প্রস্রাবের পর পিচ্ছিল পদার্থ (মযী/ওয়াদী) বের হলে ওযু ভাঙে কি? কাপড়ে লেগে শুকালে নামাজ হবে কি?

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 7082
Questioner: Muhammad Riad
Question Asked: 18 Oct 2026, 09:21 PM
Reviewed & Published: 18 Oct 2026, 10:26 PM
Views: 8
Tokens: 7,857
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১. ইমামের সালাম ফিরানোর পর আমিও যদি দুইপাশেই সালাম ফিরিয়ে ফেলি, বাম দিকে ফিরানোর সাথে সাথে মনে পড়ে ১ রাকাত পায়নি। শপষ বৈঠকে কী সাহু সিজাদাহ দিতে হবে?
২. সিরাত কিভাবে মুখস্থ করবো?
৩. আমি প্রস্রাব করার পর পিচ্ছিল পদার্থ বের হয়। আনুমানিক টোটাল ১ মিলি এরকম হবে। তবে এটা ২০-৩০ মিনিটে একটু একটু করে আসে আর গড়িয়ে পড়ে না। প্রথম কয়েক মিনিটে মূত্রনালির সামনে চিকচিক করতে থাকে, এরপর মুছলে ২৫-৩০ মিনিটের সময় চাপ দিলেও মূত্রনালির সম্মুখে আসে। এরপর লিঙ্গে জোড়ে চাপ দিলে আসে নতুবা নিজে থেকে আসে না, তবে মনে হয় যেন বের হচ্ছে এইরকম। আমার এত দেরি লাগে কেন প্রস্রাব থেকে পবিত্র হতে, অনেকেই দোখি ৩-৫ মিনিটেই প্রস্রাব থেকে পবিত্র হয়ে চলে আসে।
১. এখন আমার করণীয় কী?
২. আমার এই সমস্যাটা দূর করার কোনো আমল আছে?
৩. আবার ধরুণ কাপড়ে যদি লাগে কিন্ত অনুভব হয়নি এবং তা শুকিয়ে গেছে এবং নামাজ পড়েছি। তাহলে কী নামাজ হবে? এবং এই পিচ্ছিল পদার্থটা কাপড়ে লাগলে কী ঐ হাদিসের ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হবো যাদেরকে প্রস্রাব থেকে অসতর্কতার কারণে কবরে আযাব দেয়া হবে?
৪. এটাতে কী কোনো ওয়াসওয়াসা সংক্রান্ত কিছু আছে?

Answer

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

জবাব


১. মাসবুকের সালাম ফেরানো সংক্রান্ত মাসআলা:

  • শরয়ী সিদ্ধান্ত: ইমামের সাথে সালাম ফেরানোর পর আপনার যদি স্মরণ হয় যে ১টি রাকাত পাননি (ছুটে গেছে), তবে সালাম ফেরানোর পর দাঁড়ানোর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত কোনো সালাত পরিপন্থী কাজ (যেমন: কথা বলা, হাসি দেওয়া বা কিবলা থেকে ঘুরিয়া যাওয়া ইত্যাদি) না হয়ে থাকলে অবিলম্বে দাঁড়িয়ে যাবেন এবং ছুটে যাওয়া ১টি রাকাত আদায় করবেন। অতঃপর শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ, দরূদ ও দোয়া মাসূরা পড়ে সাহু সিজদা (সেজদায়ে সাহু) প্রদান করবেন।
  • ফিকহী ভিত্তি ও প্রমাণ:
    • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীতে বর্ণিত রয়েছে: মাসবুক ব্যক্তি যদি ভুলবশত বা মনে করে যে তার সালাত শেষ হয়ে গেছে—ইমামের সাথে সালাম ফিরিয়ে ফেলে, অতঃপর স্মরণ হওয়ার পর দাঁড়ায় এবং বাকি সালাত সম্পন্ন করে, তবে সে সালাতের শেষে সেজদায়ে সাহু আদায় করে নিবে; এতে তার সালাত সম্পূর্ণরূপে সহীহ হয়ে যাবে।
  • সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
    1. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২০৩ (অষ্টম মাসআলা: মাসবুকের সালামের ভুল ও সেজদায়ে সাহু)।
    2. নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ১০৬ (পরিচ্ছেদ: সিজদায়ে সাহুর বিবরণ)।
    3. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২২শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১০২ (অধ্যায়: বাবুল মাসবুক ওয়াল লাহিক — মাসবুকের সালাম ফেরানো ও সাহু সিজদার বিধান)।

