তওবার শর্ত, তওবা কবুল হওয়ার আশা, ওয়াসওয়াসা ও পুনরাবৃত্ত চিন্তার সমাধান।

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 7033
Questioner: Salakin Sadman
Question Asked: 17 Oct 2026, 05:22 PM
Reviewed & Published: 17 Oct 2026, 05:25 PM
Views: 13
Tokens: 18,866
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

একটি ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল মাসআলা সম্পর্কে হানাফি ফিকহের আলোকে কুরআন-সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহি দলিলসহ দিকনির্দেশনা কামনা করছি। প্রশ্নটি সাধারণ মাসআলা হিসেবে উপস্থাপন করা হলো।

ধরা যাক, একজন যুবক ২০২০ সালে দ্বীনের পথে ফিরে আসার পর একসময় একটি হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তাঁর দ্বারা এমন একটি গুরুতর গুনাহ সংঘটিত হয়, যেখানে যৌনমিলনের পূর্ণতা না ঘটলেও পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগ নারীর যোনিতে প্রবেশ করেছিল। ঘটনাটি ঘটার পরপরই তিনি নিজেকে বিরত করেন এবং সেই হারাম সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করেন। একই দিন মাগরিবের নামাজের পর তিনি কান্নাকাটি করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান, আন্তরিকভাবে তওবা করেন এবং ভবিষ্যতে আর কখনো এ ধরনের গুনাহে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করেন। পরবর্তী সময়েও তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।

কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও তাঁর মনে অতীতের ঘটনাটি নিয়ে গভীর অনুশোচনা, আল্লাহর কাছে তওবা কবুল হয়েছে কি না—এমন দুশ্চিন্তা, আখিরাতে শাস্তির ভয় এবং কিয়ামতের দিন গুনাহটি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কাজ করে। কখনো কখনো তিনি মনে করেন, একই গুনাহের জন্য বারবার তওবা ও ইস্তিগফার না করলে হয়তো ক্ষমা পাওয়া যাবে না। ভবিষ্যতে একজন দ্বীনদার ও নেককার জীবনসঙ্গী পাওয়ার বিষয়েও তাঁর মনে সংশয় তৈরি হয়। তিনি অতীতের ঘটনাটি ভুলে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে দ্বীনি জীবন পরিচালনা করতে চান, কিন্তু স্মৃতিটি বারবার মনে ফিরে আসে।

এ অবস্থায় নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা কামনা করছি:

১. তওবার শুদ্ধতা ও শর্ত: বর্ণিত পরিস্থিতিতে অনুতপ্ত হওয়া, গুনাহ থেকে সরে আসা, হারাম সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং ভবিষ্যতে তা থেকে বিরত থাকার দৃঢ় সংকল্প করার মাধ্যমে তওবার মৌলিক শর্তগুলো পূরণ হয় কি না? হানাফি ফিকহের আলোকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলবেন।

২. একই গুনাহের জন্য বারবার তওবা: কেউ যদি আন্তরিকভাবে তওবা করে এবং পরে আর সেই গুনাহে ফিরে না যায়, তাহলে কি ওই একই অতীতের গুনাহের জন্য প্রতিদিন বা বারবার নতুন করে তওবা করা আবশ্যক? নাকি আন্তরিক তওবার পর সাধারণভাবে ইস্তিগফার ও নেক আমল চালিয়ে যাওয়াই যথেষ্ট?

৩. তওবা কবুল হওয়ার আশা: আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তওবা করার পরও যদি কারও মনে দীর্ঘদিন অপরাধবোধ ও ভয় থেকে যায়, তাহলে এই অনুভূতিকে কি তওবা কবুল না হওয়ার প্রমাণ মনে করা ঠিক হবে? আল্লাহর রহমত সম্পর্কে আশা রাখা এবং তওবার ব্যাপারে সঠিক মনোভাব কী হওয়া উচিত?

৪. ওয়াসওয়াসা ও পুনরাবৃত্ত চিন্তা: অতীতের গুনাহ নিয়ে বারবার একই ভয়, সন্দেহ ও অনুশোচনা ফিরে এলে একজন মুসলিমের করণীয় কী? কোন পর্যায়ে অনুশোচনা উপকারী থাকে, আর কখন তা শয়তানের ওয়াসওয়াসা বা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় পরিণত হতে পারে?

