ব্যাংকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার চাকুরির বিধান কি? শিক্ষকের কম সময় পড়িয়ে সম্পূর্ণ বেতন নেওয়ার হুকুম কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
ব্যাংকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার পদে চাকুরী করা কি জায়েজ?বেতন হালাল?
স্টুডেন্টদের ১ ঘন্টা পড়ানোর কথা।সেখানে টিচার যদি এর চেয়ে কম সময় পড়ায় সেক্ষেত্রে সম্পুর্ণ বেতন নেওয়া কি তার জন্য জায়েজ? যদি জায়েজ না হয় সেই টাকা থেকে টিচার যদি নিজের ভরনপোষণ করে তাহলে কি তার দুয়া কবুল হবে? নিজের ভুল উনি বুঝতে পারছে, এখন কি সমপরিমাণ টাকা ফেরত দিতে হবে স্টুডেন্টদেরকে? যতটকু সময় পড়ায়নি উনি ততটুকুর হিসাবে৷ উনার নিয়ত আছে এই হিসাবে টাকা ফেরত দেওয়ার কিন্তু এখন চাইলেও টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না তার পক্ষে৷এ অবস্থা কালীন কি তার দুআ কবুল হবে?যতক্ষন না টাকা ফেরত দিচ্ছে সবাইকে?
বর্তমান, অতীতে যে স্টুডেন্টদের কম সময় পড়িয়েছিল সেই হিসাবে টাকা দিতে দেরি হলে কি টিচারের দুআ কবুলের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে? এখন চাইলেও সে দিতে পারবে না সবাইকে। সময় লাগবে।তার মৃত্যুর পরে যদি তার ফ্যামিলির কেউ তার ওসিয়ত অনুসারে আদায় করে দেয় তাহলে কি দায়মুক্ত হয়ে যাবে? আর আদায় করার ক্ষেত্রে স্টুডেন্ট এর অভিভাবক যদি জিজ্ঞেস করে টাকা কেন দিচ্ছে? সেটার উত্তর দেওয়া জরুরি? কিভাবে আদায় করা উচিত?
Answer
ইলেকট্রনিক/ব্যাংকিং চাকুরি ও শিক্ষকতার বেতন সংক্রান্ত মাসায়েল
উত্তর (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী)
প্রশ্ন ১: সুদহীন কোন ব্যাংক ব্যবস্থা কি বাংলাদেশে আছে?
উত্তর:
বাংলাদেশে বর্তমানে কয়েকটি ইসলামি ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান সুদমুক্ত (ইসলামি শরিয়াহ-সম্মত) ব্যাংকিং সেবা প্রদান করছে বলে দাবী করে। তাদে দাবীর ও ইসলামী আইনের সাথে বাস্তবতার শতভাগ মিল রাখে,সেক্ষেত্রে তাদের সাথে শরীয়ত সম্মত পন্থায় লেনদন বৈধ হবে। অন্যথায় নয়।
মনে রাখতে হবে — নামে "ইসলামি" থাকলেই সম্পূর্ণ সুদমুক্ত ও শরিয়াহ-সম্মত হয়ে যায় না; প্রতিটি লেনদেনের প্রকৃতি শরিয়াহ অনুযায়ী যাচাই করা জরুরি।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে পরিচালিত ইসলামি ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি
- এক্সিম ব্যাংক (ইসলামি ব্যাংকিং শাখা)
- সোশ্যাল ইসলামি ব্যাংক
- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামি ব্যাংক
- আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক
- ইউনিয়ন ব্যাংক (ইসলামি ব্যাংকিং শাখা)
- সিটি ইসলামি ব্যাংক ইত্যাদি
প্রশ্ন ২: ব্যাংকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার পদে চাকুরি করা কি জায়েজ? বেতন হালাল?
উত্তর: সুদী কাজে সহযোগিতা থাকায় জায়েজ নেই।
মূলনীতি: আল্লাহ তা'আলা বলেন: "তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহায়তা করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)
রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদদাতা, সুদগ্রহীতা, সুদের লেখক ও সুদের সাক্ষী — সকলের উপর লানত করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৩৩৩)
প্রশ্ন ৩: স্টুডেন্টদের ১ ঘণ্টা পড়ানোর কথা, কিন্তু কম সময় পড়ালে সম্পূর্ণ বেতন নেওয়া কি জায়েজ?
