"অনিয়মিত পিরিয়ড ও ইস্তিহাযার বিধান: কখন হায়েজ ধরা হবে? কখন ইস্তিহাযা, এবং কীভাবে পবিত্রতা অর্জন করতে হবে?
Taharah Purity · Hanafi
Question
১। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে এরকম পরিস্তিতিতে আমি কখন পিরিয়ড ধরবো আর কোন সময়টাকে ইস্তিনজা ধরবো?
২. কীভাবে পবিত্রা হাসিল করবো?
Answer
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার শারীরিক অসুস্থতা ও পিরিয়ডের অনিয়মিততার কারণে উদ্ভূত জটিলতায় আপনার উদ্বেগ ও পেরেশানির বিষয়টি অনুধাবন করা গেছে। ইসলামি শরীআতে মহিলাদের পিরিয়ড (হায়েজ) এবং রোগজনিত রক্তস্রাব (ইস্তিহাযা)-এর বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ও গোছানো মূলনীতি রয়েছে।
১. আপনার পরিস্থিতিতে কখন ‘হায়েজ’ ধরবেন আর কখন ‘ইস্তিহাযা’ ধরবেন?
ক) হায়েজ ও ইস্তিহাযার মূল শরয়ী সীমা:
- হায়েজের মেয়াদ: হানাফী ফিকহ অনুযায়ী হায়েজের সর্বনিম্ন সময়সীমা হলো ৩ দিন ৩ রাত (৭২ ঘণ্টা) এবং সর্বোচ্চ সময়সীমা হলো ১০ দিন ১০ রাত (২৪০ ঘণ্টা)।
- রক্তের রঙ: হায়েজের নির্দিষ্ট মেয়াদের ভেতরে দেখা যাওয়া লাল, কালো, ব্রাউন (বাদামী), ঘোলা বা হলুদ যেকোনো রঙের স্রাবই শরীআতের দৃষ্টিতে হায়েজের রক্ত হিসেবে গণ্য হবে।
- ইস্তিহাযার সংজ্ঞা: রক্ত বা স্রাব যদি ১০ দিন ১০ রাতের চেয়ে বেশি সময় ধরে অব্যাহত থাকে, তবে ১০ দিনের অতিরিক্ত অংশটি হায়েজ নয়; বরং তা ‘ইস্তিহাযা’ (রোগজনিত রক্ত) হিসেবে গণ্য হবে।
খ) ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া স্রাবের শরয়ী সিদ্ধান্ত:
১. আপনার যদি পূর্বে কোনো নির্দিষ্ট অভ্যাস (আদাত) থেকে থাকে:
যেমন ধরুন, আগে আপনার প্রতি মাসে ৫, ৬ বা ৭ দিন করে পিরিয়ড হতো—তবে ১৮ সেপ্টেম্বর স্রাব শুরু হওয়ার পর তা ১০ দিন অতিক্রম করে ফেলায় আপনার পূর্বের অভ্যাসের দিনগুলোই (যেমন ৫ বা ৬ দিন) হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে। অভ্যাসের দিনগুলো পার হওয়ার পর থেকে পরবর্তী সব দিন (এমনকি ২৭ তারিখের হেভি ফ্লো সহ) আসা রক্ত ইস্তিহাযা (রোগজনিত রক্ত) হিসেবে ধর্তব্য হবে।
২. আপনার যদি পূর্বে কোনো নির্দিষ্ট দিন নির্ধারিত না থাকে (পূর্ণ অনিয়মিত হয়):
তবে ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে প্রথম ১০ দিন ১০ রাত পর্যন্ত সময়কে হায়েজ হিসেবে গণ্য করবেন। ১০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর থেকে যত রক্ত আসছে বা আসবে, তা সবই ইস্তিহাযা হিসেবে ধরা হবে।
২. কীভাবে পবিত্রতা অর্জন করবেন (গোসল ও ওজুর নিয়ম)?
