বি.এসসি. নার্সিং ইন্টার্নশিপে সহকর্মীদের চাপে ওয়ার্ডে না যাওয়া কি জায়েয?
Halal and Haram · Ahle Hadith / Salafi
Question
বি.এসসি. নার্সিং কোর্স এর ক্ষেত্রে উক্ত কোর্স শেষে বিভাগীয় হসপিটালে ইন্টার্ণশীপ চলমান থাকে কিছু মাস ।এক্ষেত্রে কোর্স এর অন্তর্ভুক্ত সকলকে কয়েকটি গ্রুপে ভাগ করে দেওয়া হয় বিভিন্ন ওয়ার্ডের জন্য । ইন্টার্ণশীপের জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডে নির্দিষ্ট দিনগুলোতে দায়িত্ব পালনের পর সকলকে দেওয়া লগবুকে উক্ত ওয়ার্ড থেকে সাইন নিতে হয়( লগবুকে নির্ধারিত ওয়ার্ড ছাড়াও অন্য ওয়ার্ডে গ্রুপের সদস্যদের পাঠানো হয়) । উল্লেখ্য, ইন্টার্ণশীপের জন্য স্টাইপেন্ড প্রদান করা হয় এবং প্রতিদিন ওয়ার্ডে যাওয়ার পূর্বে অফিসে প্রত্যেকের উপস্থিতি নিশ্চিত করে যেতে হয়।এখন আমার প্রশ্ন, যদি গ্রুপের অধিকাংশ সদস্য যে ওয়ার্ড থেকে সাইনের প্রয়োজন হয় না সে ওয়ার্ডে যেতে না চায় এবং একজন সদস্য যখন চাচ্ছে সবগুলো ওয়ার্ডেই যেতে ( কারণ স্টাইপেন্ড এর বিষয় আছে, মূল অফিসে সাইন করতে হয় ) তখন তাকে বাকি সদস্যরা খুব চাপ দিচ্ছে যেনো সে না যায় কারণ একজন/ দুইজন সদস্য গেলে বাকিরাও সবার নজরে এসে যাবে । এখন সে যদি চায় সবার কথায় ওয়ার্ডে অনুপস্থিত থেকে মূল অফিসে সাইন করবে না সেটাও কঠিন কারণ এর প্রভাব একা তার উপরই পরবে। এক্ষেত্রে করণীয় কি হবে? উল্লেখ্য,উক্ত সদস্য এখনো তার সিদ্ধান্তেই স্থির আছে যে সে সব ওয়ার্ডেই যাবে সাইন এর প্রয়োজন হোক বা না হোক। হসপিটালে যেহেতু মাহরাম নন-মাহরাম মেইন্টেইন করা কঠিন, এমন অবস্থায় উক্ত সদস্যের সিদ্ধান্ত কি ভুল নাকি সবার কথা মেনে নিয়ে পর্দার পরিবেশ এবং মাহরাম নন- মাহরাম মেইন্টেইনিংয়ের দিকে ফোকাস করা উচিত? ( মূল অফিসে সাইন থাকা বাধ্যতামূলক) । আফওয়ান কথাগুলো হয়তো একটু জটিল হয়ে গিয়েছে।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর
উক্ত সদস্যের সিদ্ধান্ত (সব ওয়ার্ডে গিয়ে সাইন করা) দ্বীনি দৃষ্টিতে ভুল নয়; বরং তা তার দায়িত্ব পালনের স্বাভাবিক অধিকার। তবে যেহেতু হাসপাতালের পরিবেশে মাহরাম-নন-মাহরাম মেইনটেইন করা কঠিন, তাই শরীয়তের দৃষ্টিতে অগ্রাধিকার হলো পর্দা ও খালওয়া (নির্জনতা) এড়ানো—এবং এ লক্ষ্যে সে যতটা সম্ভব সতর্কতা অবলম্বন করবে, কিন্তু অন্যায় চাপের কাছে নতি স্বীকার করে নিজের হক ও দায়িত্ব ত্যাগ করা তার উপর ওয়াজিব নয়।
বিস্তারিত আলোচনা
১. নিজের দায়িত্ব ও হক আদায় করা জায়েয
ইন্টার্নশিপের শর্তাবলি অনুযায়ী নির্ধারিত ওয়ার্ডে উপস্থিত থাকা, লগবুকে সাইন নেওয়া এবং মূল অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিত করা—এসব তার চাকরিগত/প্রশিক্ষণগত দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালন করা তার জন্য শরীয়তের গন্ডির মধ্যে থেকে জায়েয, বরং কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মানা আবশ্যক (যতক্ষণ তা শরীয়তবিরোধী না হয়)।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ ۖ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا "আর তোমরা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো; নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।" — [সূরা আল-ইসরা: ৩৪]
নবী ﷺ বলেন:
الْمُسْلِمُونَ عَلَى شُرُوطِهِمْ "মুসলিমরা তাদের শর্তাবলির উপর প্রতিষ্ঠিত।" — [সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৯৪, তিরমিযী: ১৩৫২; শাইখ আল-আলবানী সহীহ বলেছেন]
সুতরাং ইন্টার্নশিপের শর্ত অনুযায়ী সব ওয়ার্ডে যাওয়া ও সাইন করা তার হক; অন্যরা তাকে এ থেকে বিরত রাখার জন্য চাপ দিতে পারে না।
২. অন্যায় চাপের কাছে নতি স্বীকার করা জায়েয নয়
সহকর্মীরা যদি বলে—"তুমি না গেলে আমরা সবার নজরে পড়ে যাব"—এটি নিছক দুনিয়াবি স্বার্থরক্ষার কারণ, কোনো শরয়ী কারণ নয়। কারো বৈধ হক ও দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া জুলুমের অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "আর তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।" — [সূরা আল-মায়িদা: ২]