উত্তর:
না, জায়েজ নয়। ইজারার (চাকুরি/সেবা চুক্তির) মূলনীতি হলো — যতটুকু কাজ করা হবে, ঠিক ততটুকুরই বেতন প্রাপ্য। চুক্তিতে ১ ঘণ্টা পড়ানোর শর্ত থাকলে ১ ঘণ্টা পড়ানো ওয়াজিব। কম পড়ালে সেই অনুপাতে বেতন কম নেওয়া আবশ্যক।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"আর তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ গ্রাস করো না।" (সূরা বাকারা: ১৮৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"যে ব্যক্তি কোনো কাজ করলো, তার প্রাপ্য বেতন তাকে দিয়ে দাও।" (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৪৪৩)
সিদ্ধান্ত: কম সময় পড়িয়ে সম্পূর্ণ বেতন নেওয়া হারাম। যতটুকু সময় কম পড়ানো হয়েছে, ততটুকুর টাকা ফেরত দেওয়া বা মাফ করানো আবশ্যক।
রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৪৯-৫০; আল-হিদায়া, কিতাবুল ইজারা; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৪, পৃ. ৪৪৫।
প্রশ্ন ৪: হারাম টাকা থেকে ভরণপোষণ করলে দুআ কবুল হবে?
উত্তর:
হারাম উপার্জন দুআ কবুলের পথে বাধা সৃষ্টি করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"হে মানুষ! আল্লাহ পবিত্র, তিনি কেবল পবিত্র বস্তুই কবুল করেন।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)
আরেক হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যে দীর্ঘ সফর করে, চুল এলোমেলো, ধুলিমলিন, আকাশের দিকে হাত তুলে বলে: "হে আমার রব! হে আমার রব!" — অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম, এবং সে হারাম দিয়ে প্রতিপালিত — এমন ব্যক্তির দুআ কীভাবে কবুল হবে? (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)
প্রশ্ন ৫: সমপরিমাণ টাকা ফেরত দিতে হবে? যতটুকু সময় পড়ায়নি ততটুকুর হিসাবে?
উত্তর:
হ্যাঁ, অবশ্যই। যতটুকু সময় পড়ানো হয়নি, ঠিক ততটুকুর বেতন ফেরত দেওয়া আবশ্যক। এটি আমানতের খেয়ানত এবং অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রাসের অন্তর্ভুক্ত।
হিসাবের পদ্ধতি:
- যদি ১ ঘণ্টার বেতন ৫০০ টাকা হয় এবং ১৫ মিনিট কম পড়ানো হয়, তবে ১২৫ টাকা ফেরত দিতে হবে।
- অর্থাৎ, মোট বেতন ÷ মোট সময় × কম পড়ানো সময় = ফেরতযোগ্য টাকা।
রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৪৯; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৪, পৃ. ৪৪৫।
প্রশ্ন ৬: টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব না হলে দুআ কবুল হবে?
উত্তর:
যদি টিচার আন্তরিকভাবে তাওবা করে, ফেরত দেওয়ার দৃঢ় সংকল্প রাখে, এবং যথাসাধ্য চেষ্টা করে কিন্তু বর্তমানে সামর্থ্য না থাকে — তবে ইনশাআল্লাহ তার দুআ কবুল হওয়ার আশা রয়েছে। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"আল্লাহ কারো উপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)
তবে শর্ত হলো:
- তাওবা করতে হবে — অন্তর থেকে।
- ফেরত দেওয়ার দৃঢ় সংকল্প থাকতে হবে — যখনই সামর্থ্য হবে, ফেরত দেবে।
- যাদের পাওনা, তাদের জানানো বা ওসিয়ত করা — যাতে মৃত্যুর পরও আদায় হয়।
- অতিরিক্ত নফল ইবাদত, সদকা, ইস্তিগফার — যতক্ষণ পাওনা আদায় না হয়, ততক্ষণ বেশি বেশি ইস্তিগফার ও নফল ইবাদত করা।
রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ২৬০; ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৫২০।
প্রশ্ন ৭: অতীতে কম সময় পড়ানোর টাকা দিতে দেরি হলে দুআ কবুলের পথে বাধা হবে?