২. সিরাত (রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনী) মুখস্থ করার উপায়:

  • পদ্ধতি ও পরামর্শ: সিরাত স্মরণ ও মুখস্থ রাখার জন্য কয়েকটি ধাপে অগ্রসর হওয়া সুন্নাতসম্মত ও কার্যকর: ১. ধারাবাহিক সময়সীমা (Timeline) মুখস্থ করা: পুরো সিরাতকে ৫টি প্রধানভাগে ভাগ করে নেওয়া: (ক) জন্ম থেকে নবুওয়াত প্রাপ্তি (১–৪০ বছর), (খ) মাক্কী জীবনে ইসলাম প্রচার (১–১৩ বছর), (গ) হিজরত ও মাদানী জীবনের প্রারম্ভিক অবস্থা, (ঘ) প্রধান গজওয়াসমূহ (বদর, উহুদ, খন্দক, হুদাইবিয়া, খাইবার, মক্কার বিজয় ইত্যাদি), (ঙ) বিদায় হজ্জ ও ওফাত। ২. সংক্ষিপ্ত প্রামাণ্য কিতাব অধ্যায়ন: প্রাথমিক পর্যায়ে সহজ ও সংক্ষিপ্ত প্রামাণ্য গ্রন্থ (যেমন: নশরুত তীব, আর-রাহীকুল মাখতূম, যাদুল মা'আদ) নিয়মিত তিলাওয়াত ও অধ্যায়ভিত্তিক মূল বিষয়গুলো নোট করা। ৩. মুযাকারা ও আলোচনা: যা পড়লেন তা পরিবারের সদস্য বা দ্বীনদার বন্ধুদের সাথে প্রতিদিন একটু আলোচনা করা।
  • সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
    1. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২৫শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৩৫২ (অধ্যায়: কিতাবু সইয়ার ওয়াত তারিখ — শামায়েল ও সিরাতে নববীর ফযীলত ও গুরুত্ব)।
    2. দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৪০১ (অধ্যায়: অনুসরণের মূলনীতি — রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন চরিত অনুসরণের শরয়ী গুরুত্ব)।

৩. প্রস্রাবের পর পিচ্ছিল পদার্থ (ওদী) ও তৎসংক্রান্ত মাসআলা:

প্রস্রাবের আগে বা পরে লিঙ্গের মাথায় সামান্য যে আঠালো ও পিচ্ছিল পদার্থ বের হয়, ফিকহের পরিভাষায় একে 'ওদী' (ودي) বলা হয়। এটি নাপাক এবং এটি নির্গত হলে ওযু ভেঙে যায়।

(১) আপনার বর্তমান করণীয়:

  • প্রস্রাব করার পর পুরোপুরি ফোঁটা বন্ধ হওয়ার জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবেন, যাকে ফিকহের ভাষায় 'ইস্তিবরা' (استبراء) বলা হয়। হালকা একটু হাঁটাচলা করা বা টিস্যু ব্যবহার করা যেতে পারে। ফোঁটা আসা বন্ধ হলে পানি দিয়ে ইস্তিনজা করে ওযু করে নেবেন।
  • তবে অতিরিক্ত জোর করে বা চাপ দিয়ে বের করার চেষ্টা করবেন না; এতে প্রস্রাবের নালী ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ওয়াসওয়াসা বৃদ্ধি পায়।
  • সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর: নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ২০ (পরিচ্ছেদ: ইস্তিনজা ও ইস্তিবরার বর্ণনাসমূহ); ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৫৫ (ওদী নির্গত হলে ওযু ভঙ্গের মাসআলা)।

(২) এই সমস্যা দূর করার মাসনুন আমল:

  • আমল: ১. শৌচাগারে প্রবেশের পূর্বে মাসনুন দোয়া পড়া: «اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ»। ২. বের হওয়ার পর দোয়া পাঠ করা: «غُفْرَانَكَ، الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَذْهِبَ عَنِّي الأَذَى وَعَافَانِي» । ৩. মাসনুন কৌশল (পানি ছিটানো): শৌচাগার থেকে বের হওয়ার পর অযু করার সময় কাপড়ের সামনের অংশে সামান্য পানি ছিটিয়ে (স্প্রে করে) দেবেন। পরবর্তীতে সামান্য ভেজা অনুভূত হলে আপনি নিশ্চিত থাকবেন যে তা আপনার ছিটানো পানি, ফলে মনের শয়তানী কূচিন্তা দূর হবে । (শারীরিক দুর্বলতা থাকলে চর্ম/ইউরোলজিস্ট ডাক্তারের চিকিৎসা নিন)।
  • সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর: নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ২২–২৩ (ইস্তিনজার মাসাইল ও পানি ছিটানোর মাসনুন নিয়ম)।

(৩) কাপড়ে লাগলে সালাতের হুকুম এবং কবরের আজাবের হাদিসের ব্যাখায় আপনার অবস্থা:

  • সালাতের হুকুম (নাপাকীর পরিমাণ): ওদী হলো নাজাসাতে গলীযাহ (গুরু নাপাক)। কাপড়ে ওদী বা প্রস্রাবের ফোঁটা শুকিয়ে বা লেগে থাকলে তা যদি পরিমাণে এক দিরহাম তথা ৩.০৬১ গ্রাম বা তার কম হয়, তবে ঐ কাপড় পরে সালাত আদায় করলে সালাত আদায় হয়ে যাবে (তবে ধুয়ে নেওয়া সুন্নাত/উত্তম) । আর যদি এক দিরহামের চেয়ে বেশি পরিমানে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা ধৌত করা ফরয; না ধুয়ে পড়া সালাত কাযা করা (পুনরায় পড়া) ওয়াজিব ।
  • কবরের আজাব সংক্রান্ত হাদীসের হুকুম: হাদীস শরীফে প্রস্রাবের ছিটা থেকে বেঁচে না থাকার কারণে যে কবরের আজাবের ধমকি এসেছে, তা প্রযোজ্য ঐসব ব্যক্তির জন্য যারা জেনে-বুঝে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রস্রাব ও নাপাকী থেকে বেপরোয়া থাকে এবং পবিত্রমূল নীতি তোয়াক্কা করে না। আপনি যেহেতু সচেতন এবং সতর্ক থাকার চেষ্টা করছেন, তাই ইনশাআল্লাহ আপনি উক্ত আজাবের হাদীসের অন্তর্ভুক্ত নন।
  • সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
    1. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ১০১ (পরিচ্ছেদ: নাপাকীর পরিমাণ ও সালাতের হুকুম)।
    2. নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ২০ & ২২ (এক দিরহাম পরিমাণের ফিকহী সীমা)।
    3. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (২০শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৯৫ (অধ্যায়: কিতাবুত তাহারাত — প্রস্রাব থেকে অসতর্কতা ও কবরের আজাব সংক্রান্ত হাদীসের ব্যাখ্যা)।

(৪) এতে কি ওয়াসওয়াসা সংক্রান্ত কিছু আছে?

  • হ্যাঁ, এতে স্পষ্ট ওয়াসওয়াসার (শয়তানী কূচিন্তা) উপাদান বিদ্যমান।
  • আপনি নিজেই উল্লেখ করেছেন যে—প্রস্রাবের ২৫-৩০ মিনিট পর চাপ দিলে আসে কিন্তু গড়িয়ে পড়ে না, এবং 'মনে হয় যেন বের হচ্ছে'। এই অহেতুক চাপ দিয়ে দেখা বা কেবল মনের কল্পনার ওপর নির্ভর করা শয়তানের প্ররোচনা।
  • ফিকহী মূলনীতি অনুযায়ী: যতক্ষণ না নিশ্চিতভাবে বাইরে নাপাকী নির্গত হতে দেখা যায়, ততক্ষণ ওযু ভাঙবে না এবং ওযুকে পবিত্র বলেই ধর্তব্য করতে হবে। অনর্থক টিস্যু বা আঙুল দিয়ে চেপে দেখার চেষ্টা একেবারেই বর্জন করুন।
  • সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
    1. নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ২০ (ইস্তিবরা ও অহেতুক সংশয় নিরসন)।
    2. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (৫ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৯৫ (অধ্যায়: কিতাবুল ওজু — ওয়াসওয়াসা ও অহেতুক কূচিন্তা দূর করার শরয়ী সমাধান)।

আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.