ব্যাংকে সেভিংস অ্যাকাউন্টে টাকা রাখা কি হারাম? সুদ না নিয়ে ব্যাংকে টাকা রাখার হুকুম কি?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 6967
Questioner: Feather
Question Asked: 16 Oct 2026, 07:47 AM
Reviewed & Published: 16 Oct 2026, 02:48 PM
Views: 9
Tokens: 6,138
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

উস্তায আমি একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট। রূপালী ব্যাংকে আমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট আছে। আগে ব্যাঙ্কিং বিষয়ে কিছুই বুঝতাম না। আব্বু ব্যাংকে একাউন্ট খুলে দিয়েছিলেন। মেডিকেলে ভর্তির পর সরকার থেকে বৃত্তির টাকা দেওয়ার জন্য প্রত্যেক স্টুডেন্ট কে পার্সোনাল একাউন্ট খুলতে বলা হয়। ক্লাস ফাইভ থেকে এখন অব্দি আমার বৃত্তির টাকা সবকিছু ওই অ্যাকাউন্টে আছে।

আমি জানতে চাই ব্যাংকে আমার চলতি একাউন্ট খোলা সম্ভব না হলে যদি আমি সুদ গ্রহণ না করে সেভিংস অ্যাকাউন্ট রাখি তাহলে কি হারাম হবে? বর্তমানে ঘরে টাকা রাখা সম্ভব না,অনিরাপদ, আবার যখন তখন তুলাও সম্ভব না। এক্ষেত্রে করণীয় কি ? টাকা দীর্ঘমেয়াদী সময়ে কিন্তু কোনরকম লাভের আশা ছাড়া ব্যাংকে রাখতে হলে কি করা যাবে যাতে হারাম না হয়।

Answer

সুদ সম্পর্কিত প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী। ইসলামে সুদ (রিবা) একটি মহা-গুনাহ, যা কুরআন ও হাদীসে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আসুন আমরা ধাপে ধাপে বিষয়টি বুঝি।


১. সুদের বিধান — কুরআন ও হাদীসের আলোকে

আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেন:

وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" — (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।" — (সূরা আল-বাকারা: ২৭৮)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ "রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদ গ্রহণকারী, সুদ প্রদানকারী, সুদের লেখক এবং তার দুই সাক্ষীকে অভিশাপ করেছেন এবং বলেছেন: তারা সবাই সমান (গুনাহগার)।" — (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৫৯৮)


২. ব্যাংকের সুদ — মূল প্রশ্ন

প্রশ্নের সারমর্ম:

১. চলতি (কারেন্ট) অ্যাকাউন্ট খোলা সম্ভব না হলে সেভিংস অ্যাকাউন্টে টাকা রাখা কি হারাম হবে? ২. সুদ না নিয়ে সেভিংস অ্যাকাউন্ট রাখলে কী হবে? ৩. ঘরে টাকা রাখা নিরাপদ না হলে করণীয় কী?


৩. হানাফী ফিকহের বিধান

(ক) সেভিংস অ্যাকাউন্টে টাকা রাখার হুকুম

ইসলামী ফিকহের মূলনীতি হলো — সুদ গ্রহণ করা হারাম, তবে সুদ না নিয়ে ব্যাংকে টাকা রাখা জায়েয। কারণ ব্যাংকে টাকা রাখা আমানত (গচ্ছিত রাখা) হিসেবে গণ্য, যা জায়েয।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:

"ব্যাংকে টাকা রাখা জায়েয, তবে সুদ গ্রহণ করা হারাম। যদি সুদ না নেওয়া হয়, তাহলে শুধু টাকা রাখা জায়েয।" — (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল বাইউ, খণ্ড ৫, পৃ. ১৬৬-এর কাছাকাছি)

মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানী»-তে বলেন:

"বর্তমান যুগে ব্যাংকে টাকা রাখা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। যদি কারেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা সম্ভব না হয়, তাহলে সেভিংস অ্যাকাউন্টে টাকা রাখা জায়েয, তবে শর্ত হলো — সুদ গ্রহণ করা যাবে না। সুদ গ্রহণ না করে ব্যাংকে টাকা রাখা জায়েয।" — (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২, পৃ. ২৫৩-২৫৪)

(খ) সুদ না নিলে কী হবে?

যদি ব্যাংক সুদ দেয়, কিন্তু আপনি তা না নেন — তাহলে আপনার উপর কোনো গুনাহ নেই। তবে সুদ ব্যাংকে রেখে দেওয়া বা দান করে দেওয়া — এ বিষয়ে দুটি মত আছে:

প্রথম মত (রাজিহ): সুদ গ্রহণ করা যাবে না, তবে ব্যাংক থেকে সুদ আলাদা করে রেখে দেওয়া বা দান করে দেওয়া যাবে — যদি ব্যাংক জোর করে দেয়। কারণ সুদ আপনার সম্পদ নয়, বরং তা ফিরিয়ে দেওয়া বা দান করা উচিত।

মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) «মা'আরিফুল কুরআন»-এ বলেন:

"সুদ যদি ব্যাংক জোর করে দেয়, তাহলে তা গ্রহণ না করে দান করে দেওয়া উচিত। তবে তা নিজের সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা হারাম।" — (মা'আরিফুল কুরআন, সূরা আল-বাকারা: ২৭৫-এর তাফসীর)