উত্তর:
হ্যাঁ, বাধা হতে পারে — যদি ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করা হয় বা অবহেলা করা হয়। তবে যদি সামর্থ্যের অভাবে দেরি হয় এবং ফেরত দেওয়ার দৃঢ় সংকল্প থাকে, তবে তা দুআ কবুলের পথে বাধা হবে না, ইনশাআল্লাহ।
তবে করণীয়:
- যাদের পাওনা, তাদের তালিকা তৈরি করুন।
- যতটুকু সম্ভব, অল্প অল্প করে ফেরত দেওয়া শুরু করুন।
- যাদের এখনই দেওয়া সম্ভব নয়, তাদের জানিয়ে দিন বা ওসিয়ত করে রাখুন।
প্রশ্ন ৮: মৃত্যুর পর পরিবারের কেউ ওসিয়ত অনুসারে আদায় করে দিলে দায়মুক্ত হবে?
উত্তর:
হ্যাঁ, দায়মুক্ত হবে — যদি ওসিয়ত অনুসারে পাওনাদারদের টাকা আদায় করে দেওয়া হয়। ইসলামি শরিয়াতে ঋণ ও আমানত আদায় করা মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে আবশ্যক।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"মুমিনের আত্মা তার ঋণের কারণে ঝুলন্ত থাকে, যতক্ষণ না তা আদায় করা হয়।" (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১০৭৮)
তবে শর্ত:
- ওসিয়ত সঠিকভাবে করতে হবে — কাকে কত টাকা দিতে হবে, তা লিখে রাখতে হবে।
- ওয়ারিশদের জানাতে হবে — যাতে তারা আদায় করে।
- মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে ওসিয়ত কার্যকর — তবে ঋণ/পাওনা হলে সম্পূর্ণ সম্পত্তি থেকেই আদায় করতে হবে, এক-তৃতীয়াংশের সীমা প্রযোজ্য নয়।
রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ২৬০-২৬৫; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৬, পৃ. ৯০।
প্রশ্ন ৯: আদায় করার সময় স্টুডেন্টের অভিভাবক জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেওয়া জরুরি?
উত্তর:
হ্যাঁ, উত্তর দেওয়া জরুরি — তবে বিবেকসম্মত ও শরিয়াহ-সম্মতভাবে। কারণ:
- সততা ও স্বচ্ছতা ইসলামের শিক্ষা।
- মিথ্যা বলা যাবে না — কারণ মিথ্যা হারাম।
- কিন্তু অপ্রয়োজনে বিস্তারিত জানানো জরুরি নয় — সংক্ষেপে বলা যেতে পারে: "আপনার সন্তানকে কম সময় পড়ানোর কারণে যে টাকা প্রাপ্য ছিল, তা ফেরত দিচ্ছি।"
যদি অভিভাবক জিজ্ঞেস করে, তবে সত্য কথা বলা আবশ্যক। লুকিয়ে রাখা বা মিথ্যা বলা জায়েজ নয়।
প্রশ্ন ১০: কিভাবে আদায় করা উচিত?
উত্তর:
আদায়ের সঠিক পদ্ধতি:
- তালিকা তৈরি করুন: কোন স্টুডেন্টের কত টাকা পাওনা, তা লিখে রাখুন।
- অগ্রাধিকার নির্ধারণ করুন: যাদের পাওনা বেশি বা যারা বেশি প্রয়োজনীয়, তাদের আগে দিন।
- কিস্তিতে দিন: একসাথে সম্ভব না হলে, কিস্তিতে দিন।
- প্রমাণ রাখুন: টাকা দেওয়ার সময় রশিদ বা সাক্ষী রাখুন।
- দুআ করুন: আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং পাওনা আদায়ের তাওফিক চান।
- সদকা করুন: যতক্ষণ পাওনা আদায় না হয়, ততক্ষণ নফল সদকা ও ইস্তিগফার করুন।
- ওসিয়ত করুন: মৃত্যুর আগে ওসিয়ত করে যান, যাতে পরিবার আদায় করে দেয়।
রেফারেন্স: ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ৩, পৃ. ৫২০-৫২৫; ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ৩০০।