নবী ﷺ বলেন:
انْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُومًا "তোমার ভাইকে সাহায্য করো, সে জালিম হোক বা মাজলুম হোক।" — [সহীহ বুখারী: ২৪৪৪]
অর্থাৎ জালিমকে সাহায্য করা হলো তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখা, আর মাজলুমকে সাহায্য করা হলো তার পাশে দাঁড়ানো। এখানে চাপ প্রয়োগকারীরা জালিমের অবস্থানে, আর একা সদস্যটি মাজলুমের অবস্থানে।
৩. পর্দা ও খালওয়া: প্রকৃত অগ্রাধিকার
এখানে মূল দ্বীনি প্রশ্ন হলো—হাসপাতালের পরিবেশে পর্দা ও মাহরাম-নন-মাহরাম মেইনটেইন করা। এটি একটি বাস্তব সমস্যা, যা শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়্যিম ও সমসাময়িক উলামায়ে কেরাম (ইবন বায, ইবন উসাইমীন, আল-ফাওযান) সবাই গুরুত্বের সাথে আলোচনা করেছেন।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ ۚ ذَٰلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ "আর যখন তোমরা তাদের কাছে কোনো কিছু চাইবে, পর্দার আড়াল থেকে চাইবে; এটা তোমাদের অন্তর ও তাদের অন্তরের জন্য অধিক পবিত্র।" — [সূরা আল-আহযাব: ৫৩]
নবী ﷺ বলেন:
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ "কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে মিলিত হবে না, তবে শয়তান তাদের তৃতীয় হবে।" — [সুনানে তিরমিযী: ২১৬৫; শাইখ আল-আলবানী সহীহ বলেছেন]
ইবনুল কাইয়্যিম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "খালওয়া (নির্জনতা) হারাম হওয়ার কারণ হলো—তা ফিতনার দরজা খুলে দেয়।" [যাদুল মা'আদ]
শাইখ ইবন উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "নার্সিং বা চিকিৎসার প্রয়োজনে নারীর সাথে পুরুষের মেলামেশা জায়েয, তবে শর্ত হলো—প্রয়োজন পরিমাণ, পর্দা রক্ষা, খালওয়া এড়ানো এবং ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকা।" [ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব]
৪. তাহলে করণীয় কী?
উক্ত সদসীর জন্য করণীয়:
-
নিজের দায়িত্ব ও হক আদায় করবে—সব ওয়ার্ডে যাবে, সাইন নেবে, মূল অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিত করবে। এতে কোনো গুনাহ নেই; বরং এটি তার অধিকার।
-
অন্যায় চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না—কারণ এটি অন্যের জুলুমের সহযোগিতা এবং নিজের হক ত্যাগ। তবে বিনয় ও হিকমতের সাথে তাদের বুঝাবে যে এটি তার দায়িত্ব ও হক।
-
পর্দা ও খালওয়া এড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে—যতটা সম্ভব:
- নন-মাহরামের সাথে একান্তে (খালওয়া) না থাকা
- প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা না বলা
- দৃষ্টি সংযত রাখা
- সম্ভব হলে মাহরাম বা অন্য কোনো নারীর সাথে থাকা
- প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া
-
যদি কোনো নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে গিয়ে পর্দা রক্ষা করা একেবারেই অসম্ভব হয় (যেমন: একান্তে নন-মাহরামের সাথে কাজ করতে হয়), তাহলে সে ওয়ার্ডে যাওয়া থেকে বিরত থাকা তার জন্য অগ্রাধিকার—এক্ষেত্রে সে কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা চাইবে। কিন্তু সব ওয়ার্ডে যাওয়া যদি পর্দার পরিপন্থী না হয়, তাহলে যাওয়া তার হক।
-
অন্য সদস্যদের প্রতি সদাচরণ করবে—তাদের সাথে ঝগড়া বা শত্রুতা নয়; বরং বিনয়ের সাথে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করবে।
শাইখ ইবন বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "মুসলিম নারী-পুরুষের মেলামেশায় শর্ত হলো—প্রয়োজন পরিমাণ, পর্দা রক্ষা, খালওয়া এড়ানো এবং উভয়ের অন্তর পরিষ্কার থাকা। যদি এ শর্তগুলো রক্ষা করা যায়, তাহলে তা জায়েয; অন্যথায় নয়।" [মাজমুউ ফাতাওয়া ইবন বায]
والله أعلم بالصواب