জমি লিজ নেওয়া কি জায়েয? ছোট চাচার সাথে নির্দিষ্ট টাকার শর্তে জমি নেওয়া কি সুদ?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 7118
Questioner: Labony Yasmin
Question Asked: 19 Oct 2026, 08:42 PM
Reviewed & Published: 19 Oct 2026, 09:04 PM
Views: 16
Tokens: 5,848
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামুয়ালাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওবারকা তুহু
আমার হাসব্যান্ড ও তার চোট চাচা দুজনে মিলে তার বড় চাচার জমি চাচাতো ভাই এর কাছ থেকে লিজ নিয়েছে । বড় চাচা মারা গেছেন । সেই জমি আবার কোনো ভাগাভাগি ও হয়নি সন্তানের মধ্যে। এর জন্য ছোট চাচা ২৫০০০ টাকা ও আমার হাসব্যান্ড ও ২৫০০০টাকা দিয়েছেন। এটা একবছর মেয়াদ । আবার আমার হাসব্যান্ড ছোট চাচার থেকে জমিটা নিয়েছেন এই শর্তে যে ৪ ভাগের একভাগ টাকা বা ফসল তারা পাবে । তাদের গ্রামের নিয়ম অনুযায়ী নাকি অপর পক্ষ কোনো টাকা বা কোনো কিছুর খবর বহন করবে না । সেখানে সব খরচ বীজ কেনা , শ্রমিক এর খরচ সবই আমার স্বামী বহন করেন । আর জমিতে ফসল ভালো হোক বা খারাপ হোক ছোট চাচাকে তার অংশের টাকা দিতে হয় । এখন জানতে চাচ্ছি যে এই বিষয়টা কি সুদের সাথে জরিত ? এই ক্ষেত্রে বিধান কি হতে পারে ? কারণ জমি তাদের কারোরই নয় আবার এক পাক্ষিক সব খরচ হয় । জমি লিজ নেওয়ার বিষয়টি কি হারাম এটা জানাবেন ইন শা আল্লাহ।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

সংক্ষিপ্ত উত্তর:


১. মূল শরয়ী সিদ্ধান্ত:

আপনার স্বামী ও তাঁর ছোট চাচার মধ্যে যে নিয়মে চুক্তিটি সম্পন্ন হয়েছে—অর্থাৎ "ফসল ভালো হোক বা খারাপ হোক, ছোট চাচাকে তাঁর ৪ ভাগের ১ ভাগ টাকা বা ফসল দিতেই হবে এবং সমস্ত খরচ একতরফা আপনার স্বামী বহন করবেন"—এই চুক্তিটি শরীআতের বিচারে সহীহ (বিশুদ্ধ) হয়নি; বরং এটি একটি ‘ফাসিদ’ (ত্রুটিপূর্ণ/বাতিল) কারবার ।

এটি সরাসরি ব্যাংকের লেনদেনের মতো সুদ না হলেও, ইসলামি ফিকহের পরিভাষায় এটি 'আকল বিল বাতিল' (অন্যায়ভাবে অপরের সম্পদ ভোগ) এবং সুদের সাদৃশ্যপূর্ণ একটি বাতিল ও নাজায়েয শর্তযুক্ত চুক্তি।

তবে আপনারা যদি সঠিক নিয়ম জেনে চুক্তিটি সংশোধন করে নেন, তবে জমি চাষাবাদ করা ও ফসল ভোগ করা সম্পূর্ণ হালাল হয়ে যাবে।


২. ফিকহী কারণ ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা:

  • ক) ফসল ভালো-খারাপ হওয়ার তোয়াক্কা না করে লাভ সুনিশ্চিত করার শর্ত:
    ইসলামি শরীআতে বর্গাচাষ (মুজারাআহ) বা অংশীদারিত্বের মূলনীতি হলো—উৎপাদিত ফসলের লভ্যাংশ ও ক্ষতির ঝুঁকি উভয় পক্ষের মাঝে আনুপাতিক হারে বণ্টিত হবে। যদি চুক্তি করা হয় যে, "ফসল ভালো হোক বা খারাপ হোক, নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা বা ফসল দিতেই হবে", তবে এতে একপক্ষের (ছোট চাচার) লাভ সুনিশ্চিত হয়ে যায় এবং ক্ষতির সমস্ত ঝুঁকি একতরফাভাবে অপর পক্ষের (আপনার স্বামীর) ওপর চেপে বসে। ফিকহে হানাফীর সর্বসম্মত নীতি অনুযায়ী, এ জাতীয় চুক্তি 'ফাসিদ' (বাতিল) হয়ে যায়।

  • খ) অবিভক্ত মীরাছী (যৌথ) জমি ইজারা নেওয়া:
    মৃত বড় চাচার জমিটি যেহেতু এখনও তাঁর সন্তানদের (ওয়ারিশদের) মাঝে ফারায়েজ অনুযায়ী বন্টন বা ভাগাভাগি হয়নি, তাই তা যৌথ সম্পত্তি (শারিকাতুল মিলক)। শরীআতের নিয়ম অনুযায়ী, অন্যান্য সকল ওয়ারিশের সম্মতি বা অনুমতি ছাড়া কেবল একজন ওয়ারিশের থেকে পুরো যৌথ জমি লিজ (ইজারা) নেওয়া শরীআতসম্মত নয়।

