"অনিয়মিত পিরিয়ড ও ইস্তিহাযার ইসলামি বিধান: কখন হায়েয ধরা হবে, কখন ইস্তিহাযা, কীভাবে পবিত্রতা অর্জন ও নামজ পড়তে হবে?

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 7124
Questioner: Rahela Begum
Question Asked: 20 Oct 2026, 12:49 AM
Reviewed & Published: 20 Oct 2026, 12:29 PM
Views: 42
Tokens: 8,290
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামুয়ালাইকুম। উস্তাজ,আমার পিরিয়ড অনিয়মিত হওয়ার কারণে আমি সিলেটে দুজন বিখ্যাত গাইনি ডাক্তারকে দেখাই। তারা আমাকে প্রয়োজনীয় কিছু টেষ্ট দিলো।টেষ্টের রিপোর্ট সবগুলো আলহামদুলিল্লাহ ইতিবাচক আশায় ডাক্তার আমাকে বললো আপনার প্রাকৃতিগতভাবে পিরিয়ড অনিয়মিত হবে এবং উনার কাছে আর না যাওয়ার জন্য আমাকে বলেছিলে। এরপর থেকে ৩ মাস আমার পিরিয়ড না হওয়া আমি রোকাইয়া করি। ফলে,আমার পিরিয়ড হয় কিন্তু সমস্যা হচ্ছে পিরিয়ড আমার আগে যেভাবে হতো এখন সেভাবে হচ্ছে না। প্রথম দিকে আমার ব্লেক ব্রাউন কালার পিরিয়ড যেতো শুধু দুপুর ১২টায় আর রাতে একবার।এভাবে প্রায় ১০ দিন যায়। এভাবে পিরিয়ড হওয়ার কারণে আমি একদিন অপেক্ষা করে নামাজ পড়তে শুরু করি।১০ দিনের পর ধীরে ধীরে ব্লেক ব্রাউন থেকে রেড কালারের দিকে মুভ করে এবং পিরিয়ডের ফ্লোও কিছুটা বাড়তে থাকে আর তাই এটাকে পিরিয়ড মনে করে পরবতী ১০ দিন আমি নামাজ পড়িনি।কিন্তু, আমার পিরিয়ড আগের মতই একটু একটু করে যাচ্ছিলো।তারপর পরের মাসে ( সেপ্টেম্বর মাসে ১৮ তারিখ) আবার আগের মতো পিরিয়ড হয় কিন্তু ২৭ তারিখের পরে হেভি ফ্লো নিয়ে লাল কালারে পিরিয়ড শুরু হয় এবং বর্তমানে এখনো চলছে।
১। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে এরকম পরিস্তিতিতে আমি কখন পিরিয়ড ধরবো আর কোন সময়টাকে ইস্তিনজা ধরবো?
২. কীভাবে পবিত্রা হাসিল করবো?

Answer

পবিত্রতা ও নামাজের বিধান: অনিয়মিত পিরিয়ড (ইস্তিহাযা) সংক্রান্ত মাসআলা

উত্তর (সংক্ষিপ্ত): আপনার বর্ণনা অনুযায়ী এটি ইস্তিহাযা (অসুস্থতা-জনিত রক্তস্রাব)-এর অন্তর্ভুক্ত। ইসলামে নারীর রক্তস্রাব তিন প্রকার: হায়েয (মাসিক), নিফাস (সন্তান জন্মের পর), এবং ইস্তিহাযা (অসুস্থতার রক্ত)। হায়েযের সর্বোচ্চ সময় ১০ দিন ১০ রাত; এর বেশি স্থায়ী রক্ত হায়েয নয়, বরং ইস্তিহাযা। ইস্তিহাযার অবস্থায় নামাজ-রোজা বন্ধ হয় না; শুধু প্রত্যেক নামাজের ওয়াক্তে ওযু করে নামাজ আদায় করতে হয়।


১. কখন হায়েয ধরবেন, কখন ইস্তিহাযা?

