সুদি ব্যাংকের ঋণ, জরিমানা ও ঘুষ নিয়ে শরীয়তের বিধান— সুদি ঋণে মূলধন পরিশোধের নিয়ম, ঘুষের হুকুম এবং করণীয় সম্পর্কে জানতে চাই?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
জবাব
১. ব্যাংকের দাবি অনুযায়ী ৬৯ লাখ টাকা দিলে তা কি 'সুদ দেওয়া' হিসেবে গণ্য হবে এবং এতে গোনাহ হবে কি না?
-
শরয়ী মূলনীতি ও হিসাব:
ইসলামি শরীআতের অকাট্য নির্দেশ অনুযায়ী, ঋণগ্রহীতার ওপর কেবল মূল ঋণ (রূউসু আমওয়াল - Principal Amount) পরিশোধ করা ওয়াজিব। সুদের এক টাকা দেওয়া বা নেওয়াও হারাম।
আপনার বাবা মূল ঋণ নিয়েছিলেন ৬৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে আপনারা ইতোমধ্যেই ৩১ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন। অতএব, শরীআতের বিচারে আপনার বাবার মূল ঋণ বাকি থাকে: (৬৫ - ৩১) = ৩৪ লাখ টাকা। ব্যাংক যে অতিরিক্ত ৩৫ লাখ টাকা (মোট ৬৯ লাখের মধ্যে) দাবি করছে, তা মূল ঋণের অংশ নয়; বরং তা ব্যাংকের আরোপিত সুদ ও জরিমানা। -
শরয়ী হুকুম (গোনাহের বিষয়):
স্বচ্ছায় বা সাধারণ অবস্থায় সুদের টাকা দেওয়া অকাট্য হারাম। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি বা ওয়ারিশ প্রচলিত আইনি ব্যবস্থার কারণে চরম বাধ্যবাধকতার (জরুরত ও মাজবুরী) সম্মুখীন হন—যেমন: একমাত্র মাথা গোঁজার বাসস্থান নিলামে উঠে পরিবার গৃহহীন হওয়ার আশঙ্কা বা আইনি মামলার তীব্র চাপ—তখন বাধ্য হয়ে নিজের সম্পত্তি ও পিতাকে দায়মুক্ত করার তাগিয়ে সুদের অতিরিক্ত টাকা পরিশোধ করলে এর গোনাহ ও দায় সম্পূর্ণ সুদী ব্যাংকের ওপর বর্তাবে; বাধ্য হয়ে দেওয়া ওয়ারিশরা ইনশাআল্লাহ গোনাহগার হবেন না।
২. ব্যাংক কর্মকর্তাদের ঘুষ/উপঢৌকন দিয়ে এই ৬৯ লাখ থেকে টাকা কমানোর ব্যবস্থা করা জায়েয হবে কি না?
-
শরয়ী ফায়সালা:
অন্যের হক নষ্ট করার জন্য বা অন্যায় সুবিধা পাওয়ার জন্য ঘুষ দেওয়া-নেওয়া শরীআতে অকাট্য হারাম। কিন্তু নিজের ওপর আরোপিত অন্যায্য দাবি, জুলুম বা আর্থিক ক্ষতি (যেমন: সুদের অন্যায্য টাকা বা জরিমানা) থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য এবং নিজের সম্পদ বাঁচানোর জন্য বাধ্য হয়ে ঘুষ/উপঢৌকন দেওয়া ফিকহে হানাফীর দৃষ্টিতে বিশেষ অবস্থায় জায়েয। -
ফিকহী কারণ ও প্রামাণ্য ইবারত:
ফিকহে হানাফীর প্রখ্যাত কিতাব আল-আশবাহ ওয়ান নাজায়ের এবং দরসুল ফিকহ-এ শরীআতের নীতি উল্লেখ রয়েছে:«الرِّشْوَةُ لِخَوْفٍ عَلَى مَالِهِ»
"নিজের সম্পদ বা জান-মালকে অন্যায্য ক্ষতি ও জুলুম থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে বাধ্য হয়ে ঘুষ বা অর্থ প্রদান করা জায়েয।" [দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৩১৫, ১০২ নম্বর ইবারত]।ব্যাংক যে মূল ৩৪ লাখের অতিরিক্ত ৩৫ লাখ টাকা সুদ ও জরিমানা হিসেবে চাচ্ছে, তা শরীআতের দৃষ্টিতে একটি অন্যায্য চাপ ও জুলুম। তাই ব্যাংক কর্মকর্তাদের উপঢৌকন বা কমিশন দিয়ে যদি আপনারা এই সুদী বোঝার পরিমাণ কমানোর ব্যবস্থা করতে পারেন (যাতে মোট প্রদেয় অংকটি মূল ঋণের কাছাকাছি নামিয়ে আনা যায়), তবে:
১. অন্যায় ক্ষতি থেকে বাঁচতে বাধ্য হওয়ার কারণে আপনাদের এতে কোনো গোনাহ হবে না।
২. যে ব্যাংক কর্মকর্তা ঘুষ বা উপঢৌকন গ্রহণ করবে, সে অকাট্য হারাম কাজ ও কবিরা গুনাহে লিপ্ত হবে।
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই উপঢৌকন বা কমিশন কেবল ব্যাংকের অন্যায্য সুদ/জরিমানা কমানোর উদ্দেশ্যে হতে হবে; ব্যাংক থেকে নেওয়া মূল টাকা মেরে দেওয়ার নিয়তে করা যাবে না)।
৩. আপনাদের এখন কোন পথে এগোনো উচিত?
