বাবা মায়ের ভয়ে/শরমে ফরজ গোসল ছাড়া নামাজ পড়া কি রিয়া হবে?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
Answer
রিয়া (লোকদেখানো ইবাদত) সম্পর্কে বিস্তারিত উত্তর
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নে বলা হয়েছে—কারও উপর যদি কোনো কারণে ফরজ গোসল ফরজ বা ওয়াজিব হয়, কিন্তু তার বাবা-মা সেটা জানেন না এবং তাকে নামাজের সময় হলে বারবার নামাজ পড়তে বলেন। এমন অবস্থায় যদি সে তাদের বকাঝকা বা ভৎসনা থেকে বাঁচার জন্য নামাজ আদায় করে (যদিও সে জানে আল্লাহ কবুল করবেন না), তাহলে কি এটা রিয়া হবে?
মূল উত্তর
হ্যাঁ, এটা রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে। কারণ রিয়া হলো—আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কারও সন্তুষ্টি বা লোকের প্রশংসা অর্জনের উদ্দেশ্যে ইবাদত করা। এখানে ব্যক্তি নামাজ পড়ছে মূলত বাবা-মায়ের বকাঝকা থেকে বাঁচার জন্য, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নয়। এটি এক প্রকার রিয়ায়ে খফি (গোপন রিয়া) বা শিরকে আসগার (ছোট শিরক)।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়—
১. রিয়ার সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ
রিয়া শব্দের অর্থ হলো—দেখানো, লোক দেখানো। পরিভাষায়: আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতীত অন্য কারও সন্তুষ্টি বা প্রশংসা লাভের উদ্দেশ্যে ইবাদত করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ "তাদেরকে এ ছাড়া অন্য কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহর ইবাদত করবে তাঁর প্রতি দ্বীনকে খালিস (একনিষ্ঠ) করে।" — (সূরা বাইয়িনাহ: ৫)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ، قَالُوا: وَمَا الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: الرِّيَاءُ "নিশ্চয়ই আমি তোমাদের উপর সবচেয়ে বেশি ভয় করি শিরকে আসগার (ছোট শিরক) সম্পর্কে। সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! শিরকে আসগার কী? তিনি বললেন: রিয়া (লোক দেখানো)।" — (মুসনাদে আহমাদ: ২৩৬৩০; মুসনাদে বাযযার)
২. প্রশ্নের পরিস্থিতির বিশ্লেষণ
এখানে কয়েকটি দিক রয়েছে:
(ক) নামাজের হুকুম
যে ব্যক্তির উপর ফরজ গোসল ফরজ হয়েছে (যেমন: স্বপ্নদোষ, হায়েজ, নিফাস ইত্যাদি কারণে), সে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত নামাজ পড়তে পারবে না। এমতাবস্থায় নামাজ পড়া বাতিল ও হারাম। তাকে আগে গোসল করতে হবে, তারপর নামাজ পড়তে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِنْ كُنْتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا "যদি তোমরা অপবিত্র (জুনুব) হও, তবে পবিত্র হয়ে যাও।" — (সূরা মায়িদা: ৬)
(খ) রিয়ার হুকুম
এখানে ব্যক্তি নামাজ পড়ছে দুটি কারণে:
- বাবা-মায়ের বকাঝকা থেকে বাঁচার জন্য
- আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নয় (সে নিজেই জানে আল্লাহ কবুল করবেন না)
এটি স্পষ্ট রিয়া। কারণ ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি হওয়া উচিত, কিন্তু এখানে উদ্দেশ্য হলো মানুষের সন্তুষ্টি বা তাদের রাগ থেকে বাঁচা।
(গ) তবে একটি সূক্ষ্ম বিষয়
যদি সে নামাজ পড়ে শুধু বাবা-মায়ের বকাঝকা থেকে বাঁচার জন্য এবং নামাজকে ইবাদত হিসেবে না করে বরং একটি সামাজিক রীতি বা অভ্যাস হিসেবে করে, তাহলে সেটি রিয়া তো বটেই, বরং নামাজের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করার শামিল হবে। যা কুফরির পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে (নাউজুবিল্লাহ)।
কিন্তু যদি সে মনে করে—"আমি নামাজ পড়ছি যদিও আমার গোসল হয়নি, তাই এই নামাজ হবে না, কিন্তু বাবা-মায়ের কথা শুনতে হবে এবং পরে গোসল করে আবার পড়ব"—তাহলে সেটি ভিন্ন বিষয়। তবে সাধারণত এমন নিয়ত থাকে না।
৩. সমাধান ও করণীয়
(ক) তার করণীয়
- সাথে সাথে গোসল করা—ফরজ গোসল করা ফরজ। বিলম্ব করা যাবে না।
- বাবা-মাকে জানানো—যদি সম্ভব হয়, বিনয়ের সাথে জানানো যে তার গোসল করা প্রয়োজন। তবে গোসলের কারণ (যেমন: স্বপ্নদোষ) বলা জরুরি নয়, শুধু বলা যেতে পারে—"আমার গোসল করা দরকার" বা "আমি অপবিত্র অবস্থায় আছি"।
- নামাজ না পড়া—পবিত্র হওয়ার আগে নামাজ পড়া যাবে না। বাবা-মায়ের বকাঝকা থেকে বাঁচার জন্য নামাজ পড়া রিয়া ও নামাজ বাতিল।
- তাওবা করা—যদি এমনটি হয়ে যায়, তবে আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এমন না করার সংকল্প করতে হবে।
(খ) বাবা-মায়ের প্রতি করণীয়
সন্তানের উচিত বাবা-মায়ের সাথে সদাচরণ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا "পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করো।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)
তবে সদাচরণের অর্থ এই নয় যে, হারাম কাজ করতে হবে। বাবা-মায়ের আনুগত্য ওয়াজিব শুধু জায়েজ কাজে। হারাম বা বাতিল কাজে তাদের আনুগত্য করা যাবে না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ "সৃষ্টির আনুগত্য নেই স্রষ্টার অবাধ্যতায়।" — (মুসনাদে আহমাদ, শুআবুল ঈমান)
৪. রিয়া থেকে বাঁচার উপায়
- ইখলাসের নিয়ত—প্রতিটি ইবাদত শুধু আল্লাহর জন্য করা।
- নিজের আমল গোপন রাখা—যতটা সম্ভব নফল ইবাদত গোপনে করা।
- আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া—রাসূলুল্লাহ ﷺ শিখিয়েছেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ "হে আল্লাহ! আমি জেনে-বুঝে তোমার সাথে শিরক করা থেকে তোমার আশ্রয় চাই, আর না জেনে যা করেছি তার জন্য ক্ষমা চাই।" — (মুসনাদে আহমাদ)
- আখিরাতের চিন্তা—লোকের প্রশংসা ক্ষণস্থায়ী, আল্লাহর সন্তুষ্টি চিরস্থায়ী।