পর্দা করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি আপলোড করা কি জায়েজ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
পর্দা তো নারীর জন্য ফরজ একটি ইবাদত। স্যোশাল মিডিয়ায় পর্দা করে ছবি আপলোড করা কি জায়েজ আছে ? এটার বিধান কী? কি
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
নারীর জন্য পর্দা ফরজ—এটি নিঃসন্দেহে। তবে পর্দা করার পরও সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের ছবি আপলোড করা সাধারণভাবে জায়েজ নয়; বরং এতে নানা কারণে নিষেধাজ্ঞা ও গুনাহের আশঙ্কা রয়েছে। একান্ত প্রয়োজনীয় ও শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া নারীর ছবি অনলাইনে প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকা কর্তব্য।
বিস্তারিত:
১. ছবি তোলা ও প্রকাশের মূল বিধান:
ফুকাহায়ে কেরামের একটি বড় অংশ—বিশেষত হানাফি মাযহাবের পরবর্তী মুহাক্কিকীন—জীবدار ছবি তোলা ও সংরক্ষণকে নিষিদ্ধ বা অন্ততপক্ষে সন্দেহজনক (مشتبه) বলেছেন। হাদিসে এসেছে:
«إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُونَ»
“কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি পাবে ছবি নির্মাণকারীরা।”
— সহিহ বুখারি: ৫৯৫০; সহিহ মুসলিম: ২১০৯
আরেক হাদিসে:
«كُلُّ مُصَوِّرٍ فِي النَّارِ»
“প্রত্যেক ছবি নির্মাতা জাহান্নামে।”
— সহিহ মুসলিম: ২১১০
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, এ নিষেধাজ্ঞা জীবদেহের ছবি সম্পর্কিত। (শরহু সহিহ মুসলিম, ১৪/৮১)
২. নারীর ছবি প্রকাশের অতিরিক্ত ক্ষতি:
পর্দা করে ছবি তুললেও তা ইন্টারনেটে প্রকাশ করলে নিম্নোক্ত ক্ষতিগুলো থাকে:
-
নন-মাহরামের দৃষ্টি: ছবি দেখে নন-মাহরাম পুরুষ ও নারীর দৃষ্টি পড়ে; অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ﴾
“মুমিনদের বলো, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে।” (সূরা নূর: ৩০)
ছবি প্রকাশ করে অন্যদের গুনাহে প্ররোচিত করা ন্যায়সঙ্গত নয়। -
ফিতনার আশঙ্কা: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ»
“আমি আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর কোনো ফিতনা রেখে যাইনি।”
— সহিহ বুখারি: ৫০৯৬; সহিহ মুসলিম: ২৭৪০ -
ছবির অপব্যবহার: ইন্টারনেটে ছবি একবার প্রকাশ হলে তা কপি, এডিট, ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি, ব্ল্যাকমেইল ইত্যাদির জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। শরীয়তের একটি মূলনীতি হলো:
«دَرْءُ الْمَفَاسِدِ مُقَدَّمٌ عَلَى جَلْبِ الْمَصَالِحِ»
“ক্ষতি দূর করা উপকার অর্জনের চেয়ে অগ্রগণ্য।”
(আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ইবন নুজাইম, পৃ. ৮৭) -
সৌন্দর্য প্রদর্শন: পর্দার মূল উদ্দেশ্য নারীর সৌন্দর্যকে নন-মাহরামের দৃষ্টি থেকে আড়াল করা। ছবি প্রকাশ পর্দার روحের পরিপন্থী। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا﴾
“তারা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না, যা প্রকাশ পায় তা ছাড়া।” (সূরা নূর: ৩১)
৩. হানাফি ফিকহের সিদ্ধান্ত:
- ইবন আবিদিন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’-এ ছবি সম্পর্কিত আলোচনায় বলেন, জীবদেহের ছবি নির্মাণ ও প্রদর্শন নিষিদ্ধ; প্রয়োজনে ছোট ছবি ব্যতিক্রম হতে পারে। (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭৫-৩৭৬)
- মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) ‘মাআরিফুল কুরআন’-এ সূরা নূরের আলোচনায় বলেন, নারীর ছবি প্রকাশ করা পর্দার বিধানের পরিপন্থী এবং ফিতনার কারণ।
- মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) ‘ফাতাওয়া উসমানি’-তে ছবি ও মিডিয়া সংক্রান্ত আলোচনায় নারীর ছবি প্রকাশকে নিষিদ্ধ ও ফিতনার কারণ বলেছেন। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৩০-৩৩৫ প্রসঙ্গ)
- ‘ইমদাদুল ফাতাওয়া’ ও ‘বাহিশতি জেওর’-এও নারীর ছবি প্রকাশ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ব্যতিক্রম:
কোনো বাস্তব ও শরীয়তসম্মত প্রয়োজনে—যেমন চিকিৎসা, পরিচয়পত্র, সরকারি নিবন্ধন, শিক্ষা সনদ ইত্যাদি—যেখানে ছবি বাধ্যতামূলক এবং তা নিরাপদভাবে সংরক্ষিত থাকে, সেখানে প্রয়োজনপরিমাণ অনুমতি হতে পারে। তবে বিনোদন, সৌন্দর্য প্রদর্শন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তার উদ্দেশ্যে ছবি প্রকাশ করা জায়েজ নয়।
উপসংহার:
পর্দা করে ছবি আপলোড করলেও তা সাধারণভাবে জায়েজ নয়; বরং নন-মাহরামের দৃষ্টি, ফিতনা, ছবির অপব্যবহার ও পর্দার উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার কারণে নিষিদ্ধ বা অন্ততপক্ষে অত্যন্ত সতর্কতার বিষয়। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া নারীর ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ না করাই ঈমান ও পর্দার দাবি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পর্দার বিধান যথাযথভাবে পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।