১. ১ম পদক্ষেপ (অফিসিয়াল আপোষ ও বোর্ড আবেদন):
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ (Board of Directors), ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD) বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাস্টমার স্বার্থ সংরক্ষণ বিভাগে মৃত ব্যক্তির পরিবার হিসেবে মানবিক কারণ ও দীর্ঘদিনের লেনদেন বিবেচনা করে সুদের টাকা পূর্ণ মওকুফ করে মূল ৩৪ লাখ টাকা ধরে এককালীন অবসায়ন (One Time Settlement - OTS)-এর জন্য দরখাস্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়ার চেষ্টা করুন।
২. ২য় পদক্ষেপ (অনফিসিয়াল আলোচনা/উপঢৌকন যদি বাধ্য হন):
যদি দাপ্তরিকভাবে কোনো কাজ না হয় এবং বাড়ি নিলাম হওয়ার চূড়ান্ত সময় ঘনিয়ে আসে, তবে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে অন্যায্য সুদের অংশ কমিয়ে আনার সুযোগ থাকলে (উপঢৌকন/কমিশন দিয়ে হলেও) তা ব্যবহার করে মোট পাওনা যতদূর সম্ভব কমাকরে লিখিত আপোষনামা (Solhenama) করুন।
৩. ৩য় পদক্ষেপ (সর্বশেষ উপায় হিসেবে ৬৯ লাখ প্রদান):
যদি কোনোভাবেই টাকা কমানো না যায় এবং বাড়ি নিলাম হয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট উপক্রম হয়, তবে বাধ্য হয়ে ৬৯ লাখ টাকা পরিশোধ করেই বাড়িটি রক্ষা করুন এবং আপনার মৃত বাবাকে ঋণের যাঁতা থেকে উদ্ধার করুন।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৩১৫–৩১৬: (অধ্যায়: লেনদেনের মূলনীতি — "الرشوة لخوف على ماله" মূলনীতি অনুযায়ী নিজের সম্পদ বা স্বত্ব রক্ষার্থে এবং অন্যায্য জুলুম/ক্ষতি থেকে বাঁচতে বাধ্য হয়ে ঘুষ প্রদান করার শরয়ী অবকাশ সংক্রান্ত আল-আশবাহ ওয়ান নাজায়েরের ইবারত)।
- পৃষ্ঠা: ১৮৭–১৮৯: (অধ্যায়: হারাম অর্থ-সম্পদ — সুদী ঋণের ক্ষেত্রে কেবল মূলধন পাওয়ার অধিকার থাকা এবং অতিরিক্ত টাকা অন্যায্য হওয়া সংক্রান্ত শরয়ী বিশ্লেষণ)।
২. দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৮৭–১৮৮ & ১৯৪: (অধ্যায়: ঋণের উপর আরোপিত সুদ প্রসঙ্গ — কুরআনের আয়াত "وَإِن تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُءُوسُ أَمْوَالِكُمْ" এর আলোকে মূলধন ব্যতীত অতিরিক্ত সুদ বাতিল হওয়া এবং বাধ্যবাধকতার ফায়সালা)।
৩. কাওয়াইদুল ফিক্বহ:
- পৃষ্ঠা: ৬৮: (কায়েদা নং ১৭০: "الضرورات تبيح المحظورات" — বিশেষ বাধ্যবাধকতার সময় নিষিদ্ধ বিষয়ও বিশেষ বিবেচনায় জায়েয হওয়া সংক্রান্ত ফিকহী কায়েদা)।
৪. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া:
- ১৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৩২–১৩৩: (অধ্যায়: বাবুত তা'যীর — অন্যায্য জরিমানা ও আর্থিক চাপ থেকে বাঁচতে গৃহীত পদক্ষেপের ফিকহী বিধান)।
- ২০শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২৩–১২৫: (অধ্যায়: কিতাবুল ফ্রাইজ, মেয়তের করজ — মৃত ব্যক্তির ঋণ ওয়ারিশদের ত্যাজ্য সম্পত্তি থেকে বা বাধ্য হয়ে আদায়ের শরয়ী ফায়সালা)।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।