পূজার মণ্ডপের বাইরে মুসলিমের দোকান থেকে জিলাপি কেনা ও খাওয়া যাবে কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
উনি পূজার সময় ব্যবসা পারপাস এ দোকান দেয়।
Answer
আপু পূজার মণ্ডপের বাইরে মুসলিমের দোকান থেকে জিলাপি কেনা যাবে কি?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—দুর্গাপূজার মণ্ডপের বাইরে রাস্তার বিপরীত পাশে একজন মুসলিমের দোকান থেকে জিলাপি কেনা ও খাওয়া যাবে কি না। তিনি উল্লেখ করেছেন, দোকানদার পূজার সময় ব্যবসার উদ্দেশ্যে সেখানে দোকান দেন।
ফিকহি বিশ্লেষণ
১. মূলনীতি: হালাল বস্তু ক্রয়-বিক্রয় ও ভক্ষণ বৈধ
ইসলামে কোনো হালাল ও পবিত্র বস্তু (যেমন জিলাপি, যা সাধারণত ময়দা, চিনি, ঘি/তেল দিয়ে তৈরি) মুসলিমের দোকান থেকে কেনা ও খাওয়া মূলত বৈধ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"হে মানুষ! পৃথিবীতে যা হালাল ও পবিত্র আছে, তা থেকে আহার করো।"
(সূরা বাকারা: ১৬৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"হালাল সুস্পষ্ট এবং হারাম সুস্পষ্ট।"
(সহিহ বুখারি: ৫২; সহিহ মুসলিম: ১৫৯৯)
২. দোকানের অবস্থান ও পারিপার্শ্বিকতার প্রভাব
কোনো দোকান পূজার মণ্ডপের বিপরীতে বা নিকটে অবস্থিত হওয়া নিজে থেকে তার পণ্যকে হারাম করে না। হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো—"الأصل في الأشياء الإباحة" (বস্তুসমূহে মূল বিধান হলো বৈধতা), যতক্ষণ না কোনো স্পষ্ট হারাম প্রমাণ পাওয়া যায়। ইমাম ইবন আবিদিন রহ. রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন:
"الأصل في الأشياء الطهارة والإباحة حتى يقوم دليل التحريم"
"বস্তুসমূহ মূলত পবিত্র ও বৈধ, যতক্ষণ না হারামের দলিল প্রতিষ্ঠিত হয়।"
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৭৩; খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৩৭)
৩. ব্যবসার উদ্দেশ্য ও নিয়ত
দোকানদার পূজার সময় ব্যবসার উদ্দেশ্যে দোকান দিলেও, তা কেবল ব্যবসায়িক লেনদেন। মুসলিমের ব্যবসা করা নিজে থেকে নিষিদ্ধ নয়; বরং ইসলাম ব্যবসাকে উৎসাহিত করেছে। তবে যদি দোকানদার সরাসরি পূজার আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেয় বা হারাম কাজে সহায়তা করে, তাহলে তা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু শুধু নিকটে দোকান থাকা বা ব্যবসার উদ্দেশ্যে দোকান দেওয়া দ্বারা তার পণ্য হারাম হয় না।
৪. হানাফি ফিকহের স্পষ্ট বক্তব্য
ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ. -এর ঐকমত্য হলো—কোনো মুসলিমের হাতে তৈরি বা বিক্রীত হালাল খাদ্য কেনা বৈধ, যদিও দোকান অমুসলিমদের ধর্মীয় স্থানের নিকটে অবস্থিত। ফাতাওয়া আলমগিরি-তে এসেছে:
"يجوز شراء الطعام من المسلم وإن كان في سوق المشركين"
"মুসলিমের কাছ থেকে খাদ্য কেনা বৈধ, যদিও তা মুশরিকদের বাজারে হয়।"
(ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৪৭—কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)
৫. সতর্কতা ও পরিহারের বিষয়
যদিও মূল বিধান বৈধ, তবু কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা উত্তম:
- যদি দোকানদার প্রকাশ্যে পূজার আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেয় বা হারাম কাজে সহায়তা করে, তবে তার দোকান থেকে কেনা পরিহার করা ভালো।
- যদি জিলাপিতে হারাম উপাদান (যেমন নাজাসত) মেশানোর সন্দেহ থাকে, তবে সন্দেহের কারণে পরিহার করা উত্তম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকল, সে নিজের দ্বীন ও সম্মান রক্ষা করল।" (সহিহ বুখারি: ৫২)
- তবে শুধু মণ্ডপের বিপরীতে দোকান থাকা বা পূজার সময় ব্যবসা করা—এসব কারণে জিলাপি হারাম হয়ে যায় না।
চূড়ান্ত ফতোয়া
হ্যাঁ, আপু পূজার মণ্ডপের বাইরে রাস্তার বিপরীত পাশে কোনো মুসলিমের দোকান থেকে জিলাপি কেনা ও খাওয়া জায়েজ। কারণ:
- জিলাপি হালাল বস্তু।
- মুসলিমের দোকান থেকে কেনা বৈধ।
- দোকানের অবস্থান বা ব্যবসার সময় নিজে থেকে পণ্যকে হারাম করে না।
- হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো বৈধতা, যতক্ষণ না স্পষ্ট হারাম প্রমাণ পাওয়া যায়।
তবে যদি দোকানদার সম্পর্কে জানা যায় যে সে পূজার আনুষ্ঠানিকতায় সরাসরি অংশ নেয় বা হারাম কাজে সহায়তা করে, তাহলে সতর্কতাস্বরূপ অন্য দোকান থেকে কেনা উত্তম। আর যদি জিলাপিতে হারাম উপাদানের সন্দেহ থাকে, তবে সন্দেহের কারণে পরিহার করা ভালো।
আল্লাহ ভালো জানেন।