মূলনীতি (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী):

হায়েযের সর্বনিম্ন সময়: ৩ দিন ৩ রাত (৭২ ঘণ্টা)।
হায়েযের সর্বোচ্চ সময়: ১০ দিন ১০ রাত (২৪০ ঘণ্টা)।
দুই হায়েযের মধ্যবর্তী পবিত্রতার সর্বনিম্ন সময়: ১৫ দিন।

দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «لَا حَيْضَ دُونَ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ وَلَا فَوْقَ عَشَرَةِ أَيَّامٍ» — "তিন দিনের কম এবং দশ দিনের বেশি হায়েয নেই।"
(সুনানে দারাকুতনী; আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাত; রাদ্দুল মুহতার ১/২৮১)

আপনার ক্ষেত্রে প্রয়োগ:

আপনার রক্তস্রাব ১০ দিনের বেশি চলছে (বিশেষত সেপ্টেম্বরের ১৮ তারিখ থেকে ২৭ তারিখের পরও ভারী স্রাব চলছে)। যেহেতু এটি ১০ দিন অতিক্রম করেছে, তাই ১০ দিনকে হায়েয এবং এর পরের রক্তকে ইস্তিহাযা গণ্য করতে হবে।

সিদ্ধান্ত:

  • হায়েয: যে ১০ দিন রক্তস্রাব ছিল (সেপ্টেম্বর ১৮ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত এবং তার পরের দিনগুলো মিলিয়ে প্রথম ১০ দিন) — এই সময়ের নামাজ-রোজা মাফ (পরে কাজা করতে হবে)।
  • ইস্তিহাযা: ১০ দিন অতিক্রমের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত যে রক্ত চলছে — এটি ইস্তিহাযা। এই সময়ে নামাজ ফরজ, শুধু প্রত্যেক ওয়াক্তে ওযু করে পড়তে হবে।

প্রথম মাসের (ব্ল্যাক-ব্রাউন) বিষয়ে:

প্রথম মাসে ব্ল্যাক-ব্রাউন স্রাব ১০ দিন চলার পর লাল রক্ত শুরু হয়েছিল। হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, হায়েযের সর্বনিম্ন সময় ৩ দিন; এর কম স্রাব হায়েয নয়। তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে এবং পরবর্তী ফুকাহায়ে কেরামের অনেকের মতে, দুর্বল (ব্ল্যাক-ব্রাউন) স্রাবও যদি ৩ দিন পর্যন্ত পৌঁছে এবং তা হায়েযের লক্ষণযুক্ত হয়, তবে তা হায়েয হিসেবে গণ্য হতে পারে। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে যেহেতু স্রাব ১০ দিন অতিক্রম করেছে এবং অনিয়মিত, তাই সতর্কতা (এহতিয়াত) হলো: প্রথম মাসে যে ১০ দিন স্রাব ছিল তা হায়েয ধরুন, এবং তার পরের রক্ত ইস্তিহাযা ধরুন। এই সময়ের ছুটে যাওয়া নামাজ কাজা করুন (কারণ আপনি ১০ দিনের পরও নামাজ বন্ধ রেখেছিলেন, যা ইস্তিহাযার সময় জায়েয নয়)।

সতর্কতা: যেহেতু আপনার পিরিয়ড অনিয়মিত এবং চিকিৎসকের পরামর্শে কোনো ঔষধ/রুকইয়া চলছে, তাই স্থিতিশীলতা না আসা পর্যন্ত প্রতিবার ১০ দিন হায়েয ও তারপর ইস্তিহাযা — এই নিয়মে চলুন। তবে যদি কোনো মাসে স্রাব ৩ দিনের কম হয়, তবে তা হায়েয নয়; তখন পুরোটাই ইস্তিহাযা।


২. ইস্তিনজা (পবিত্রতা অর্জন) কীভাবে করবেন?

