আসরের নামাজের পর পায়জামায় স্রাবের দাগ চেক করা হয়নি, পরে ১ দিরহামের বেশি সাদা দাগ পাওয়া গেলে নামাজ পুনরায় পড়তে হবে কি?

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 6911
Questioner: guraba
Question Asked: 14 Oct 2026, 09:47 PM
Reviewed & Published: 15 Oct 2026, 02:36 AM
Views: 20
Tokens: 5,782
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসরের নামাজ পড়ার পর পায়জামাতে স্রাবের কোনো দাগ লেগেছে কিনা কোনো রকমে চেক করেছিলাম। তখন কোনো দাগ দেখি নাই। তাই মাগরিবের নামাজ শুরুর আগে পায়জামায় কোনো দাগ ছিল কিনা চেক করা হয়নি। মাগরিব ও এশার নামাজ একই অজুতে শেষ করে ভালো করে চেক করে দেখি পায়জামাতে ১ দিরহামের বেশি অংশ জুড়ে সাদা কি লেগে আছে। সাদা স্রাব কিনা বুঝতেছি না। কারণ নামাজ আদায় করার পর লজ্জাস্থান চেক করা সময় বুঝতে পারি যে লজ্জাস্থান সম্পূর্ণ শুকনো। আবার আসরের সময় স্রাব লেগেছে কি না তাও বুঝতেছি না। এখন কি স্বলাত গুলো পূনরায় আদায় করতে হবে? এমতাবস্থায় কি করনীয়?
আর এই পায়জামা পরে কি পরবর্তী স্বলাত আদায় করা যাবে?

Answer

প্রশ্ন: আসরের নামাজের পর পায়জামায় স্রাবের দাগ চেক করা হয়নি, মাগরিব ও এশার পর দেখা গেল ১ দিরহামের বেশি সাদা দাগ — নামাজ পুনরায় আদায় করতে হবে কি?

সংক্ষিপ্ত উত্তর

আপনার পূর্বের নামাজগুলো (আসর, মাগরিব, এশা) পুনরায় আদায় করা আপনার উপর আবশ্যক নয় — কারণ আপনি নিশ্চিত নন যে নামাজের সময়ই নাপাকি লেগেছিল। ইসলামের মূলনীতি হলো: "নিশ্চয়তা সন্দেহ দ্বারা বাতিল হয় না" (الیقین لا یزول بالشک)। যেহেতু আপনি আসরের পর চেক করে দাগ দেখেননি এবং নামাজের পর লজ্জাস্থান শুকনো পেয়েছেন, তাই নামাজের সময় নাপাকি ছিল — এটা নিশ্চিত নয়। সন্দেহের ভিত্তিতে নামাজ পুনরায় পড়া ওয়াজিব হয় না।

তবে সতর্কতামূলক (এহতিয়াত) হিসেবে পুনরায় পড়ে নিলে সওয়াব হবে, কিন্তু আবশ্যক নয়।

উক্ত পায়জামা ধুয়ে/পরিবর্তন করে পরবর্তী নামাজ আদায় করবেন — কারণ এখন আপনি নিশ্চিত যে পায়জামায় নাপাকি আছে।


বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা

১. মূলনীতি: اليقين لا يزول بالشك (নিশ্চয়তা সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না)

ফিকহের একটি সর্বজনস্বীকৃত কায়েদা:

«اليَقِينُ لاَ يَزُولُ بِالشَّكِّ» "নিশ্চয়তা সন্দেহ দ্বারা বিলুপ্ত হয় না।"

(মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ, অনুচ্ছেদ ৪; শারহুল কাওয়াইদিল ফিকহিয়্যাহ)

আপনার ক্ষেত্রে:

  • নিশ্চিত বিষয়: আপনি আসরের পর চেক করে দাগ পাননি; নামাজের পর লজ্জাস্থান শুকনো পেয়েছেন।
  • সন্দেহ: আসরের সময় স্রাব লেগেছিল কি না — এটা আপনি জানেন না।

সুতরাং নিশ্চিত পবিত্রতার উপর সন্দেহ প্রাধান্য পাবে না। তাই আসরের নামাজ সহীহ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে।

২. হাদিস: সন্দেহের ভিত্তিতে আমল বাতিল নয়

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«إِذَا شَكَّ أَحَدُكُمْ فِي صَلَاتِهِ فَلَمْ يَدْرِ كَمْ صَلَّى...» "যখন তোমাদের কেউ নামাজে সন্দেহ করে এবং জানতে পারে না কত রাকাত পড়েছে..."