ক) ফরয গোসলের নিয়ম:
- হায়েজের মেয়াদ (আপনার পূর্বের অভ্যাসের দিন অথবা সর্বোচ্চ ১০ দিন) পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে আপনার ওপর ফরয গোসল করা আবশ্যক।
- ১০ দিন পার হয়ে যাওয়ার পর রক্ত আসা অব্যাহত থাকলেও আর গোসলের জন্য অপেক্ষা করা যাবে না; অবিলম্বে গোসল করে পবিত্র হয়ে সালাত (নামাজ) শুরু করতে হবে।
খ) ইস্তিহাযা অবস্থায় ওজু ও সালাতের নিয়ম (মা'যূরের বিধান):
- ইস্তিহাযার রক্ত হলো রোগজনিত রক্ত। এতে সালাত বা সিয়াম (রোজা) মাফ হয় না; বরং এই অবস্থায় সালাত আদায় করা ফরয।
- যেহেতু আপনার রক্ত নিয়মিত বা ঘনঘন আসছে, তাই আপনি শরীআতের বিচারে ‘মা’যূর’ (ওজরগ্রস্ত) বলে গণ্য হবেন।
- ওজুর নিয়ম: প্রতিটি সালাতের ওয়াক্ত প্রবেশ করার পর আপনি ইস্তিনজা করে, নতুন প্যাড/কাপড় ব্যবহার করে একবার ওজু করে নেবেন। ওই ওজু দিয়ে উক্ত ওয়াক্তের ভেতর ফরয, সুন্নাত, নফল সালাত ও তিলাওয়াত সবই করতে পারবেন। সালাতের ওয়াক্ত শেষ হয়ে গেলে ওই ওজু ভেঙে যাবে; পরবর্তী ওয়াক্তের জন্য আবার নতুন করে ওজু করতে হবে।
গ) ভুলবশত ছেড়ে দেওয়া সালাতের কাযা:
- ইস্তিহাযার দিনগুলোতে ভুলবশত হায়েজ মনে করে যে কয় ওয়াক্তের ফরয সালাত আপনি পড়েননি, সেগুলোর সংখ্যা আনুমানিক হিসাব করে কাযা আদায় করে নিতে হবে।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১১৪ (অধ্যায়: কিতাবুত তাহারাত, ১ম পরিচ্ছেদ: হায়েজের বিবরণ): (হায়েজের সর্বনিম্ন মেয়াদ ৩ দিন ও সর্বোচ্চ মেয়াদ ১০ দিন হওয়া এবং কালো, ব্রাউন বা ঘোলা রঙের রক্তের ফিকহী মাসআলা)।
- পৃষ্ঠা: ১১৪–১১৫ (অধ্যায়: কিতাবুত তাহারাত, ২য় পরিচ্ছেদ: ইস্তিহাযা ও অভ্যাসের দিন): (রক্ত ১০ দিন অতিক্রম করলে অভ্যাসের দিনগুলো হায়েজ এবং অতিরিক্ত দিনগুলো ইস্তিহাযা হওয়া সংক্রান্ত অকাট্য বিবরণ)।
- পৃষ্ঠা: ১১২–১১৩ (অধ্যায়: কিতাবুত তাহারাত, ৩য় অনুচ্ছেদ): (ইস্তিহাযাগ্রস্ত নারীর ওজরগ্রস্ত হওয়া এবং প্রতি ওয়াক্ত সালাতের জন্য পৃথক ওজু করার ফিকহী বাধ্যবাধকতা)।
২. নূরুল ঈযাহ:
- পৃষ্ঠা: ৪৬–৪৭ (পরিচ্ছেদ: হায়েজ ও ইস্তিহাযার বিধান): (হায়েজের মেয়াদের পর ফরয গোসল করা এবং ইস্তিহাযা অবস্থায় সালাত ও সিয়াম আদায় ওয়াজিব হওয়া)।
- পৃষ্ঠা: ৩৮–৩৯ (পরিচ্ছেদ: মা’যূরের ওজুর বিধান): (ওজরগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতি ওয়াক্তে ওজু করার মাসনুন পদ্ধতি)।
৩. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১০ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৭৬ (অধ্যায়: বাবুল হায়েয ওয়াল ইস্তিহাযাহ): (ইস্তিহাযার দরুন ছেড়ে দেওয়া সালাতসমূহের কাযা আদায় করা সংক্রান্ত ফতোয়া)।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।