ক. হায়েয শেষে গোসল (ফরজ গোসল):

হায়েয বন্ধ হওয়ার পর ফরজ গোসল করতে হবে। পদ্ধতি:

  1. নিয়ত করুন: "আমি হায়েয থেকে পবিত্র হওয়ার জন্য ফরজ গোসল করছি।"
  2. প্রথমে হাত ধুয়ে নিন।
  3. ইস্তিনজা করুন (পেশাব-পায়খানার স্থান পানি দিয়ে ধুয়ে নিন)।
  4. সম্পূর্ণ শরীরে পানি ঢালুন — মাথার চুলের গোড়া পর্যন্ত পানি পৌঁছাতে হবে। চুল বাঁধা থাকলে খুলে ফেলুন বা নিশ্চিত করুন পানি গোড়ায় পৌঁছেছে।
  5. ডান দিক থেকে শুরু করে বাম দিকে পানি ঢালুন।
  6. কুলি করুন ও নাক পরিষ্কার করুন (যদি রোজা না থাকে)।

দলিল: কুরআনে আল্লাহ বলেন: «فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ» — "যখন তারা পবিত্র হবে..." (সূরা বাকারা: ২২২)।
রাসূল ﷺ মায়মূনা (রা.)-কে বলেছিলেন: «خُذِي فِرْصَةً مُمَسَّكَةً فَتَطَهَّرِي بِهَا» — "এক টুকরো কাপড় নিয়ে তা দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করো।" (সহিহ বুখারি: ৩১৪)

খ. ইস্তিহাযার অবস্থায় পবিত্রতা:

ইস্তিহাযার সময় প্রত্যেক নামাজের ওয়াক্তে একবার ওযু করতে হবে। ওযুর পদ্ধতি:

  1. নিয়ত করুন (ওযুর নিয়ত)।
  2. বিসমিল্লাহ পড়ুন।
  3. হাতের কব্জি পর্যন্ত ৩ বার ধুয়ে নিন।
  4. কুলি করুন ৩ বার।
  5. নাক পরিষ্কার করুন ৩ বার।
  6. মুখমণ্ডল ৩ বার ধুয়ে নিন।
  7. কনুইসহ দুই হাত ৩ বার ধুয়ে নিন (ডান আগে, বাম পরে)।
  8. মাথা মাসেহ করুন একবার।
  9. কান মাসেহ করুন।
  10. টাখনুসহ দুই পা ৩ বার ধুয়ে নিন (ডান আগে, বাম পরে)।

দলিল: রাসূল ﷺ বলেছেন: «الْمُسْتَحَاضَةُ تَغْتَسِلُ لِكُلِّ صَلَاةٍ» — "ইস্তিহাযাগ্রস্ত নারী প্রত্যেক নামাজের জন্য গোসল করবে।" (সুনানে আবু দাউদ: ২৯৮)
তবে হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত: প্রত্যেক ওয়াক্তে ওযুই যথেষ্ট, গোসল ফরজ নয় (যদিও গোসল উত্তম)। (রাদ্দুল মুহতার ১/২৯৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৩৭)

গ. নামাজের জন্য অতিরিক্ত করণীয়:

  1. প্যাড/কাপড় ব্যবহার করুন — রক্ত বের হওয়া বন্ধ রাখতে বা কমাতে।
  2. প্রত্যেক ওয়াক্তের জন্য নতুন ওযু করুন (এক ওযুতে এক ওয়াক্তের নামাজ পড়ুন; ওয়াক্ত শেষ হলে ওযু ভেঙে যাবে)।
  3. ইস্তিনজা করুন প্রতিবার পেশাব-পায়খানার পর এবং রক্ত বের হলে (যদি বেশি হয়)।
  4. নামাজের সময় রক্ত বের হলেও নামাজ ভাঙবে না, যদি না ওযু ভেঙে যায় (যেমন পেশাব-পায়খানা)।

দলিল: হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ ইস্তিহাযাগ্রস্ত নারীকে বলেছিলেন: «تَوَضَّئِي لِكُلِّ صَلَاةٍ» — "প্রত্যেক নামাজের জন্য ওযু করো।" (সুনানে আবু দাউদ: ২৯৭; সহিহ বুখারি: ৩০৫)


৩. আপনার করণীয় (ধাপে ধাপে):

| সময় | হুকুম | করণীয় | |---|---|---| | সেপ্টেম্বর ১৮ – ২৭ (প্রথম ১০ দিন) | হায়েয | নামাজ-রোজা মাফ; পরে কাজা | | ২৭ তারিখের পর থেকে বর্তমান | ইস্তিহাযা | প্রত্যেক ওয়াক্তে ওযু করে নামাজ পড়ুন | | প্রথম মাসের ১০ দিনের পরের ১০ দিন | ইস্তিহাযা (সতর্কতা) | ছুটে যাওয়া নামাজ কাজা করুন | | ব্ল্যাক-ব্রাউন স্রাব (৩ দিনের কম হলে) | ইস্তিহাযা | নামাজ পড়ুন | | ব্ল্যাক-ব্রাউন স্রাব (৩ দিন বা বেশি হলে) | হায়েয (সতর্কতা) | নামাজ বন্ধ রাখুন, পরে কাজা |

