এরকম রেস্তোরাঁয় শেফ হিসেবে চাকুরি করা কি জায়েয, যেখানে হারাম খাবারও বিক্রি হয়?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন: কেউ যদি বিদেশে এরকম রেস্তোরাঁয় শেফ হিসেবে চাকরিরত থাকেন যেখানে হারাম খাবারও বিক্রি হয়, এবং সেই বেতন অন্য আরেক হালাল ব্যবসার জায়গা ভাড়া হিসেবে খরচ করেন, তাহলে ব্যবসার আয় সম্পূর্ণ হালাল হবে?
উত্তর: না, ব্যবসার আয় সম্পূর্ণ হালাল হবে না বরং তা মিশ্র (হালাল-হারাম মিশ্রিত) থাকবে। নিচে বিস্তারিত আলোচনা ও দলিল পেশ করা হলো।
১. শেফ হিসেবে চাকরির বিধান
যে রেস্তোরাঁয় হারাম খাবার (যেমন শূকরের মাংস, জবাইবিহীন গোশত, মদ ইত্যাদি) বিক্রি হয়, সেখানে শেফ হিসেবে কাজ করা জায়েয নয়। কারণ এতে হারাম খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনে সরাসরি সহায়তা করা হয়, যা কুরআন ও হাদিসে নিষিদ্ধ।
কুরআন:
﴿وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ﴾
“সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সাহায্য কর, এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সাহায্য করো না।” (সূরা মায়েদা: ২)
হাদিস:
নবী (সাঃ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি হারাম উপার্জন করে, তার দেহ জাহান্নামের জন্য উপযুক্ত।” (মুসনাদে আহমদ)
হানাফি কিতাব:
- ফাতাওয়া উসমানী: “হারাম মালের সাথে জড়িত কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা জায়েয নয়, যদি না ব্যক্তি সম্পূর্ণ আলাদা হালাল বিভাগে কাজ করে এবং হারামের সাথে তার কোনো সম্পর্ক না থাকে।”
- রদ্দুল মুহতার: “যেখানে হারাম বিক্রি হয়, সেখানে শেফের কাজ করলে তার বেতন হারাম হবে।” (কিতাবুল মাকাসিব)
২. হারাম বেতন দ্বারা ভাড়া পরিশোধ
হারাম উপার্জনের টাকা দ্বারা হালাল ব্যবসার জায়গা ভাড়া দিলে সেই ভাড়া দেওয়ার কাজটি গুনাহের কাজ, এবং ভাড়া পরিশোধের অর্থও হারাম থাকবে। তবে জায়গার মালিকের জন্য সেই টাকা গ্রহণ করা জায়েয নয়, কিন্তু চুক্তি বাতিল হবে না। যিনি ভাড়া দিচ্ছেন, তার দায়িত্ব হলো ওই হারাম টাকা ফিরিয়ে নেওয়া বা সদকা করে দেওয়া।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: “হারাম উপার্জন দ্বারা কোনো বৈধ কাজ করলেও সেই কাজের ফলাফল পবিত্র হয় না; বরং ঐ ব্যক্তি গুনাহগার থাকে এবং তাকে তওবা করে হারাম মাল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।”
- শরহু মাআনিল আসার: “হারাম মাল দ্বারা কোনো বিনিময় করলে তা বৈধ হয় না, বরং তা ফিরিয়ে দেওয়া বা সদকা করা ওয়াজিব।”
৩. হালাল ব্যবসার আয়ের বিধান
যে ব্যবসায় নিজস্ব পণ্য ও লেনদেন সম্পূর্ণ হালাল, তার আয় মূলত হালাল। কিন্তু যেহেতু ব্যবসার ভাড়া (একটি খরচ) হারাম টাকা দিয়ে পরিশোধ করা হয়েছে, তাই ওই ব্যবসার আয় সম্পূর্ণ হালাল বলে গণ্য হবে না। বরং ঐ ব্যক্তির সম্পদে হালাল ও হারাম মিশ্রিত হবে। তাকে নিম্নোক্তভাবে পবিত্র করতে হবে:
- প্রথমত: শেফের চাকরি ছেড়ে দিয়ে তওবা করতে হবে।
- দ্বিতীয়ত: যে পরিমাণ হারাম বেতন ভাড়া বাবদ খরচ হয়েছে, সেই পরিমাণ টাকা সওয়াবের নিয়ত ছাড়া সদকা করে দিতে হবে।
- তৃতীয়ত: ব্যবসার আয় থেকে ওই পরিমাণ বাদ দিয়ে বাকি আয় তার জন্য হালাল হবে। কিন্তু যদি ভাড়ার পরিমাণ ব্যবসার মোট লাভের তুলনায় নগণ্য হয়, তবুও তাকে পবিত্র করতে হবে।
ফাতাওয়া আলমগীরী: “যদি কেউ হারাম মাল দ্বারা হালাল ব্যবসা করে, তবে ব্যবসার লাভ হালাল, কিন্তু মূলধন হারাম থাকায় তাকে পবিত্র করতে হবে।”
বাহেশতী জেওর: “হারাম উপার্জন দ্বারা নিজের ব্যবসা চালালে সেই ব্যবসার আয় হালাল হলেও ব্যক্তি গুনাহগার হয়। তাই তওবা ও সদকা করা জরুরি।”
৪. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে:
- শেফের চাকরি ও বেতন উভয়ই হারাম।
- সেই হারাম টাকা ভাড়া দিলে ভাড়া চুক্তি বৈধ হলেও তা গুনাহের কাজ।
- ব্যবসার আয় নিজে হালাল, কিন্তু ব্যবহারকৃত হারাম টাকার কারণে তা পবিত্র নয়; তাই তা সম্পূর্ণ হালাল বলা যাবে না।
সঠিক পদ্ধতি:
(ক) অবিলম্বে চাকরি ছেড়ে দিন।
(খ) হারাম বেতন থেকে যত টাকা ভাড়ায় খরচ হয়েছে, সেই পরিমাণ গরিব-মিসকিনকে সদকা করুন।
(গ) এরপর ব্যবসার আয় আপনার জন্য সম্পূর্ণ হালাল হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ﴾
“হে ঈমানদারগণ, আমি তোমাদের যে পবিত্র রিজিক দিয়েছি তা থেকে খাও।” (সূরা বাকারা: ১৭২)
রাসূল (সাঃ) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি হালাল উপার্জন করে এবং হালাল ভক্ষণ করে, তার দুআ কবুল হয়।” (মুসলিম)
উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত হানাফি গ্রন্থ:
ফাতাওয়া উসমানী, ইমদাদুল ফাতাওয়া, রদ্দুল মুহতার, বাহেশতী জেওর, ফাতাওয়া আলমগীরী, শরহু মাআনিল আসার, উসুলুশ শাশী, আল-হিদায়া, মাআরিফুল কুরআন।