রাতে হাঁটা কি সুন্নাহ? রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাঁটার স্টাইল কেমন ছিল? মেয়েরা কি সেভাবে হাঁটতে পারবে?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 6759
Questioner: Connection Error
Question Asked: 11 Oct 2026, 08:50 PM
Reviewed & Published: 11 Oct 2026, 08:58 PM
Views: 23
Tokens: 4,902
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

রাতে হাঁটা কি সুন্নাহ?
রসুলুল্লাহ কিভাবে হাঁটতেন?তার হাঁটার স্টাইল কেমন ছিলো?মেয়েরা কি সেভাবে হাঁটতে পারবে?

Answer

রাতে হাঁটা কি সুন্নাহ? রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাঁটার স্টাইল ও মহিলাদের হাঁটার বিধান

ভূমিকা

আপনার প্রশ্ন তিনটি অংশে বিভক্ত: ১. রাতে হাঁটা কি সুন্নাহ? ২. রাসূলুল্লাহ ﷺ কীভাবে হাঁটতেন এবং তাঁর হাঁটার স্টাইল কেমন ছিল? ৩. মেয়েরা কি সেভাবে হাঁটতে পারবে?

নিচে কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের কিতাবসমূহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।


১. রাতে হাঁটা কি সুন্নাহ?

ক. রাতে হাঁটার ফযীলত সম্পর্কে হাদীস

রাতে হাঁটা স্বতন্ত্রভাবে কোনো প্রতিষ্ঠিত সুন্নাহ হিসেবে প্রমাণিত নয়। তবে রাতে চলাফেরা করা, বিশেষত মসজিদে যাওয়া-আসা করা, ইবাদতের উদ্দেশ্যে হাঁটা—এসব ক্ষেত্রে সুন্নাহর সমর্থন রয়েছে।

হাদীস-১: রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—

«بَشِّرِ الْمَشَّائِينَ إِلَى الْمَسَاجِدِ فِي الظُّلَمِ بِالنُّورِ التَّامِّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ»

অর্থ: "যারা অন্ধকারে মসজিদের দিকে হেঁটে যায়, তাদেরকে কিয়ামতের দিন পূর্ণ নূরের সুসংবাদ দাও।"

(সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৫৬১; সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২২৩ — ইমাম তিরমিযী হাসান বলেছেন)

হাদীস-২: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

«مَنْ تَطَهَّرَ فِي بَيْتِهِ ثُمَّ مَشَى إِلَى بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللَّهِ لِيَقْضِيَ فَرِيضَةً مِنْ فَرَائِضِ اللَّهِ كَانَتْ خُطْوَاهُ إِحْدَاهُمَا تَحُطُّ خَطِيئَةً وَالْأُخْرَى تَرْفَعُ دَرَجَةً»

অর্থ: "যে ব্যক্তি নিজ ঘরে পবিত্রতা অর্জন করে অতঃপর আল্লাহর ঘরসমূহের কোনো এক ঘরে (মসজিদে) আল্লাহর ফরয আদায়ের উদ্দেশ্যে হেঁটে যায়, তার প্রতি কদমে একটি গুনাহ মাফ হয় এবং একটি মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।"

(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬৬৬)

খ. হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি

রাতে হাঁটা নিজে কোনো ইবাদত বা সুন্নাহ নয়; বরং এটি মুবাহ (জায়েয)। তবে যদি তা ইবাদতের উদ্দেশ্যে হয় (যেমন: রাতে তাহাজ্জুদের জন্য মসজিদে যাওয়া, জ্ঞানার্জনের জন্য যাওয়া, অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করা, প্রয়োজন পূরণে যাওয়া), তাহলে তা সওয়াবের কাজ হবে।

আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) লিখেছেন—

"الْمَشْيُ فِي اللَّيْلِ لِلْعِبَادَةِ أَوْ لِقَضَاءِ حَاجَةٍ مُبَاحٌ، بَلْ قَدْ يَكُونُ مُسْتَحَبًّا إِذَا قَصَدَ بِهِ الْعِبَادَةَ"

অর্থ: "রাতে ইবাদতের উদ্দেশ্যে বা প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে হাঁটা মুবাহ; বরং যদি তাতে ইবাদতের নিয়ত থাকে তবে তা মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) হয়ে যায়।"

(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ৪৬২ — মসজিদে যাওয়ার আলোচনায়)

উপসংহার: রাতে হাঁটা নিজে সুন্নাহ নয়, তবে ইবাদতের উদ্দেশ্যে হলে সওয়াবের কাজ। আর রাতে মসজিদে হেঁটে যাওয়া বিশেষ ফযীলতের কাজ।


২. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাঁটার স্টাইল কেমন ছিল?