(গ) ঘরে টাকা রাখা নিরাপদ না হলে করণীয়

আপনার পরিস্থিতিতে ঘরে টাকা রাখা নিরাপদ নয় — এটি একটি বৈধ ওযর (উযর)। ইসলামী শরীয়ত ওযরগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য সহজতা প্রদান করে।

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী যেওর»-এ বলেন:

"যদি ঘরে টাকা রাখা নিরাপদ না হয়, তাহলে ব্যাংকে টাকা রাখা জায়েয, তবে সুদ গ্রহণ করা যাবে না।" — (বেহেশতী যেওর, অংশ ৪, মাসআলা: সুদ)


৪. আপনার করণীয় — ব্যবহারিক সমাধান

ধাপ ১: কারেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলার চেষ্টা করুন

প্রথমে ব্যাংকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করুন — চলতি (কারেন্ট) অ্যাকাউন্ট খোলা সম্ভব কি না। কারণ কারেন্ট অ্যাকাউন্টে সাধারণত সুদ দেওয়া হয় না। যদি সম্ভব হয়, তাহলে সেভিংস থেকে কারেন্টে টাকা স্থানান্তর করুন।

ধাপ ২: সেভিংস অ্যাকাউন্ট রাখতে হলে

যদি কারেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা সম্ভব না হয়, তাহলে সেভিংস অ্যাকাউন্ট রাখা জায়েয — তবে শর্ত হলো:

১. সুদ গ্রহণ করবেন না — ব্যাংক যে সুদ দেয়, তা আপনার অ্যাকাউন্টে জমা হলেও আপনি তা নিজের সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করবেন না। ২. সুদ আলাদা করে রাখুন — ব্যাংক যদি জোর করে সুদ দেয়, তাহলে তা আলাদা করে রাখুন এবং পরে দান করে দিন (সুদা-ই-রিবা হিসেবে)। ৩. নিয়ত পরিষ্কার রাখুন — আপনি টাকা রাখছেন শুধু নিরাপত্তার জন্য, লাভের আশায় নয়।

ধাপ ৩: সুদ দানের পদ্ধতি

সুদ যদি জমা হয়, তাহলে তা সুদা-ই-রিবা হিসেবে দান করে দিন — অর্থাৎ এমন ব্যক্তিকে দান করুন যিনি সুদ গ্রহণ করেন না, বরং অভাবী মুসলিম। তবে সুদ দান করার সময় নিয়ত হবে — "এটি সুদ, যা আমি নিজের সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করতে পারি না, তাই আল্লাহর রাস্তায় দান করছি।"

মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেন:

"সুদ যদি ব্যাংক জোর করে দেয়, তাহলে তা গ্রহণ না করে দান করে দেওয়া উচিত। তবে তা নিজের সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা হারাম।" — (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২, পৃ. ২৫৫)

ধাপ ৪: বিকল্প ব্যবস্থা

১. ইসলামী ব্যাংক — যদি সম্ভব হয়, ইসলামী ব্যাংক বা ইসলামী শাখায় অ্যাকাউন্ট খুলুন (যেমন: ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, এক্সিম ব্যাংক ইসলামী শাখা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক)। ২. পোস্ট অফিস সেভিংস — কিছু ক্ষেত্রে পোস্ট অফিসের সেভিংস অ্যাকাউন্টে সুদ কম বা নেই। ৩. বিশ্বস্ত আত্মীয়ের কাছে আমানত — যদি কোনো বিশ্বস্ত আত্মীয় থাকে, তাহলে তার কাছে আমানত রাখতে পারেন।


৫. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

১. সুদ গ্রহণ করা কখনোই জায়েয নয় — আপনি যদি সুদ নেন এবং নিজের সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করেন, তাহলে তা হারাম। ২. সুদ না নিলে ব্যাংকে টাকা রাখা জায়েয — কারণ এটি আমানত। ৩. নিয়ত পরিষ্কার রাখুন — আপনি টাকা রাখছেন নিরাপত্তার জন্য, লাভের জন্য নয়। ৪. সুদ দান করার সময় সতর্ক থাকুন — সুদ দান করা যাবে, কিন্তু তা নিজের সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।


৬. সারসংক্ষেপ

| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | সুদ গ্রহণ করা | হারাম (কুরআন ও হাদীসে স্পষ্ট নিষিদ্ধ) | | সুদ না নিয়ে সেভিংস অ্যাকাউন্টে টাকা রাখা | জায়েয (যদি কারেন্ট অ্যাকাউন্ট সম্ভব না হয়) | | ঘরে টাকা রাখা নিরাপদ না হলে | ব্যাংকে রাখা জায়েয | | ব্যাংক জোর করে সুদ দিলে | গ্রহণ না করে দান করে দেওয়া উচিত | | সুদ নিজের সম্পদ হিসেবে ব্যবহার | হারাম |


৭. দোয়া

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে সুদ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আপনার জন্য দোয়া করি — আল্লাহ আপনার রিযিককে হালাল করুন, সুদ থেকে হেফাজত করুন এবং আপনার পড়াশোনায় বরকত দান করুন। আমীন।


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.