  • গ) বিনিয়োগ ছাড়া ঝুঁকিহীন মুনাফা দাবি করা:
    ছোট চাচা ২৫,০০০ টাকা দিয়ে যৌথভাবে লিজ নেওয়ার পর, নিজে আর কোনো খরচ বা শ্রম না দিয়ে এবং ফসলের ক্ষতির কোনো ঝুঁকি না নিয়ে, নির্দিষ্ট লাভ দাবি করছেন—যা ইসলামি শরীআতের চুক্তি ও ইজারা আইনের পরিপন্থী।


৩. বিষয়টি শরীআতসম্মত ও হালাল করার উপায় (করণীয়):

এই লেনদেনকে সম্পূর্ণরূপে হালাল ও শরীআতসম্মত করতে চাইলে আপনারা নিচের যেকোনো একটি বৈধ পন্থা অবলম্বন করতে পারেন:

  • পদ্ধতি ১ (নগদ নির্দিষ্ট ভাড়ায় লিজ দেওয়া - সবচেয়ে সহজ ও উত্তম):
    ছোট চাচা তাঁর লিজের অংশটি আপনার স্বামীর কাছে নগদ নির্দিষ্ট টাকায় (ক্যাশ ভাড়া) লিজ দিয়ে দেবেন। যেমন: ছোট চাচা বললেন, "আমার লিজের অংশের বিপরীতে তুমি আমাকে বাৎসরিক নির্দিষ্ট ১০,০০০ বা ১৫,০০০ টাকা ভাড়া দেবে।" এক্ষেত্রে জমিতে ফসল কম হোক, বেশি হোক বা নষ্ট হয়ে যাক—সব লাভ-ক্ষতি আপনার স্বামীর হবে এবং ছোট চাচা তাঁর নির্ধারিত ভাড়া পাবেন। এটি শরীআতে সম্পূর্ণ বৈধ ইজারা চুক্তি।

  • পদ্ধতি ২ (শরয়ী সঠিক বর্গাচাষ / মুজারাআত):
    যদি ফসল ভাগাভাগির নিয়মেই করতে চান, তবে চুক্তি হতে হবে—জমিতে যা ফসল উৎপন্ন হবে, ছোট চাচা তার ৪ ভাগের ১ ভাগ পাবেন। কিন্তু দৈব-দুর্বিপাক বা অন্য কোনো কারণে ফসল কম হলে বা নষ্ট হয়ে গেলে ছোট চাচাও ওই কম ফসল থেকেই ১/৪ অংশ পাবেন। "ফসল না হলেও নির্দিষ্ট টাকা দিতে হবে"—এমন কোনো বাধ্যবাধকতার শর্ত রাখা যাবে না।

  • পদ্ধতি ৩ (ওয়ারিশদের অনুমতি গ্রহণ):
    মৃত বড় চাচার জমি লিজ নেওয়ার বিষয়টি তাঁর অন্যান্য সন্তান বা ওয়ারিশদের জানিয়ে তাঁদের সন্তুষ্টি ও অনুমতি গ্রহণ করে নেওয়া আবশ্যক।


সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:

১. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া:

  • ১০ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৭০–১৭১: (অধ্যায়: কিতাবুল মুজারাআত, ৩য় অনুচ্ছেদ: জমি বা ফসল নির্দিষ্ট করে দেওয়া এবং ফসল ভালো বা খারাপ হওয়ার তোয়াক্কা না করে নির্দিষ্ট টাকা বা ফসল দেওয়ার শর্ত ফাসিদ ও নাজায়েয হওয়া সংক্রান্ত ফতোয়া) **।
  • ১০ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২২ & ১২৭: (অধ্যায়: কিতাবুল মুজারাআত, ১ম অনুচ্ছেদ: শরীআতসম্মত বর্গাচাষের নিয়মাবলী ও ফিকহী শর্তাবলী) **।
  • ১৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৮৯: (অধ্যায়: কিতাবুশ শিরকাত, ৩য় অনুচ্ছেদ: অন্যান্য অংশীদারদের অনুমতি ছাড়া যৌথ জমি চাষাবাদ বা লিজ দেওয়া নাজায়েয হওয়া) **।
  • ২০শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২৮: (অধ্যায়: কিতাবুর রহন — ইজারা ও লিজের জমিতে ঝুঁকি ছাড়া ফায়দা হাসিলের ফিকহী নিষেধাজ্ঞা) **।

২. দরসুল ফিকহ:

  • ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩১০ & ৩১৫: (অধ্যায়: কিস্তিতে লেনদেন ও ইজারা — অস্পষ্টতা ও অন্যায্য শর্তের কারণে ইজারা চুক্তি ফাসিদ হওয়া এবং 'আকল বিল বাতিল'-এর ব্যাখ্যা) **।
  • ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪৪৫–৪৪৭: (অধ্যায়: যৌথ উত্তরাধিকার সম্পদে হস্তক্ষেপ — ওয়ারিশদের অনুমতি ব্যতীত যৌথ মীরাছী জমি ব্যবহার বা লিজ দেওয়ার শরয়ী ফায়সালা) **।

৩. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী:

  • ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১১৯–১২২: (অধ্যায়: কিতাবুশ শিরকাত, ২য় পরিচ্ছেদ: শরীকদের অনুমতি ছাড়া যৌথ সম্পদে হস্তক্ষেপ নাজায়েয হওয়া) **।
  • ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৩৫: (অধ্যায়: কিতাবুল মুজারাআত — বর্গাচাষে ফাসিদ শর্তাবলী ও তার ফিকহী হুকুম) **।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হালাল উপার্জন ও সুদ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।


আল্লাহু আ’লাম।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.