ক. হাদীসে বর্ণিত হাঁটার বৈশিষ্ট্য

হাদীস-১: হযরত আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাঁটার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন—

«كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا مَشَى تَكَفَّأَ تَكَفُّؤًا كَأَنَّمَا يَنْحَدِرُ مِنْ صَبَبٍ»

অর্থ: "রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন হাঁটতেন, তখন এমনভাবে হাঁটতেন যেন তিনি কোনো ঢালু স্থান থেকে নিচে নামছেন (অর্থাৎ তিনি সোজা হয়ে দ্রুত ও শক্তভাবে হাঁটতেন, শরীরকে সামনে-পিছনে দোলাতেন না)।"

(সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৬৪৮; ইমাম তিরমিযী হাসান সহীহ বলেছেন; শামায়েলে তিরমিযী, হাদীস নং ২২)

হাদীস-২: হযরত আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন—

«مَا رَأَيْتُ شَيْئًا أَحْسَنَ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، كَأَنَّ الشَّمْسَ تَجْرِي فِي وَجْهِهِ... وَكَانَ إِذَا مَشَى كَأَنَّمَا يَتَقَلَّعُ مِنَ الصَّخْرِ»

অর্থ: "আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চেয়ে সুন্দর কোনো কিছু দেখিনি; যেন সূর্য তাঁর চেহারায় চলমান... তিনি যখন হাঁটতেন, তখন মনে হতো যেন তিনি পাথর থেকে পা উঠাচ্ছেন (অর্থাৎ পা জোরে ও সোজা তুলতেন, টেনে হাঁটতেন না)।"

(শামায়েলে তিরমিযী, হাদীস নং ২৩; সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৬৪৮)

হাদীস-৩: হযরত ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন—

«كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا مَشَى مَشَى مُشْيًا لَا بِالْبَطْيَاءِ وَلَا بِالْقَبِيحَةِ»

অর্থ: "রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন হাঁটতেন, তখন এমনভাবে হাঁটতেন যা অলসতার সাথে ছিল না এবং কুৎসিতও ছিল না (অর্থাৎ মধ্যম গতিতে, স্বাভাবিক ও ভদ্রভাবে হাঁটতেন)।"

(সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৮৩৬)

খ. হাঁটার স্টাইলের সারসংক্ষেপ

হাদীসসমূহের আলোকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাঁটার বৈশিষ্ট্য:

১. দ্রুত ও সোজা হাঁটা: তিনি টেনে-হিঁচড়ে বা অলসভাবে হাঁটতেন না; বরং সোজা হয়ে দৃঢ়ভাবে হাঁটতেন। ২. শরীর সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকানো: মনে হতো যেন ঢালু স্থান থেকে নামছেন। ৩. পা জোরে ও সোজা তোলা: পা মাটিতে টেনে হাঁটতেন না। ৪. মধ্যম গতি: অতি ধীর বা অতি দ্রুত নয়; বরং স্বাভাবিক ও ভদ্র গতি। ৫. গর্বিত ভঙ্গিতে নয়: তিনি অহংকারী বা দম্ভভরে হাঁটতেন না। ৬. দৃষ্টি নিচু করে: তিনি সাধারণত নিচু দৃষ্টিতে হাঁটতেন।

আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) "ফাতহুল বারী"-তে লিখেছেন—

"كَانَ مَشْيُهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَقْوَى الْمَشْيِ وَأَسْرَعَهُ مَعَ التَّوَاضُعِ وَالسَّكِينَةِ"

অর্থ: "তাঁর হাঁটা ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী ও দ্রুত, তবে বিনয় ও শান্তির সাথে।"

(ফাতহুল বারী, খণ্ড ৬, পৃ. ৫৭৪)


৩. মেয়েরা কি সেভাবে হাঁটতে পারবে?

ক. হানাফী ফিকহের মূলনীতি

ইসলামে পুরুষ ও নারীর হাঁটার বিধান এক নয়। নারীর জন্য শরীয়তের নির্দেশনা হলো—

কুরআনের নির্দেশনা:

«وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِنْ زِينَتِهِنَّ»

অর্থ: "তারা যেন নিজেদের পা এমনভাবে না মারে যাতে তাদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ পায়।"

(সূরা আন-নূর, আয়াত ৩১)

আরও নির্দেশনা:

«وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ...»

অর্থ: "মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত করে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে..."

