বারবার গুনাহে লিপ্ত হওয়ার পর তাওবা ও আল্লাহর প্রিয় হওয়ার উপায়।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
কোনো মুসলিম যদি আল্লাহর বিধিবিধান জানা সত্বেও, নফসের ধোঁকায় পড়ে গুরুতর পাপকাজ করে ফেলে( মিথ্যা, গিবত, নন-মাহরাম এর সাথে অবৈধ সম্পর্ক), এর পর সে তাওবা করে। সকল হারাম থেকে বিরত থাকতে চায়।কিন্তু আবার সে পাপ কাজে লিপ্ত হয়ে আবার অনুশোচনা করে। বারবার এমন হতেই থাকে।কিভাবে সে ব্যক্তি নিজেকে এই অবস্থা থেকে বের করতে পারবে?? আর তার পক্ষে কি আল্লাহর প্রিয় হওয়া এবং অনুগ্রহপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া সম্ভব??
Answer
উত্তর: বারবার পাপে লিপ্ত হওয়া ও তাওবার বিধান
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ্
ভূমিকা
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক মুসলিমের হৃদয়ের প্রশ্ন। নফসের সাথে সংগ্রাম (জিহাদুন নফস) প্রতিটি মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا ۚ وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ "যারা আমার পথে সংগ্রাম করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথসমূহ দেখিয়ে দেব। নিশ্চয়ই আল্লাহ মুহসিনদের সাথে আছেন।" (সূরা আনকাবুত: ৬৯)
১. বারবার পাপ ও তাওবার শরয়ী বিধান
ক. তাওবা কবুল হওয়ার শর্ত
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী তাওবার তিনটি মূল শর্ত রয়েছে:
- পাপ কাজ থেকে সাথে সাথে বিরত হওয়া
- কৃত পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া (অনুশোচনা)
- ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় সংকল্প করা
যদি পাপটি কারো হক (বান্দার অধিকার) সম্পর্কিত হয়, তবে চতুর্থ শর্ত হলো সেই হক ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষমা চাওয়া।
রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ৫, পৃ. ৩৪৭; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ১৩২
খ. বারবার তাওবা ভঙ্গ করা প্রসঙ্গে
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতারে উল্লেখ করেছেন যে, তাওবা ভঙ্গ হলে তাওবা বাতিল হয়ে যায়, কিন্তু নতুন করে তাওবা করলে তা আবার সহীহ হয়ে যায়। আল্লাহর রহমত অসীম।
হাদিসে এসেছে:
إِنَّ اللَّهَ يَبْسُطُ يَدَهُ بِاللَّيْلِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ النَّهَارِ، وَيَبْسُطُ يَدَهُ بِالنَّهَارِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ اللَّيْلِ "নিশ্চয়ই আল্লাহ রাতে তাঁর হাত প্রসারিত করেন দিনের পাপীর তাওবা কবুলের জন্য, এবং দিনে তাঁর হাত প্রসারিত করেন রাতের পাপীর তাওবা কবুলের জন্য।" (সহীহ মুসলিম: ২৭৫৯)
২. এই অবস্থা থেকে বের হওয়ার কার্যকর উপায়
ক. তাওবার পদ্ধতি (হানাফি মতে)
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বেহেশতী জেওরে বলেছেন:
- সাথে সাথে তাওবা করা — বিলম্ব না করা
- নামাজে রাত জাগা — তাহাজ্জুদে কাঁদতে কাঁদতে ক্ষমা চাওয়া
- ইস্তিগফার বেশি পড়া — বিশেষত:
- سَيِّدُ الْاِسْتِغْفَار (সাইয়িদুল ইস্তিগফার)
- رَبِّ اغْفِرْ لِي وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
- أَسْتَغْفِرُ اللهَ رَبِّي مِنْ كُلِّ ذَنْبٍ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
খ. নফস দমন করার ব্যবহারিক উপায়
| উপায় | বিবরণ | |------|--------| | ১. পরিবেশ পরিবর্তন | খারাপ সঙ্গ ত্যাগ করা, নন-মাহরাম থেকে দৃষ্টি নামানো | | ২. ইন্টারনেট/মোবাইল নিয়ন্ত্রণ | অশ্লীল কনটেন্ট থেকে দূরে থাকা, সোশ্যাল মিডিয়া সীমিত করা | | ৩. রোজা রাখা | সপ্তাহে অন্তত ২ দিন (সোম-বৃহস্পতিবার) নফল রোজা | | ৪. দ্বীনি মজলিস | সাপ্তাহিক দ্বীনি ইলমের মজলিসে যোগ দেওয়া | | ৫. বিয়ে করা | সামর্থ্য থাকলে দ্রুত বিয়ে করা — এটি নফসের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধক | | ৬. দোয়া ও কান্নাকাটি | আল্লাহর কাছে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করা |
রেফারেন্স: মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি), সূরা ইউসুফের তাফসির; ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী), খণ্ড ৪
গ. শয়তানের কৌশল বুঝা
শয়তান দুইভাবে আক্রমণ করে:
- পাপে প্ররোচিত করে — "একবার কর, পরে তাওবা করবে"
- হতাশ করে — "তুমি তো বারবার পাপ করছ, তোমার তাওবা কবুল হবে না"
দ্বিতীয়টি আরও বিপজ্জনক। এটি শয়তানের ফাঁদ। আল্লাহ বলেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ "বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন। তিনিই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা যুমার: ৫৩)
৩. আল্লাহর প্রিয় হওয়া ও অনুগ্রহপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া কি সম্ভব?
