ডিজিটাল ছবি ও ভিডিও তোলা কি হারাম? ওয়াজের ভিডিও করা কি জায়েজ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
ডিজিটাল ছবি তুলা বা ভিডিও করা কি হারাম?? হাদিস এ এই বিষয় নিয়ে সরাসরি কিছু আছে কি?
যেমন : বর্তমানে ওয়াজ গুলোতে ভিডিও ও ছবি তুলা হয় এই গুলো কি জায়েজ আছে?
কারণ, অনেক বড় আলেমদের থেকে শুনেছি যে ছবি তুলা ও ভিডিও করা গুনাহে কবীরা। আবার অনেক বড় আলেমদেরকে ও ওয়াজ এ ভিডিও করতে দেখা যায়। তাই এই বিষয় টা নিয়ে জানতে চাচ্ছি। এটা কি হাদিস আছে যে এটা স্পষ্ট হারাম? নাকি জায়েজ আছে, দয়া করে জানাবেন।।
Answer
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
উত্তর (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী):
আপনার প্রশ্নের বিষয়টি বর্তমানে বহুল আলোচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ। সংক্ষেপে উত্তর হলো: প্রাণীর (জীবন্ত সত্তার) ছবি তোলা বা ভিডিও করা মূলত নিষিদ্ধ (হারাম বা গুনাহে কবীরা), তবে প্রয়োজনে কিছু ব্যতিক্রমী বিধান রয়েছে। নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. হাদিসে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আছে কি?
হ্যাঁ, হাদিসে সরাসরি এবং সুস্পষ্টভাবে প্রাণীর ছবি তৈরি ও তোলার ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। যদিও হাদিসে ব্যবহৃত শব্দ "تَصْوِير" (তাসবীর) মূলত "ছবি তৈরি করা" বা "আকৃতি দেওয়া" অর্থে ব্যবহৃত হয়, তবে ফুকাহায়ে কেরাম (যেমন: ইবনে আবিদিন শামি রহ.) স্পষ্ট করেছেন যে, ক্যামেরা বা ভিডিওর মাধ্যমে ছবি ধারণ করাও এই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত, কারণ এতেও জীবন্ত সত্তার আকৃতি বা প্রতিচ্ছবি স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হয়।
প্রাসঙ্গিক হাদিসসমূহ:
১. হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
«مَنْ صَنَعَ صُورَةً فِي الدُّنْيَا كُلِّفَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنْ يَنْفُخَ فِيهَا الرُّوحَ وَلَيْسَ بِنَافِخٍ» "যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোনো (প্রাণীর) ছবি তৈরি করবে, কিয়ামতের দিন তাকে সেই ছবিতে প্রাণ সঞ্চার করার জন্য আদেশ দেওয়া হবে, কিন্তু সে তা করতে পারবে না।" (সহিহ বুখারি: ৫৯৬৩, সহিহ মুসলিম: ২১১০)
২. হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
«كُلُّ مُصَوِّرٍ فِي النَّارِ، يُجْعَلُ لَهُ بِكُلِّ صُورَةٍ صَوَّرَهَا نَفْسًا فَتُعَذِّبُهُ فِي جَهَنَّمَ» "প্রত্যেক ছবি নির্মাতা জাহান্নামে যাবে। তার তৈরি প্রতিটি ছবির জন্য একটি প্রাণ সৃষ্টি করা হবে, যা তাকে জাহান্নামে আজাব দিতে থাকবে।" (সহিহ বুখারি: ২২২৫, সহিহ মুসলিম: ২১১০)
৩. হযরত আবু তালহা (রা.) থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
«لَا تَدْخُلُ الْمَلَائِكَةُ بَيْتًا فِيهِ كَلْبٌ وَلَا صُورَةٌ» "যে ঘরে কুকুর বা (প্রাণীর) ছবি থাকে, সেই ঘরে (রহমতের) ফেরেশতারা প্রবেশ করেন না।" (সহিহ বুখারি: ৩২২৫, সহিহ মুসলিম: ২১০৬)
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে: ইমাম ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) তাঁর বিখ্যাত কিতাব রাদ্দুল মুহতার (শামি)-তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, প্রাণীর ছবি তৈরি করা বা ধারণ করা (যা ক্যামেরার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, যদি না কোনো বাস্তব ও শরীয়তসম্মত প্রয়োজন হয়। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৭৪৮-৭৫০)
২. ওয়াজ বা ইসলামী অনুষ্ঠানের ভিডিও ও ছবি তোলার বিধান
বর্তমানে ওয়াজ বা ইসলামী অনুষ্ঠানে ভিডিও ও ছবি তোলা নিয়ে দুটি দিক রয়েছে:
ক) সাধারণ নীতি (নিষেধাজ্ঞা): যেহেতু এতে জীবন্ত মানুষের (বক্তা ও শ্রোতাদের) ছবি বা ভিডিও ধারণ করা হয়, তাই মূল নীতি হিসেবে এটি নিষিদ্ধ। অনেক বড় আলেম এটিকে গুনাহে কবীরা বলেছেন, যা হাদিসের কঠোর ভাষার ভিত্তিতেই বলা হয়েছে।
খ) ব্যতিক্রমী বিধান (প্রয়োজনের ভিত্তিতে): হানাফি ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো: "الضرورات تبيح المحظورات" (প্রয়োজন নিষিদ্ধ বস্তুকে বৈধ করে দেয়)। তবে এখানে "প্রয়োজন" বলতে ব্যক্তিগত শখ বা ব্যবসায়িক প্রচার নয়, বরং শরীয়তের প্রকৃত উদ্দেশ্য (যেমন: দ্বীনের প্রচার, শিক্ষা, দাওয়াত) জড়িত থাকা।