(সহীহ বুখারী, হাদিস ৪০১; সহীহ মুসলিম, হাদিস ৫৭২)

এখানে নবী ﷺ সন্দেহের ক্ষেত্রে নিশ্চিত (কম) সংখ্যার উপর ভিত্তি করে নামাজ সম্পূর্ণ করার নির্দেশ দিয়েছেন — অর্থাৎ সন্দেহ দ্বারা সম্পূর্ণ নামাজ বাতিল হয় না।

৩. নাপাকির বিধান: ১ দিরহাম পরিমাণ

হানাফি মাযহাবে নাপাকির পরিমাণের বিধান:

| পরিমাণ | বিধান | |---|---| | ১ দিরহামের কম | নামাজ সহীহ, তবে মাকরূহ তাহরিমি (কিছু আলেমের মতে) | | ১ দিরহাম বা বেশি | নামাজ বাতিল — পুনরায় পড়তে হবে |

১ দিরহামের পরিমাণ: হানাফি মাযহাবে ১ দিরহাম = প্রায় ৩.৩ গ্রাম (কিছু মতে ২.৯৭ গ্রাম)। আধুনিক হিসাবে প্রায় একটি ১ টাকার কয়েনের সমান বা তার চেয়ে সামান্য বড় গোলাকার অংশ।

«وَالْقَدْرُ الْمُعْتَبَرُ فِي النَّجَاسَةِ الْمُغَلَّظَةِ دِرْهَمٌ...» "নাপাকি মুগাল্লাজায় বিবেচ্য পরিমাণ হলো এক দিরহাম..."

(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩০০-৩০১; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪২)

কিন্তু এখানে মূল প্রশ্ন: নাপাকি কখন লেগেছে? যদি নামাজের পরে লেগে থাকে, তাহলে নামাজ বাতিল হবে না। আর যদি নামাজের সময় লেগে থাকে, তাহলে বাতিল হবে।

৪. আপনার ক্ষেত্রে প্রয়োগ

আপনি বলেছেন:

  1. আসরের পর চেক করে দাগ পাননি।
  2. মাগরিব ও এশার পর চেক করে ১ দিরহামের বেশি দাগ পেয়েছেন।
  3. নামাজের পর লজ্জাস্থান সম্পূর্ণ শুকনো পেয়েছেন।

এখানে দুটি সম্ভাবনা:

  • (ক) আসরের পর দাগ ছিল না, মাগরিব বা এশার সময় বা পরে লেগেছে → আসর সহীহ, মাগরিব/এশা সন্দেহযুক্ত।
  • (খ) আসরের সময়ই লেগেছিল কিন্তু আপনি দেখতে পাননি → সবই বাতিল।

যেহেতু আপনি নিশ্চিতভাবে জানেন না, তাই (ক) ধরে নেওয়া হবে — অর্থাৎ নামাজগুলো সহীহ। কারণ:

«الْأَصْلُ بَقَاءُ مَا كَانَ عَلَى مَا كَانَ» "মূলনীতি হলো: যা ছিল তা原有的 অবস্থায় থাকবে।"

(শারহুল কাওয়াইদিল ফিকহিয়্যাহ; আল-আশবাহ ওয়ান নাযাইর, ইবনে নুজাইম)

৫. ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.)-এর বক্তব্য

«لَوْ شَكَّ فِي إِصَابَةِ النَّجَاسَةِ لَمْ يَضُرَّهُ» "যদি নাপাকি লাগার ব্যাপারে সন্দেহ হয়, তবে তা ক্ষতি করবে না।"

(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩০১)

৬. ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখিত

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:

"নাপাকি লাগার ব্যাপারে সন্দেহ থাকলে নামাজ পুনরায় পড়া ওয়াজিব নয়; কারণ পবিত্রতা মূল অবস্থা (আসল), আর নাপাকি হলো আরোপিত (আরিজি)। সন্দেহ দ্বারা মূল অবস্থা পরিবর্তিত হয় না।"

(ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৩০-১৩২)


করণীয় (আমলি নির্দেশনা)

১. পূর্বের নামাজ সম্পর্কে:

  • আসর, মাগরিব, এশা — পুনরায় পড়া আবশ্যক নয়।
  • এহতিয়াত হিসেবে পড়ে নিলে ভালো, তবে ওয়াজিব নয়।
  • ভবিষ্যতে সতর্কতা অবলম্বন করুন।

২. পায়জামা সম্পর্কে:

  • উক্ত পায়জামা ধুয়ে ফেলুন বা পরিবর্তন করুন।
  • নাপাক পায়জামা পরে নামাজ পড়া জায়েজ নয় (১ দিরহামের বেশি নাপাকি হলে)।
  • ধোয়ার নিয়ম: তিনবার ধুয়ে নিংড়াতে হবে, যাতে নাপাকির চিহ্ন (রং/গন্ধ) দূর হয়।

৩. পরবর্তী নামাজ:

  • পায়জামা পবিত্র করার পর বা পরিবর্তন করার পর পরবর্তী নামাজ আদায় করা যাবে।
  • নাপাক পায়জামা পরে নামাজ পড়লে নামাজ বাতিল হবে।

৪. স্রাব (মাযী) সম্পর্কে জরুরি মাসআলা:

সাদা স্রাব যদি মাযী (pre-ejaculate) হয়, তাহলে:

  • মাযী নাপাকি (হানাফি মাযহাবে মুগাল্লাজা নয়, বরং হালকা নাপাকি)।
  • মাযী বের হলে অজু ভেঙে যায়।
  • তবে মাযী লাগলে শুধু সেই স্থান ধুয়ে ফেলাই যথেষ্ট, পুরো কাপড় ধোয়া জরুরি নয় (যদি ১ দিরহামের কম হয়)।

«وَالْمَذْيُ نَجِسٌ يُوجِبُ الْوُضُوءَ» "মাযী নাপাক এবং তা অজু ওয়াজিব করে।"

(আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৭; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৩৫)

তবে যদি এটি সাধারণ স্রাব (যা সবসময় হয়) হয় এবং আপনি শুকনো থাকেন, তাহলে অজু ভাঙবে না।

৫. ভবিষ্যতের জন্য সতর্কতা:

  • প্রতিটি নামাজের আগে পায়জামা/কাপড় চেক করুন।
  • সন্দেহ হলে নিশ্চিত পবিত্রতা ধরে নিন।
  • বেশি সন্দেহ হলে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চান।

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |---|---| | আসর, মাগরিব, এশার নামাজ পুনরায় পড়া | আবশ্যক নয় (সন্দেহের কারণে) | | এহতিয়াত হিসেবে পড়া | জায়েজ, সওয়াব হবে | | উক্ত পায়জামা | ধুয়ে/পরিবর্তন করে পরতে হবে | | নাপাক পায়জামা পরে নামাজ | জায়েজ নয় | | পরবর্তী নামাজ | পায়জামা পবিত্র করার পর জায়েজ | | সাদা স্রাব (মাযী) হলে | অজু ভাঙবে, কাপড় ধুতে হবে |


দুআ

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْخُبْثِ وَالْخَبَائِثِ "হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে অপবিত্রতা ও অপবিত্র বস্তু থেকে আশ্রয় চাই।"

(সহীহ মুসলিম, হাদিস ৩৭৫)


মূলনীতি: সন্দেহ দ্বারা ইবাদত বাতিল হয় না। নিশ্চিত নাপাকি প্রমাণিত হলে তবেই পুনরায় পড়তে হয়। আপনার ক্ষেত্রে নিশ্চিত প্রমাণ নেই, তাই পূর্বের নামাজ সহীহ। তবে ভবিষ্যতে সতর্ক থাকুন এবং পায়জামা পবিত্র রাখুন।


আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে পবিত্রতা ও নামাজের বিধান সঠিকভাবে পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.