৫. ভবিষ্যতে নেককার জীবনসঙ্গী লাভ: অতীতে গুরুতর গুনাহে জড়িয়ে পড়লেও আন্তরিকভাবে তওবা করে সংশোধিত জীবন যাপনকারী ব্যক্তির জন্য দ্বীনদার ও নেককার জীবনসঙ্গী পাওয়ার আশা রাখা কি যথার্থ? সূরা আন-নূরের ২৬ নম্বর আয়াত এ প্রসঙ্গে কীভাবে বুঝতে হবে? তওবাকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে আয়াতটির প্রয়োগ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা কামনা করছি।

৬. আখিরাতে গুনাহ প্রকাশ ও হিসাব: কোনো ব্যক্তি আন্তরিকভাবে তওবা করে গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার পরও যদি কিয়ামতের দিন সেই গুনাহ প্রকাশ হয়ে যাওয়া, কঠিন হিসাব বা শাস্তির আশঙ্কায় ভোগেন, তাহলে কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে তাঁর কী বিশ্বাস ও মনোভাব রাখা উচিত? আল্লাহর ক্ষমা, গুনাহ গোপন রাখা এবং তওবাকারীর প্রতি তাঁর রহমত সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য দলিলসহ বুঝিয়ে বলবেন।

৭. অতীতের স্মৃতি ভুলে যাওয়া: কেউ যদি অতীতের গুনাহের স্মৃতি ভুলে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে দ্বীনি জীবন যাপন করতে চান, কিন্তু অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্মৃতিটি বারবার মনে ফিরে আসে, তাহলে তাঁর করণীয় কী? শুধু স্মৃতি ফিরে আসার কারণে কি নতুন করে তওবা করা জরুরি, নাকি আন্তরিক তওবার পর ওই বিষয়টি নিয়ে বারবার নিজেকে কষ্ট না দিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া উচিত?

৮. বাস্তব করণীয়: এ ধরনের পরিস্থিতিতে তওবা কবুল হওয়ার আশা নিয়ে স্থির থাকা, আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা এবং অযথা ভয় ও হতাশা থেকে বাঁচার জন্য কী কী আমল ও মানসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত? সালাতুত তওবা, ইস্তিগফার, দোয়া এবং অন্যান্য নেক আমলের ক্ষেত্রে সঠিক নির্দেশনা কী?

সম্ভব হলে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাব, কুরআনের প্রাসঙ্গিক আয়াত, সহিহ হাদিস এবং গ্রহণযোগ্য তাফসিরের আলোকে প্রদান করবেন। বিশেষ করে তওবার শর্ত, তওবা কবুল হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী থাকার বিধান এবং একই গুনাহ নিয়ে বারবার সন্দেহে না ভোগার বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা কামনা করছি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আন্তরিক তওবা করার, তাঁর রহমতের ওপর সঠিকভাবে আশা রাখার এবং দ্বীনের ওপর অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

بسم الله الرحمن الرحيم، الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد:

প্রিয় ভাই, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। আল্লাহ তাআলা আপনার আন্তরিক তওবা কবুল করুন এবং অন্তরকে প্রশান্তি দান করুন। নিচে হানাফি ফিকহের আলোকে ধাপে ধাপে উত্তর প্রদান করা হলো।


১. তওবার শুদ্ধতা ও শর্ত

হানাফি ফিকহের মূলনীতি: তওবার তিনটি মৌলিক শর্ত রয়েছে—

  1. অনুতাপ (নদম): গুনাহের জন্য অন্তরে অনুতপ্ত হওয়া।
  2. গুনাহ ত্যাগ করা (ইনতিকা): সাথে সাথে গুনাহ থেকে বিরত হওয়া।
  3. দৃঢ় সংকল্প (আযম): ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা।

আপনার বর্ণিত পরিস্থিতিতে এই তিনটি শর্তই পূর্ণ হয়েছে:

  • আপনি অনুতপ্ত হয়েছেন (কান্নাকাটি, অনুশোচনা)।
  • গুনাহ থেকে সরে এসেছেন এবং হারাম সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করেছেন।
  • ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করেছেন।

দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন—

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" (সূরা আন-নূর: ৩১)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

"অনুতাপই তওবা।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৫২; মুসনাদে আহমাদ: ৩৫৬৮)

হানাফি কিতাব: ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার» (২/৪৯৫) ও «ফাতাওয়া আলমগিরি» (৫/৪৫০)-তে তওবার শর্তসমূহ বর্ণিত হয়েছে। মোল্লা আলী কারী (রহ.) «মিরকাতুল মাফাতিহ»-তে বলেন, তওবা কবুলের জন্য নদম, তরক ও আযম অপরিহার্য।

উপসংহার: আপনার তওবা মৌলিকভাবে শুদ্ধ। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ তাআলা তা কবুল করেছেন।


২. একই গুনাহের জন্য বারবার তওবা

মাসআলা: একবার আন্তরিক তওবা করার পর যদি পুনরায় সেই গুনাহে ফিরে না যান, তাহলে একই গুনাহের জন্য প্রতিদিন বা বারবার নতুন করে তওবা করা আবশ্যক নয়। তবে সাধারণভাবে ইস্তিগফার ও নেক আমল চালিয়ে যাওয়া উত্তম।

দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

"যে ব্যক্তি তওবা করে, সে যেন গুনাহই করেনি।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৫৩)

হানাফি কিতাব: ইমাম ইবনে আবিদিন «রাদ্দুল মুহতার» (২/৪৯৫)-এ উল্লেখ করেন, তওবা একবারই যথেষ্ট; তবে বারবার ইস্তিগফার করা মুস্তাহাব ও সওয়াবের কাজ। «ইমদাদুল ফাতাওয়া» (২/৩৮৬)-তে মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন, তওবা কবুলের পর পুনরায় সেই গুনাহের কথা স্মরণ করে বারবার তওবা করা জরুরি নয়; বরং সাধারণ ইস্তিগফারই যথেষ্ট।

উপসংহার: আপনার একবারের আন্তরিক তওবাই যথেষ্ট। প্রতিদিন নতুন করে তওবা করা আবশ্যক নয়; সাধারণ ইস্তিগফার ও নেক আমল চালিয়ে যান।


৩. তওবা কবুল হওয়ার আশা

মাসআলা: তওবা করার পরও যদি মনে অপরাধবোধ ও ভয় থাকে, তাহলে তা তওবা কবুল না হওয়ার প্রমাণ নয়। বরং এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা হতে পারে। আল্লাহর রহমতের ওপর আশা রাখা ঈমানের অংশ।

দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন—

"নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও ভালোবাসেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২২২)

"তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

"আল্লাহ তাআলা বলেন: হে আদম সন্তান! তুমি যত বড় গুনাহই করো না কেন, যতক্ষণ তুমি আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমি ক্ষমা করব।" (সুনানে তিরমিজি: ৩৫৪০)

হানাফি কিতাব: ইমাম ইবনে আবিদিন «রাদ্দুল মুহতার» (২/৪৯৬)-এ বলেন, তওবার পর আল্লাহর রহমতের ওপর আশা রাখা ওয়াজিব; নিরাশ হওয়া হারাম। «মা'আরিফুল কুরআন» (সূরা আয-যুমার: ৫৩)-এ মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া কুফরের কাছাকাছি।

উপসংহার: আপনার অনুভূতি তওবা কবুল না হওয়ার প্রমাণ নয়। আল্লাহর রহমতের ওপর দৃঢ় আশা রাখুন।


৪. ওয়াসওয়াসা ও পুনরাবৃত্ত চিন্তা

মাসআলা: অতীতের গুনাহ নিয়ে বারবার ভয়, সন্দেহ ও অনুশোচনা ফিরে এলে করণীয়:

  • উপকারী অনুশোচনা: যা আল্লাহর নৈকট্য বাড়ায়, নেক আমলে উৎসাহ দেয় এবং গুনাহ থেকে দূরে রাখে—তা উপকারী।
  • শয়তানের ওয়াসওয়াসা: যা হতাশা, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশা এবং অকারণ দুশ্চিন্তা সৃষ্টি করে—তা শয়তানের প্ররোচনা।

দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

"নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের কাছে আসে এবং বলে: কে তোমার রব? ..." (সহিহ মুসলিম: ১৩৪)

"শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও।" (সূরা ফুসসিলাত: ৩৬)

হানাফি কিতাব: ইমাম ইবনে আবিদিন «রাদ্দুল মুহতার» (২/৪৯৬)-এ বলেন, ওয়াসওয়াসা শয়তানের পক্ষ থেকে আসে; তা উপেক্ষা করা ওয়াজিব। «বেহেশতী জেওর» (১/৩২)-এ হাকিমুল উম্মত থানভী (রহ.) বলেন, ওয়াসওয়াসা আসলে তা নয়; বরং তা শয়তানের প্ররোচনা।

উপসংহার: অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও হতাশা শয়তানের ওয়াসওয়াসা। তা উপেক্ষা করে নেক আমলে মনোযোগ দিন।


৫. ভবিষ্যতে নেককার জীবনসঙ্গী লাভ ও সূরা আন-নূরের ২৬ নম্বর আয়াত

আয়াত:

"দুশ্চরিত্রা নারী দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য এবং দুশ্চরিত্র পুরুষ দুশ্চরিত্রা নারীর জন্য; আর পবিত্র নারী পবিত্র পুরুষের জন্য এবং পবিত্র পুরুষ পবিত্র নারীর জন্য।" (সূরা আন-নূর: ২৬)

ব্যাখ্যা: এই আয়াতের অর্থ হলো—সাধারণত পবিত্র ও নেককার ব্যক্তিরা পবিত্র ও নেককার সঙ্গী লাভ করে। তবে এটি চূড়ান্ত বিধান নয়; বরং আল্লাহর রহমত ও তওবার মাধ্যমে মানুষ পরিবর্তিত হতে পারে।

হানাফি তাফসির: «মা'আরিফুল কুরআন» (সূরা আন-নূর: ২৬)-এ মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন, এই আয়াত সাধারণ নিয়ম বর্ণনা করে; তওবাকারীর জন্য আল্লাহর রহমত সর্বদা উন্মুক্ত। তওবা করার পর আল্লাহ তাআলা তাকে পবিত্র করে দেন এবং নেককার সঙ্গী দান করতে পারেন।

হানাফি কিতাব: «ফাতাওয়া উসমানি» (২/৩৮৬)-এ মুফতি তাকী উসমানি (দা.বা.) বলেন, তওবাকারীর অতীত গুনাহ আল্লাহ ক্ষমা করেন; তাকে পবিত্র করে দেন। তাই নেককার সঙ্গী পাওয়ার আশা রাখা যথার্থ।

উপসংহার: তওবা করার পর আল্লাহ তাআলা আপনাকে পবিত্র করেছেন; নেককার সঙ্গী পাওয়ার আশা রাখুন। সূরা আন-নূরের ২৬ নম্বর আয়াত তওবাকারীর ক্ষেত্রে বাধা নয়।


৬. আখিরাতে গুনাহ প্রকাশ ও হিসাব

মাসআলা: তওবা করার পর আল্লাহ তাআলা গুনাহ ক্ষমা করেন এবং তা গোপন রাখেন। কিয়ামতের দিন তওবাকারীর গুনাহ প্রকাশ হবে না।

দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

"যে ব্যক্তি তওবা করে, আল্লাহ তার গুনাহ ক্ষমা করেন এবং তা ভুলিয়ে দেন।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৫৩)

"আল্লাহ তাআলা মুমিনের গুনাহ গোপন করবেন এবং বলবেন: আমি তোমার গুনাহ ক্ষমা করেছি।" (সহিহ বুখারি: ২৪৪১; সহিহ মুসলিম: ২৭৬৮)

হানাফি কিতাব: ইমাম ইবনে আবিদিন «রাদ্দুল মুহতার» (২/৪৯৬)-এ বলেন, তওবা কবুল হলে গুনাহ মাফ হয় এবং কিয়ামতের দিন প্রকাশ পায় না। «মা'আরিফুল কুরআন» (সূরা আয-যুমার: ৫৩)-এ মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন, তওবাকারীর গুনাহ আল্লাহ গোপন করেন।

