রাস্তা, পাবলিক জায়গা, ক্যাম্পাস বা বাসার সামনে থেকে না বলে গাছ নেওয়া যাবে কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
রাস্তা, পাবলিক জায়গা, ক্যাম্পাস বা কারো বাসার সামনে থেকে কি না বলে গাছ নেওয়া যাবে? আর নিলে কি ধরনের গুনাহ হবে? আর এই গুনাহ থেকে বাঁচার উপায় কি?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
** উত্তর:** না, অনুমতি ছাড়া কারো গাছ (ফল, ফুল, পাতা, ডাল, কাঠ—যা-ই হোক) নেওয়া জায়গা-নির্বিশেষে জায়েয নয়। রাস্তা, পাবলিক জায়গা, ক্যাম্পাস বা কারো বাসার সামনে থাকা গাছও যদি কারো মালিকানাধীন হয়, তবে তা নেওয়া হারাম ও গুনাহের কাজ। হ্যাঁ, যদি গাছটি সত্যিই কোনো মালিকবিহীন (যেমন বন-জঙ্গলের প্রাকৃতিক গাছ) হয় এবং তাতে কারো মালিকানা প্রমাণিত না হয়, তবে ভিন্ন কথা।
মূল নীতি: অন্যের সম্পদ অনুমতি ছাড়া নেওয়া হারাম
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা।" (সূরা নিসা: ২৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
لَا يَحِلُّ مَالُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ إِلَّا بِطِيبِ نَفْسٍ مِنْهُ
"কোনো মুসলিমের সম্পদ তার অন্তরের সন্তুষ্টি (অনুমতি) ছাড়া হালাল নয়।" (সুনানে দারাকুতনী, হাদিস ৩০৩৩; মুসনাদে আহমাদ)
হানাফি ফিকহের সিদ্ধান্ত: গাছ, তার ফল, ফুল, পাতা, ডাল, কাঠ—সবই মালিকের সম্পদ (مال)। অনুমতি ছাড়া তা নেওয়া غصب (জবরদখল) বা চুরির অন্তর্ভুক্ত। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন, অন্যের মালিকানাধীন গাছের ফল বা পাতা বিনা অনুমতিতে নেওয়া জায়েয নয়; এমনকি কেউ যদি ভাবে "মালিক হয়তো ক্ষতি করবে না", তবুও অনুমতি ব্যতীত নেওয়া বৈধ নয়। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল গাসব)
রাস্তা বা পাবলিক জায়গার গাছের বিধান
এখানে দুটি অবস্থা:
(ক) যদি গাছটি সরকার/পৌরসভা/প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন হয় (যেমন রাস্তার পাশে রোপণকৃত, ক্যাম্পাসে লাগানো গাছ)—তবে তা রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ। অনুমতি ছাড়া ফল/ফুল/ডাল নেওয়া হারাম। সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ করা আরও গুরুতর, কারণ এতে সাধারণ মানুষের হক জড়িত।
(খ) যদি গাছটি প্রকৃতিগতভাবে উৎপন্ন এবং কারো মালিকানায় না থাকে (যেমন বনের প্রাকৃতিক গাছ, যেখানে কেউ মালিকানা দাবি করে না)—তাহলে সাধারণভাবে তা নেওয়ার অনুমতি আছে; তবে যদি রাষ্ট্রীয় আইনে নিষেধ থাকে, তবে আইন মান্য করা আবশ্যক (কারণ মুসলিমকে চুক্তি ও আইন মানতে হয়)।
মনে রাখবেন: "রাস্তার পাশে" বা "বাসার সামনে" থাকা মানেই মালিকবিহীন নয়। বাসার সামনে লাগানো গাছ সাধারণত বাসার মালিকেরই; রাস্তার পাশের গাছ পৌরসভার। তাই সন্দেহ হলে অনুমতি নেওয়াই নিরাপদ।
এই গুনাহ থেকে বাঁচার উপায়
- আগে অনুমতি নিন: মালিক, বাসার লোক, ক্যাম্পাস কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জিজ্ঞেস করে অনুমতি নিয়ে নিন। অনুমতি থাকলে আর গুনাহ নেই।
- সন্দেহ হলে বিরত থাকুন: যে গাছের মালিকানা নিশ্চিত নন, তা না নেওয়াই তাকওয়ার পরিচায়ক।
- ভুল হয়ে গেলে ক্ষমা চাওয়া ও ক্ষতিপূরণ: যদি ইতিমধ্যে অনুমতি ছাড়া নিয়ে থাকেন, তবে মালিককে জানিয়ে ক্ষমা চান; সম্ভব হলে মূল্য পরিশোধ করুন বা সমমূল্যের কিছু ফেরত দিন। মালিক যদি খুঁজে না পান বা ক্ষমা না করেন, তবে আল্লাহর কাছে তাওবা করুন এবং সদকা করুন।
- তাওবা: ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, গাসবের তাওবা কবুল হয় না যতক্ষণ মালিকের হক ফিরিয়ে দেওয়া না হয় বা মালিক ক্ষমা না করেন। (রাদ্দুল মুহতার)
- নিজের প্রয়োজন হলে কিনে নিন বা চেয়ে নিন: ফল-ফুল দরকার হলে বাজার থেকে কিনুন বা মালিকের কাছে চেয়ে নিন—এতে বরকত ও সম্মান দুটোই রক্ষা পায়।
উপসংহার
রাস্তা, পাবলিক জায়গা, ক্যাম্পাস বা বাসার সামনের গাছ—যদি তা কারো মালিকানাধীন হয়, তবে না বলে নেওয়া জায়েয নয় এবং তা গুনাহ। অনুমতি নেওয়া বা কিনে নেওয়াই শরিয়তসম্মত পথ। আল্লাহ আমাদের হালাল-হারামের পার্থক্য বোঝার তাওফিক দিন। আমিন।