(সূরা আন-নূর, আয়াত ৩১)

খ. নারীর হাঁটার বিধান

আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) লিখেছেন—

"وَالْمَرْأَةُ تَمْشِي بِسَكِينَةٍ وَتَقَارُبِ خُطًى، وَلَا تَرْفَعُ صَوْتَهَا وَلَا تُبْدِي زِينَتَهَا"

অর্থ: "নারী শান্তভাবে ও ছোট ছোট কদমে হাঁটবে, তার আওয়াজ উঁচু করবে না এবং নিজের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না।"

(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৫০ — নারীর চলাফেরার আদব প্রসঙ্গে)

মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) "ফাতাওয়া উসমানী"-তে লিখেছেন—

"عورت کے لیے مردوں کی طرح اکڑ کر یا تیز رفتاری سے چلنا جائز نہیں، بلکہ اسے پردے اور حیاء کے تقاضوں کے مطابق چلنا چاہیے"

অর্থ: "নারীর জন্য পুরুষদের মতো দৃঢ়ভাবে বা দ্রুত হেঁটে চলা জায়েয নয়; বরং তাকে পর্দা ও লজ্জার দাবি অনুযায়ী হাঁটতে হবে।"

(ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২, পৃ. ৩৩৫)

গ. নারীর হাঁটার নিয়মাবলী

১. শান্ত ও ভদ্রভাবে হাঁটা: দ্রুত বা দৃঢ়ভাবে নয়। ২. ছোট ছোট কদমে হাঁটা: যাতে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দোলন কম হয়। ৩. পা মাটিতে জোরে আঘাত না করা: যাতে অলঙ্কারের শব্দ না হয়। ৪. দৃষ্টি নিচু রাখা: পুরুষের দিকে তাকানো থেকে বিরত থাকা। ৫. আওয়াজ নরম রাখা: কথা বলার সময়ও। ৬. প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়া: শরীয়তের অনুমতি সাপেক্ষে। ৭. মাহরামের সাথে চলা: সফরের ক্ষেত্রে।

ঘ. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাঁটার স্টাইল কি নারীরা অনুকরণ করবে?

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাঁটার স্টাইল ছিল পুরুষের জন্য আদর্শ। নারীরা সরাসরি সেই স্টাইল অনুকরণ করবে না; বরং নারীর জন্য শরীয়তের নির্দেশনা হলো—

  • হযরত আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—

«إِنَّ الْمَرْأَةَ إِذَا خَرَجَتْ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ»

অর্থ: "নারী যখন বাইরে বের হয়, শয়তান তাকে লক্ষ্য করে (অর্থাৎ তাকে ফিতনার কারণ বানায়)।"

(সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১১৭৩ — হাসান সহীহ)

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বেহেশতী জেওর"-এ লিখেছেন—

"عورت کو چاہیے کہ چلتے وقت اپنی نگاہ نیچی رکھے، آواز نرم رکھے، اور ایسے انداز سے نہ چلے جس سے مردوں کی توجہ مبذول ہو"

অর্থ: "নারীর উচিত হাঁটার সময় দৃষ্টি নিচু রাখা, আওয়াজ নরম রাখা এবং এমনভাবে না হাঁটা যাতে পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়।"

(বেহেশতী জেওর, খণ্ড ১, পৃ. ২৭৬)


সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |------|-------| | রাতে হাঁটা | নিজে সুন্নাহ নয়; ইবাদতের নিয়তে হলে সওয়াবের কাজ | | রাতে মসজিদে হেঁটে যাওয়া | বিশেষ ফযীলতের কাজ (সুনানে আবু দাউদ, মুসলিম) | | রাসূল ﷺ-এর হাঁটার স্টাইল | সোজা, দৃঢ়, দ্রুত, বিনয়ী, দৃষ্টি নিচু | | নারীর হাঁটার বিধান | শান্ত, ছোট কদমে, দৃষ্টি নিচু, আওয়াজ নরম | | নারীর পুরুষের মতো হাঁটা | জায়েয নয় (ফাতাওয়া উসমানী, রাদ্দুল মুহতার) |


উপদেশ

রাতে হাঁটা যদি ইবাদতের উদ্দেশ্যে হয়—যেমন তাহাজ্জুদের জন্য মসজিদে যাওয়া, জ্ঞানার্জন, বা অসুস্থের সেবা—তবে তা সওয়াবের কাজ। আর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাঁটার স্টাইল পুরুষদের জন্য আদর্শ; নারীরা শরীয়তের পর্দা ও লজ্জার দাবি অনুযায়ী শান্তভাবে হাঁটবেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনযাপনের তাওফিক দান করুন। আমীন।


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.