পরীক্ষায় ভালো নম্বরের জন্য কলেজ কর্তৃক ৩০০ টাকা ঘুষ নেওয়া কি জায়েজ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার কলেজ থেকে ব্যবহারিক পরীক্ষার কথা বলে প্রতিটি স্টুডেন্টের কাছ থেকে ৩০০ করে টাকা নিচ্ছে। এবং তারা আমাদেরকে সরাসরি বলছে এটা ভালো নাম্বার পাওয়ার একটি মাধ্যম। এবং তারা আমাদেরকে যতভাবে সতর্ক করার করছে যেন আমরা এই কথাটা কোনভাবেই বাইরের মানুষকে না জানাই। এখন পরীক্ষা দিতে হলে এই টাকাটা দিতেই হবে বাধ্যতামূলক। এখন আমি কি করতে পারি।
Answer
পরীক্ষার জন্য ঘুষ/অবৈধ টাকা প্রদান প্রসঙ্গে শরীয়াহর বিধান
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
ফতোয়া
আপনার কলেজ কর্তৃপক্ষ "ভালো নম্বর পাওয়ার মাধ্যম" বলে যে ৩০০ টাকা নিচ্ছে — এটি স্পষ্ট ঘুষ (রিশওয়াত) এবং হারাম। ইসলামে ঘুষ দেওয়া, নেওয়া এবং ঘুষের কাজে সহযোগিতা করা — তিনটিই কবিরা গুনাহ। তবে বাধ্যবাধকতার কারণে কিছুটা সমাধানের পথ আছে, যা নিচে বিস্তারিত বলা হলো।
১. ঘুষের সংজ্ঞা ও বিধান
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ الرَّاشِي وَالْمُرْتَشِي وَالرَّائِشَ»
"রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘুষদাতা, ঘুষগ্রহীতা এবং ঘুষের মধ্যস্থতাকারীর প্রতি লানত করেছেন।"
— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৮০; সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৩৩৭; মুসনাদে আহমাদ
ইমাম তিরমিজি (রহ.) এই হাদিসকে হাসান-সহিহ বলেছেন।
আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:
ঘুষ হলো এমন সম্পদ যা কোনো বিচারক বা ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে হক বাতিল করতে বা বাতিলকে হক বানানোর জন্য প্রদান করা হয়।
— রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৬২; ফতোয়ায়ে আলমগিরি, খণ্ড ৩, পৃ. ৩৪৩
২. এই টাকা কী ধরনের?
যেহেতু কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট বলছে — "এটি ভালো নম্বর পাওয়ার মাধ্যম" — অর্থাৎ টাকা দিলে নম্বর বাড়বে, না দিলে নম্বর কমবে বা পরীক্ষায় সমস্যা হবে — এটি সরাসরি ঘুষ। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:
"পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানোর জন্য শিক্ষককে টাকা দেওয়া বা শিক্ষার্থীর কাছ থেকে টাকা আদায় করা — উভয়ই রিশওয়াতের অন্তর্ভুক্ত, যা কুরআন-হাদিসে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ।"
— ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৪২১ (অনুরূপ)
৩. বাধ্যবাধকতার বিধান
ইসলামি ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো:
«الضَّرُورَاتُ تُبِيحُ الْمَحْظُورَاتِ»
"প্রয়োজনীয়তা নিষিদ্ধ বস্তুকে বৈধ করে না, তবে চরম বাধ্যবাধকতায় (ইদতিরার) ভিন্ন বিধান হতে পারে।"
তবে এখানে লক্ষণীয়:
- আপনি ঘুষ দিচ্ছেন না — বরং আপনার কাছ থেকে জোরপূর্বক আদায় করা হচ্ছে।
- ইসলামি ফিকহে "ইকরাহ" (জবরদস্তি)-এর বিধান আছে। জবরদস্তির কারণে অনেক সময় গুনাহের দায়িত্ব কমে যায়, তবে সম্পদ হারাম হওয়ার বিধান বদলায় না।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"যদি কেউ জুলুমের ভয়ে বাধ্য হয়ে ঘুষ দেয়, তবে সে গুনাহগার হবে না; বরং ঘুষগ্রহীতা গুনাহগার হবে।"
— রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৬৩
৪. আপনার করণীয়
| ক্রম | করণীয় | |------|--------| | ১ | প্রথমে টাকা না দেওয়ার চেষ্টা করুন — কলেজের উচ্চতর কর্তৃপক্ষ, অধ্যক্ষ বা শিক্ষা বোর্ডে অভিযোগ করুন (নাম গোপন রেখে)। | | ২ | যদি একান্তই বাধ্য হন — অর্থাৎ টাকা না দিলে পরীক্ষা দিতে বাধা দেওয়া হবে, পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যাবে — তাহলে জবরদস্তির কারণে টাকা দিতে পারেন, কিন্তু অন্তরে ঘুষকে ঘুষ হিসেবেই জানবেন এবং ঘৃণা করবেন। | | ৩ | টাকা দেওয়ার সময় নিয়ত ঠিক রাখুন — "আমি ঘুষ দিচ্ছি না; বরং জুলুম থেকে বাঁচার জন্য বাধ্য হয়ে দিচ্ছি।" |
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
- নিজে থেকে কাউকে টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেবেন না — এটি ঘুষদাতা হওয়ার শামিল।
- মিথ্যা সাক্ষ্য দেবেন না — "আমি স্বেচ্ছায় দিচ্ছি" বলে মিথ্যা বলবেন না।
- গোপনীয়তার শর্ত মানতে বাধ্য নন — যদি এটি জুলুম হয়, তবে বৈধ পথে প্রকাশ করা যেতে পারে, তবে প্রজ্ঞার সাথে।
والله أعلم بالصواب