বিশেষ নির্দেশনা:

  1. প্রতিবার ১০ দিন হায়েয ধরুন, তারপর ইস্তিহাযা — যতক্ষণ না চিকিৎসায় নিয়মিত হয়।
  2. ছুটে যাওয়া নামাজ (প্রথম মাসের ১০ দিনের পরের ১০ দিন) কাজা করুন।
  3. রুকইয়া/ঔষধ চালিয়ে যান; পাশাপাশি হায়েয-ইস্তিহাযার হিসাব একটি ডায়েরিতে লিখে রাখুন (তারিখ, রক্তের রং, পরিমাণ)।
  4. সন্দেহ হলে — ৩ দিনের কম স্রাব = ইস্তিহাযা; ৩-১০ দিন = হায়েয; ১০ দিনের বেশি = ইস্তিহাযা।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মূলনীতি: «الْحَيْضُ لَا يَكُونُ أَقَلَّ مِنْ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ وَلَا أَكْثَرَ مِنْ عَشَرَةِ أَيَّامٍ» — "হায়েয তিন দিনের কম ও দশ দিনের বেশি হয় না।" (আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাত)


৪. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা:

  • ইস্তিহাযার সময় নামাজ ছাড়া জায়েয নয় — এটি বড় গুনাহ। আল্লাহ বলেন: «وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ» — "নামাজ কায়েম করো।" (সূরা বাকারা: ৪৩)
  • হায়েযের সময় নামাজ-রোজা মাফ, কিন্তু পরে কাজা ফরজ (নামাজের কাজা ফরজ, রোজার কাজা ফরজ)।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ চালিয়ে যান; ইসলামি বিধান ও চিকিৎসা পরস্পরবিরোধী নয়।
  • সন্দেহ হলে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য মুফতি/আলেমের সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।

মোটকথা: আপনার বর্তমান অবস্থায় ১০ দিন হায়েয এবং তার পরের রক্ত ইস্তিহাযা। ইস্তিহাযার সময় প্রত্যেক ওয়াক্তে ওযু করে নামাজ পড়ুন; ছুটে যাওয়া নামাজ কাজা করুন। পবিত্রতা অর্জনের জন্য ফরজ গোসল (হায়েয শেষে) এবং প্রত্যেক ওয়াক্তে ওযু করুন।

আল্লাহ তাআলা বলেন: «يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ» — "আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজতা চান, কঠিনতা চান না।" (সূরা বাকারা: ১৮৫)


References (হানাফি কিতাব):

  1. আল-হিদায়া — ইমাম বুরহানুদ্দিন আল-মারগিনানি (রহ.), কিতাবুত তাহারাত, হায়েয অধ্যায়।
  2. রাদ্দুল মুহতার — ইমাম ইবনে আবিদিন শামি (রহ.), ১/২৮১-২৯৩ (হায়েয ও ইস্তিহাযা)।
  3. ফাতাওয়া হিন্দিয়া (ফাতাওয়া আলমগিরি) — ১/৩৭ (ইস্তিহাযার বিধান)।
  4. ইমদাদুল ফাতাওয়া — মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.), ১/১৩৫-১৪০।
  5. ফাতাওয়া উসমানি — মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি (দা.বা.), ১/২৮০-২৮৫।
  6. বেহেশতী জেওর — মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.), প্রথম খণ্ড, তাহারাত অধ্যায়।
  7. মাআরিফুল কুরআন — মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.), সূরা বাকারা: ২২২-এর তাফসির।
  8. শরহু মাআনিল আসার — ইমাম তহাবি (রহ.), হায়েয অধ্যায়।
  9. উসুলুশ শাশি — ইমাম নিযামুদ্দিন আশ-শাশি (রহ.), হায়েযের মূলনীতি।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.