ইসলামী স্কলারদের মতপার্থক্যের কারণ: ১. কঠোর মত: অনেক আলেম (যেমন: শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেহলভী, মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ.)-এর পরবর্তী অনুসারীদের কেউ কেউ বলেন, ক্যামেরার ছবি হাদিসের নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত, তাই এটি সব অবস্থায় নিষিদ্ধ। তারা ওয়াজের ভিডিওকেও নিষিদ্ধ বলেন। ২. নমনীয় মত: কিছু আলেম (যেমন: মুফতি তাকি উসমানি দা.বা. এবং কিছু সমকালীন মুফতি) বলেন, যদি ভিডিওটি শুধুমাত্র দ্বীনের প্রচারের জন্য হয়, কোনো অশ্লীলতা বা ফিতনার আশঙ্কা না থাকে, এবং এটি মানুষের দ্বীনি উপকারে আসে, তবে প্রয়োজনের ভিত্তিতে এর অনুমতি হতে পারে। তবে এটি মূলত "খিলাফে আওলা" (উত্তমের বিপরীত) এবং সতর্কতা অবলম্বনই উত্তম।
হানাফি কিতাবের আলোকে সিদ্ধান্ত:
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ.)-তে উল্লেখ আছে যে, প্রাণীর ছবি তোলা নিষিদ্ধ; তবে যদি কোনো শরীয়তসম্মত প্রয়োজন হয় (যেমন: চিকিৎসা, শনাক্তকরণ, দ্বীনি শিক্ষার প্রচার), তবে তা অনুমোদিত হতে পারে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২৩০-২৩৫)
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি দা.বা.)-তে বলা হয়েছে, টিভি বা ভিডিওর মাধ্যমে দ্বীনি অনুষ্ঠান প্রচার করা জায়েজ হতে পারে, যদি তাতে ফিতনা বা শরীয়তবিরোধী কিছু না থাকে। (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৬০০-৬০৫)
- বাহিশতী যেওর (আশরাফ আলী থানভী রহ.)-তে সাধারণভাবে ছবি তোলার নিষেধাজ্ঞা এসেছে, তবে প্রয়োজনের ব্যতিক্রম উল্লেখ আছে। (বাহিশতী যেওর, পৃ. ৪৫০)
৩. ওয়াজে ভিডিও করা কি জায়েজ?
সারসংক্ষেপ:
- যদি ভিডিওটি শুধুমাত্র দ্বীনের প্রচারের জন্য হয় (যেমন: ইসলামী শিক্ষা, কুরআন-হাদিসের দাওয়াত), কোনো ফিতনা, অশ্লীলতা বা শরীয়তবিরোধী দৃশ্যের আশঙ্কা না থাকে, এবং মানুষের দ্বীনি উপকার হয়, তবে অনেক সমকালীন হানাফি মুফতির মতে এটি প্রয়োজনের ভিত্তিতে জায়েজ হতে পারে (তবে উত্তম হলো সতর্কতা)।
- যদি ভিডিওটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত প্রচার, শখ, বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে হয়, তবে তা নিষিদ্ধ।
- সতর্কতা: ওয়াজের ভিডিওতে যদি নারীদের পর্দা না থাকে, বাদ্যযন্ত্র থাকে, বা অশ্লীলতার আশঙ্কা থাকে, তবে তা সব অবস্থায় হারাম।
উত্তম পন্থা: যেহেতু হাদিসে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আছে এবং ফুকাহায়ে কেরামের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে, তাই সতর্কতামূলক পথ (এহতিয়াত) অবলম্বন করা উত্তম। অর্থাৎ, যদি ভিডিও না করেও দ্বীনের প্রচার সম্ভব হয়, তবে ভিডিও না করাই ভালো। আর যদি ভিডিওর মাধ্যমে ব্যাপক দ্বীনি উপকার হয়, তবে শরীয়তসম্মত শর্তাবলি মেনে করা যেতে পারে।
৪. উপসংহার
১. প্রাণীর ছবি তোলা বা ভিডিও করা মূলত নিষিদ্ধ (গুনাহে কবীরা), কারণ হাদিসে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। ২. প্রয়োজনের ভিত্তিতে ব্যতিক্রম হতে পারে, বিশেষত দ্বীনের প্রচারের জন্য, যদি শরীয়তবিরোধী কিছু না থাকে। ৩. ওয়াজের ভিডিও এক্ষেত্রে মতপার্থক্যপূর্ণ; তবে দ্বীনি প্রচারের উদ্দেশ্যে এবং শর্তাবলি মেনে হলে অনেক মুফতির মতে জায়েজ হতে পারে। ৪. সতর্কতা অবলম্বন করা উত্তম, কারণ হাদিসের ভাষা অত্যন্ত কঠোর।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হালাল-হারামের সঠিক জ্ঞান দান করুন এবং সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
তথ্যসূত্র:
- সহিহ বুখারি: ২২২৫, ৩২২৫, ৫৯৬৩
- সহিহ মুসলিম: ২১০৬, ২১১০
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন শামি): খণ্ড ৬, পৃ. ৭৪৮-৭৫০
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি মুহাম্মদ শফী): খণ্ড ৪, পৃ. ২৩০-২৩৫
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): খণ্ড ৩, পৃ. ৬০০-৬০৫
- বাহিশতী যেওর (আশরাফ আলী থানভী): পৃ. ৪৫০
- ফাতাওয়া আলমগিরি: খণ্ড ৫, পৃ. ৩৫০ (ছবি সংক্রান্ত অধ্যায়)
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।