হ্যাঁ, অবশ্যই সম্ভব — যদি নিম্নলিখিত শর্ত পূরণ হয়:
১. তাওবায় sincerity (ইখলাস) থাকা: হাদিসে আছে — আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا ابْنَ آدَمَ، إِنَّكَ مَا دَعَوْتَنِي وَرَجَوْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ عَلَى مَا كَانَ فِيكَ وَلَا أُبَالِي "হে আদম সন্তান! যতক্ষণ তুমি আমার কাছে দোয়া করবে এবং আমার কাছে আশা রাখবে, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব, তাতে আমার কোনো পরোয়া নেই।" (তিরমিজি: ৩৫৪০ — হাসান সহীহ)
২. তাওবার পর আমলে সালেহ করা:
وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِّمَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَىٰ "নিশ্চয়ই আমি ক্ষমাশীল তার জন্য যে তাওবা করে, ঈমান আনে, সৎকর্ম করে এবং হেদায়েতের উপর অবিচল থাকে।" (সূরা ত্বহা: ৮২)
৩. আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার পথ:
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালোবাসেন।" (সূরা বাকারা: ২২২)
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানিতে বলেন: "তাওবা ভঙ্গ হলে হতাশ হওয়া যাবে না; বরং প্রতিবার নতুন তাওবা করতে হবে। আল্লাহর রহমত অসীম। তবে শর্ত হলো — তাওবায় সত্যতা থাকতে হবে এবং পাপ ছাড়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে।"
৪. বিশেষ পরামর্শ — ধাপে ধাপে করণীয়
- প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায় — এটি সবচেয়ে বড় ঢাল
- নন-মাহরাম থেকে সম্পূর্ণ পর্দা — চোখ, কথা, অনলাইন সব ক্ষেত্রে
- মোবাইলে খারাপ কনটেন্ট ব্লক — প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নিন
- প্রতিদিন ১০০ বার ইস্তিগফার — কমপক্ষে
- সাপ্তাহিক দ্বীনি মজলিস — উলামায়ে কেরামের সংস্পর্শে থাকুন
- বিয়ে করার চেষ্টা — সামর্থ্য থাকলে দ্রুত
- নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে দোয়া — আল্লাহর কাছে কাঁদুন
৫. সতর্কতা
- গুনাহকে ছোট মনে করা যাবে না — এটি ঈমানের জন্য বিপজ্জনক
- তাওবাকে পিছিয়ে দেওয়া যাবে না — মৃত্যু কখন আসবে জানা নেই
- নিরাশ হওয়া যাবে না — এটি শয়তানের কৌশল
- নিজের চেষ্টার সাথে আল্লাহর তাওফিক কামনা করতে হবে
উপসংহার
হ্যাঁ, সেই ব্যক্তির পক্ষে আল্লাহর প্রিয় হওয়া এবং অনুগ্রহপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া সম্ভব — যদি সে সincerity সহ তাওবা করে, পাপ ছাড়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে, এবং নিরাশ না হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا
প্রতিটি তাওবা ভঙ্গের পর নতুন তাওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করেন। তবে শর্ত হলো — তাওবায় সত্যতা এবং পাপ ছাড়ার জন্য সংগ্রাম। আল্লাহ আমাদের সবাইকে নফসের বিরুদ্ধে জয়ী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।