ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সময় সাক্ষীর সাইন দেওয়া কি জায়েয?
Halal and Haram · Hanafi
Question
একজন ব্যাংক থেকে ঋণ নিবে সেখানে সাক্ষীর সাইন লাগবে। এই সাইন দিলে কি গুনাহ হবে
Answer
উত্তর (ফতোয়া):
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সময় সাক্ষীর সাইন দেওয়ার হুকুম নির্ভর করে ঋণটি কী ধরনের তার উপর। বিস্তারিত আলোচনা নিচে দেওয়া হলো:
১. যদি ঋণটি সুদভিত্তিক (Interest-based) হয়:
আজকাল অধিকাংশ প্রচলিত ব্যাংক (যেমন: কনভেনশনাল ব্যাংক) সুদভিত্তিক লেনদেন করে। যদি ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণে সুদ (Interest/Riba) শর্ত থাকে, তবে এমন ঋণে সাক্ষী হওয়া বা সাইন দেওয়া জায়েয নয় এবং গুনাহের কাজ। কারণ সুদ হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর সাথে যুদ্ধের শামিল (সূরা বাকারা: ২৭৯)। আর কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَلَا تَعَاوَنُوْا عَلَی الْاِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)
সুদি ঋণে সাক্ষী হওয়া মানে সুদের লেনদেনকে বৈধতা দেওয়া এবং তাতে সহযোগিতা করা। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং সুদের সাক্ষী—সবাইকে অভিশাপ করেছেন এবং বলেছেন, "তারা সবাই সমান (গুনাহে)।" (সহিহ মুসলিম: ১৫৯৮)
হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে বর্ণিত আছে:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): "সুদি চুক্তি লেখা বা তাতে সাক্ষী হওয়া জায়েয নয়; কারণ এটি পাপের কাজে সহযোগিতা।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ১৬৬)
- ফতোয়ায়ে আলমগিরি: "সুদি লেনদেনের সাক্ষী হওয়া বা দলিল লেখা জায়েয নয়।" (ফতোয়ায়ে আলমগিরি, খণ্ড ৩, পৃ. ২১৪)
- ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভী): "সুদি কারবারে সাক্ষী হওয়া বা লেখক হওয়া গুনাহ।" (ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ৩, পৃ. ২৩৪)
২. যদি ঋণটি সুদমুক্ত ও শরীয়াহসম্মত হয়:
যদি ইসলামি শরীয়াহ অনুযায়ী পরিচালিত ব্যাংক (যেমন: ইসলামি ব্যাংক) থেকে মুদারাবা, মুশারাকা, ইজারা বা বাই'মুয়াজ্জাল ইত্যাদি শরীয়াহসম্মত পদ্ধতিতে ঋণ নেওয়া হয় এবং তাতে কোনো সুদ না থাকে, তবে সাক্ষী হওয়া জায়েয এবং সওয়াবের কাজ। কারণ কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঋণের লেনদেন লিখিতভাবে সংরক্ষণ করতে এবং সাক্ষী রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন:
وَاسْتَشْهِدُوْا شَهِیْدَیْنِ مِنْ رِّجَالِكُمْ "তোমাদের পুরুষদের মধ্যে দু'জন সাক্ষী রাখো।" (সূরা বাকারা: ২৮২)
৩. যদি সাক্ষী না হয়ে শুধু সাইন দেওয়া হয়:
কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংক শুধু কাগজপত্রে সাইন নেয়, প্রকৃত সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত থাকতে বলে না। তবে সাইন দেওয়ার অর্থই হলো চুক্তির সাক্ষ্য দেওয়া। তাই সুদি ঋণের ক্ষেত্রে সাইন দেওয়াও জায়েয নয়।
৪. জরুরি পরামর্শ:
- যদি আপনি সুদি ঋণে সাক্ষী বা সাইন দিতে বাধ্য হন (যেমন: চাকরির শর্ত বা পারিবারিক চাপ), তবে প্রথমে সেই ঋণ পরিহার করার চেষ্টা করুন।
- যদি একান্তই বাধ্য হন এবং আপনার সাক্ষ্য ছাড়া ঋণটি না হয়, তবে অন্ততপক্ষে সাক্ষী না হয়ে শুধু কাগজে সাইন দেওয়া থেকে বিরত থাকুন; বরং সুদমুক্ত ইসলামি ব্যাংক বা শরীয়াহসম্মত বিকল্প খুঁজুন।
- সুদি ঋণে সাক্ষী হওয়া থেকে বিরত থাকলে আল্লাহ তাআলা বরকত দান করবেন এবং উত্তম বিকল্প দান করবেন—এই বিশ্বাস রাখুন।
সংক্ষেপে: সুদি ঋণে সাক্ষীর সাইন দেওয়া হারাম ও গুনাহ। শরীয়াহসম্মত ঋণে সাক্ষী হওয়া জায়েয ও সওয়াবের কাজ।
والله أعلم بالصواب