ফোঁড়া বা ক্ষত থেকে রস বের হলে কি নাপাক হয়? অজু-নামাজ-কাপড় পাক থাকার সহজ ফিকহি নিয়ম জানতে চাই?
Taharah Purity · Hanafi
Question
বিগত প্রশ্নে বলেছিলাম যে, আঙ্গুলের ছোট ফোঁড়ার (চাপ লাগলে পানি রস আসে সামান্য ফোঁটার মতন) জায়গায় তো সবসময়ই ভিজে যায়, আপনারা বলেছিলেন যে যে এইগুলো যেখানে যেখানে লাগবে সেইসবই নাপাক হবে।
কিন্তু, তাহলে অজু, কাজকর্ম এইগুলো করতে গেলে তো ফোঁড়া ভিজবেই। তাহলে যারা এই রকম বা বিভিন্নকারনে আঘাতপ্রাপ্ত হন তারা তো কাপড় পাক করতে গেলেও ক্ষত স্থান থেকে রস বের হয়, তাহলে কিভাবে কি এই বিষয়টা বুঝতে পারিনা!!
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
ওয়ালইকুম আসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
১. মূল ফিকহী নিয়ম: ফোঁড়া বা ক্ষতের রস কখন নাপাক হয় আর কখন হয় না?
ইসলামি ফিকহে (হানাফী মাযহাবে) ফোঁড়া, ব্রণ বা ক্ষতস্থানের রক্ত, পুঁজ ও রসের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক ও স্পষ্ট উসূল (নীতি) রয়েছে:
- ক) গড়িয়ে না পড়লে (বহিয়া না গেলে) সম্পূর্ণ পাক:
ফোঁড়া বা ক্ষতের মুখে যদি রস বা পানি সামান্য দেখা যায়, ভিজা ভিজা থাকে বা চাপ লাগলে এক ফোঁটা পানির মতো ভেসে ওঠে কিন্তু তা ক্ষতস্থান থেকে গড়িয়ে অন্য সুস্থ চামড়ায় গড়িয়ে পড়ে না, তবে শরীআতের বিচারে তা ‘নাপাক’ নয় এবং তা দ্বারা ওজুও ভাঙে না। - খ) কখন নাপাক হয়?
কেবল তখনই উক্ত রস বা রক্ত নাপাক গণ্য হয় এবং ওজু ভেঙে দেয়, যখন তা ফোঁড়া বা ক্ষতস্থানের সীমা অতিক্রম করে নিজে থেকে নিচে বা অন্য চামড়ায় গড়িয়ে পড়ে (প্রবাহিত হয়)।
২. আপনার ওজু, কাজকর্ম ও ধোয়া-মোছার বিভ্রান্তির সমাধান:
আপনি যে ভেবেছেন—"অজু বা কাজকর্ম করতে গেলে ফোঁড়া ভিজে যাবে এবং সবকিছু নাপাক হবে"—এটি একটি ভুল ধারণা বা ওয়াসওয়াসা। প্রকৃত বিধান হলো:
১. কাজকর্ম বা ওজুর সময় ভিজলে: অযু করার সময় বা হাত ধোয়ার সময় যদি ফোঁড়া পানিতে ভিজে যায়, কিন্তু ভেতর থেকে রক্ত/রস গড়িয়ে না পড়ে, তবে আপনার হাত, ওজুর পানি বা পরিহিত কাপড় বিন্দুমাত্র নাপাক হবে না। ২. ইচ্ছাকৃত চাপ না দেওয়া: আঙ্গুলের ফোঁড়াটিতে অনর্থক চাপ দিয়ে জোর করে রস বের করার চেষ্টা করবেন না। চাপ দেওয়া ছাড়া যদি স্বাভাবিকভাবে রস গড়িয়ে না পড়ে, তবে আপনি শতভাগ পবিত্র। ৩. কাপড়ে লাগলে: গড়িয়ে না পড়া পর্যন্ত ফোঁড়ার ওই সামান্য ভেজা অংশ কোনো কাপড়ে বা বস্তুতে লাগলেও সেই কাপড় নাপাক হয় না।
৩. জখমপ্রাপ্ত বা গুরুতর আঘাতপ্রাপ্তদের জন্য শরীআতের সহজ বিধান (ওজর):
যাঁদের বড় আঘাত বা গভীর ক্ষত রয়েছে এবং অনবরত রস বা রক্ত গড়িয়ে পড়তে থাকে, শরীআত তাঁদের জন্য অত্যন্ত সহজ নিয়ম নির্ধারণ করেছে:
- ব্যান্ডেজ বা পট্টির হুকুম: ক্ষতস্থানে ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ বা প্লাস্টার বেঁধে রাখলে ওজুর সময় ব্যান্ডেজ খোলার প্রয়োজন নেই; কেবল ব্যান্ডেজের ওপর ভেজা হাতে ‘মাসেহ’ করে নিলেই অযু সহীহ হয়ে যায়।
- মা’যূর (অক্ষম) হওয়ার বিধান: যদি কারো ক্ষত থেকে রক্ত বা রস অনবরত গড়িয়ে পড়তেই থাকে এবং এক ওয়াক্তের পুরো সময়ে ওযু করে সালাত পড়ার মতো সামান্য বিরতিও না পাওয়া যায়, তবে তিনি শরীআতের দৃষ্টিতে ‘মা’যূর’। তিনি প্রতি ওয়াক্তে কেবল একবার ওযু করবেন; এরপর ঐ ওয়াক্তের ভেতর যতই রস গড়িয়ে পড়ুক না কেন, তাঁর ওযু ভাঙবে না এবং তিনি স্বাভাবিকভাবে সালাত ও কাজকর্ম করতে পারবেন।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া:
- ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৬১–৬২: (অধ্যায়: কিতাবুল ওজু, প্রশ্ন ১৭৯৮ — ফোঁড়া বা খুজলির দানার রস গড়িয়ে না পড়া পর্যন্ত তা নাপাক না হওয়া এবং ওজু না ভাঙা সংক্রান্ত স্পষ্ট ফতোয়া) **।
২. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী:
- ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫৬–৫৭: (অধ্যায়: কিতাবুত তাহারাত, ৪র্থ ও ৫ম অনুচ্ছেদ — রক্ত, পুঁজ ও ফোঁড়ার পানি ক্ষতস্থান থেকে গড়িয়ে পড়া (সায়লান)-এর ফিকহী সীমা এবং গড়িয়ে না পড়লে ওজু ও কাপড় নাপাক না হওয়া) **।
৩. নূরুল ঈযাহ:
- পৃষ্ঠা: ৩১ (অনুবাদ পৃষ্ঠা: ১৫২): (পরিচ্ছেদ: ওজু ভঙ্গের কারণসমূহ — "প্রবাহিত নাপাক বস্তু" সংক্রান্ত ৩ নম্বর মাসআলা) **।
৪. দরসুল ফিকহ:
- ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৮৯–৩৯১: (অধ্যায়: ব্যান্ডেজ ও অপারেশনের রোগীর পবিত্রতার বিধান — ব্যান্ডেজের ওপর মাসেহ ও ওজরের মাসাইল) **।
- ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৮৪: (অধ্যায়: তহারত ও পানি সংক্রান্ত মাসাইল — "سائل" বা গড়িয়ে পড়ার শরয়ী ব্যাখ্যা) **।
والله أعلم بالصواب