উপসংহার: তওবা করার পর গুনাহ প্রকাশের ভয় করবেন না; আল্লাহর ক্ষমা ও গোপন রাখার ওপর বিশ্বাস রাখুন।


৭. অতীতের স্মৃতি ভুলে যাওয়া

মাসআলা: স্মৃতি ফিরে আসা স্বাভাবিক; তবে শুধু স্মৃতি ফিরে আসার কারণে নতুন করে তওবা করা জরুরি নয়। আন্তরিক তওবার পর ওই বিষয়টি নিয়ে বারবার নিজেকে কষ্ট না দিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া উচিত।

দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

"প্রত্যেক আদম সন্তানই ভুল করে; আর উত্তম ভুলকারী হলো তারা, যারা তওবা করে।" (সুনানে তিরমিজি: ২৪৯৯)

হানাফি কিতাব: «ইমদাদুল ফাতাওয়া» (২/৩৮৬)-এ মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন, তওবার পর স্মৃতি ফিরে আসলে শয়তানের ওয়াসওয়াসা মনে করে উপেক্ষা করা উচিত; বারবার তওবা করা জরুরি নয়।

উপসংহার: স্মৃতি ফিরে আসা স্বাভাবিক; নতুন তওবা জরুরি নয়। সামনে এগিয়ে যান।


৮. বাস্তব করণীয়

আমল ও মানসিক পদক্ষেপ:

  1. সালাতুত তওবা: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

    "যে ব্যক্তি গুনাহ করে, তারপর ওযু করে নামাজ পড়ে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন।" (সুনানে আবু দাউদ: ১৫২০; সুনানে তিরমিজি: ৪০৬)

  2. ইস্তিগফার: প্রতিদিন ১০০ বার "أستغفر الله" পড়ুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

    "যে ব্যক্তি ইস্তিগফারকে আবশ্যক করে নেয়, আল্লাহ তার প্রতিটি দুশ্চিন্তার জন্য পথ বের করেন।" (সুনানে আবু দাউদ: ১৫১৮)

  3. দোয়া: "اللهم أنت ربي لا إله إلا أنت..." (সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার) পড়ুন।

  4. নেক আমল: নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা, দ্বীনি ইলম অর্জন।

  5. মানসিক পদক্ষেপ: ওয়াসওয়াসা উপেক্ষা করুন; আল্লাহর রহমতের ওপর আশা রাখুন; দ্বীনদার সঙ্গী ও বন্ধুদের সাথে সময় কাটান।

হানাফি কিতাব: «বেহেশতী জেওর» (১/৩২)-এ হাকিমুল উম্মত থানভী (রহ.) বলেন, ওয়াসওয়াসা উপেক্ষা করা ও নেক আমলে মনোযোগ দেওয়া উচিত। «ফাতাওয়া উসমানি» (২/৩৮৬)-এ মুফতি তাকী উসমানি (দা.বা.) বলেন, তওবার পর আল্লাহর রহমতের ওপর আশা রাখা ওয়াজিব।


সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. তওবার শর্ত | আপনার তওবা শুদ্ধ; তিনটি শর্ত পূর্ণ হয়েছে | | ২. বারবার তওবা | একবার আন্তরিক তওবাই যথেষ্ট; সাধারণ ইস্তিগফার চালিয়ে যান | | ৩. তওবা কবুলের আশা | আল্লাহর রহমতের ওপর আশা রাখা ওয়াজিব; নিরাশা হারাম | | ৪. ওয়াসওয়াসা | অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা শয়তানের প্ররোচনা; উপেক্ষা করুন | | ৫. নেককার সঙ্গী | তওবার পর আল্লাহ পবিত্র করেন; আশা রাখা যথার্থ | | ৬. আখিরাতে প্রকাশ | তওবাকারীর গুনাহ আল্লাহ গোপন করেন | | ৭. স্মৃতি ফিরে আসা | নতুন তওবা জরুরি নয়; সামনে এগিয়ে যান | | ৮. বাস্তব করণীয় | সালাতুত তওবা, ইস্তিগফার, দোয়া, নেক আমল |


দোয়া: আল্লাহ তাআলা আপনার তওবা কবুল করুন, অন্তরকে প্রশান্তি দান করুন এবং দ্বীনদার নেককার জীবনসঙ্গী দান করুন। আমিন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.