকি নেই, শুধু নিশ্চিত মুনাফা আছে।"
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বেহেশতী জেওর"-এর সুদ অধ্যায়ে বলেন — "কোনো ব্যক্তিকে টাকা দিয়ে এ শর্তে যে, সে ব্যবসা করবে এবং লাভের অর্ধেক দেবে, আর মূলধন ফেরত দেবে — এটি জায়েয নয়; বরং এটি সুদ। কেননা এতে মূলধন নিশ্চিত এবং মুনাফা নির্দিষ্ট — যা সুদের আলামত।"
৩. সুদ ও ব্যবসার পার্থক্য
আল-হিদায়া-তে ইমাম মারগীনানী (রহ.) বলেন:
"الرِّبَا فَضْلٌ خَالٍ عَنْ عِوَضٍ مَشْرُوطٍ فِي الْعَقْدِ" "সুদ হলো চুক্তিতে শর্তকৃত এমন অতিরিক্ত যা কোনো প্রতিদান ছাড়াই নেওয়া হয়।" — আল-হিদায়া, কিতাবুর রিবা
প্রশ্নের চুক্তিতে মূলধনের বিনিময়ে "অর্ধেক মুনাফা" — যা মূলধনের উপর নির্দিষ্ট প্রতিদান হিসেবে শর্ত করা হয়েছে। এটি "ফাদল" (অতিরিক্ত) — যা প্রতিদানবিহীন শর্ত → সুদ।
শরিয়তসম্মত বিকল্প পদ্ধতি
প্রশ্নকারী যদি খামারে বিনিয়োগ করতে চান, তবে শরিয়তসম্মত মুদারাবা বা শিরকাত এর শর্ত পূরণ করে চুক্তি করতে হবে:
(ক) মুদারাবা (বিশুদ্ধ)
- মূলধন প্রশ্নকারীর, শ্রম ও ব্যবস্থাপনা অপর পক্ষের;
- মুনাফার অনুপাত নির্ধারিত হবে (যেমন ৫০%-৫০%, বা ৬০%-৪০%) — টাকার অঙ্ক নয়;
- ক্ষতির ঝুঁকি উভয় পক্ষ বহন করবে — মুদারিব শ্রম হারাবে, রাব্বুল মাল মূলধন হারাবে;
- মূলধন ফেরতের নিশ্চয়তা দেওয়া যাবে না — লাভ হলে লাভের অংশ, ক্ষতি হলে ক্ষতির অংশ;
- কোনো নির্দিষ্ট সময়ে "মূলধন ফেরত" শর্ত করা যাবে না — তবে ব্যবসা বন্ধের সময় মূলধন ফেরত হবে।
(খ) শিরকাত (অংশীদারত্ব)
- উভয় পক্ষ মূলধন দেবে;
- মুনাফা অনুপাতে বণ্টিত হবে;
- ক্ষতি মূলধনের অনুপাতে বণ্টিত হবে;
- কোনো পক্ষকে নিশ্চিত রিটার্ন দেওয়া যাবে না।
(গ) বাই' (বিক্রয়) ভিত্তিক
- প্রশ্নকারী পশু/যন্ত্র কিনে অপর পক্ষকে নির্দিষ্ট মুনাফায় বিক্রি করবেন (মুরাবাহা);
- অথবা ইজারা (ভাড়া) ভিত্তিক চুক্তি করবেন।
বিশেষ সতর্কতা
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ বলেন:
"وَكُلُّ قَرْضٍ شُرِطَ فِيهِ زِيَادَةٌ فَهُوَ رِبًا" "প্রত্যেক ঋণ যাতে অতিরিক্ত শর্ত করা হয় — তা সুদ।" — রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুর রিবা
ফতোয়ায়ে উসমানী-তে মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেন — "আজকাল অনেক 'ইনভেস্টমেন্ট' বা 'মুদারাবা' নামে যে চুক্তি হয়, তাতে মূলধনের নিশ্চয়তা ও নির্দিষ্ট মুনাফা শর্ত করা হয় — তা নামে মুদারাবা, প্রকৃতপক্ষে সুদ। মুসলিমদের এ থেকে বেঁচে থাকা ফরজ।" (ফতোয়ায়ে উসমানী, ৩য় খণ্ড, সুদ অধ্যায়)
ইমদাদুল ফতোয়া-তে মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন — "নিশ্চিত মুনাফার শর্তে টাকা দেওয়া সুদ; চাই তার নাম যাই হোক — মুদারাবা, শিরকাত, বা ইনভেস্টমেন্ট।"
উপসংহার
প্রশ্নে বর্ণিত লেনদেনটি সুদ (রিবা) — যা কুরআন-হাদীসে সুস্পষ্টভাবে হারাম। এতে:
- মূলধন ফেরতের নিশ্চয়তা → ঋণে পরিণত;
- মুনাফার নির্দিষ্ট অংশ → সুদ;
- ক্ষতির ঝুঁকি না থাকা → মুদারাবার শর্ত বাতিল।
করণীয়: এ চুক্তি বাতিল করে শরিয়তসম্মত মুদারাবা বা শিরকাতের শর্ত অনুযায়ী নতুন চুক্তি করুন — যেখানে মূলধন ফেরতের নিশ্চয়তা থাকবে না, ক্ষতির ঝুঁকি উভয় পক্ষ বহন করবে, এবং মুনাফার অনুপাত (শতকরা) নির্ধারিত হবে — টাকার অঙ্ক নয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সুদ থেকে বেঁচে থেকে হালাল উপার্জনের তাওফিক দান করুন। আমীন।
আল্লাহ ভালো জানেন।