ইউনিভার্দিটিতে ফ্রি মিসিং ক্লাস নজরের হিফাজিত

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 6608
Questioner: Md Abid
Question Asked: 09 Oct 2026, 12:19 PM
Reviewed & Published: 09 Oct 2026, 02:19 PM
Views: 15
Tokens: 6,736
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
আমি একজন বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষার্থী। নন-মাহরামদের সাথে অপ্রয়োজনে কথা বলা বা মেসেজ করা এড়িয়ে চলি। তবে পড়াশোনার প্রয়োজনে (প্রেজেন্টেশন ) কখনো নন-মাহরাম সহপাঠীর সাথে
অনিচ্ছা সত্তেও মেসেজে যোগাযোগ করতে হয় কারণ এটাতে আলাদা মার্ক থাকে। আমি যতটুকু সম্ভব এগুলো সীমিত রাখি।

এক্ষেত্রে শরিয়তের দৃষ্টিতে আমার করণীয় কী? কতটুকু যোগাযোগ প্রয়োজন হিসেবে গ্রহণযোগ্য, আর কতটুকু এড়িয়ে চলা উচিত?

আর নারী শিক্ষকদের ক্লাসে তাদের দিকে না তাকিয়ে থাকার চেষ্টা করলে কখনো তারা তাকাতে বলে
বা কখনো বকাও দেয়
। (আমি অবশ্য তাকাই না)তখন কী করণীয়? শরিয়তের সীমা বজায় রেখে কীভাবে ক্লাস করা উচিত?

জাযাকাল্লাহু খাইরান।

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

সংক্ষিপ্ত উত্তর:

আপনার প্রশ্নের সারমর্ম হলো—(১) পড়াশোনার প্রয়োজনে নন-মাহরাম সহপাঠীর সাথে মেসেজ/যোগাযোগের শরয়ি সীমা কী? (২) নারী শিক্ষকের ক্লাসে দৃষ্টি সংযত রাখতে গিয়ে শিক্ষক তাকাতে বললে বা বকা দিলে কী করবেন?

মূলনীতি: শরিয়তে নন-মাহরামের সাথে প্রয়োজনবিহীন কথা, মেসেজ, দেখা-সাক্ষাৎ নিষিদ্ধ। তবে প্রকৃত দ্বীনি বা দুনিয়াবি প্রয়োজন (যা শরিয়ত স্বীকৃত) হলে সীমিত পরিসরে কথা বলা জায়েজ—শর্ত হলো: (ক) প্রয়োজন পরিমাণে সীমাবদ্ধ থাকা, (খ) কণ্ঠে নরম-মিষ্টি ভাব না আনা, (গ) দৃষ্টি সংযত রাখা, (ঘ) নির্জনতা (খালওয়া) এড়ানো, (ঙ) অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত আলাপ না করা।


১. নন-মাহরাম সহপাঠীর সাথে পড়াশোনার প্রয়োজনে যোগাযোগ

কুরআনের দলিল

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ... وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ "মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে, লজ্জাস্থানের হেফাজত করে... এবং তারা যেন নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে... এবং যেন মাটিতে সজোরে পদচারণা না করে।" (সূরা আন-নূর: ৩১)

وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ ۚ ذَٰلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ "তোমরা তাদের কাছে কোনো কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাও। এটাই তোমাদের ও তাদের অন্তরের জন্য অধিক পবিত্র।" (সূরা আল-আহযাব: ৫৩)

হাদিসের দলিল

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ "আমি আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর কোনো ফিতনা রেখে যাইনি।" (সহিহ বুখারি: ৫০৯৬, সহিহ মুসলিম: ২৭৪০)

الْعَيْنَانِ تَزْنِيَانِ وَزِنَاهُمَا النَّظَرُ "দুই চোখও যিনা করে, আর তার যিনা হলো (হারাম) দৃষ্টি।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৫২)

হানাফি ফিকহের বিধান

রদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:

"নন-মাহরাম নারীর সাথে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলা নিষিদ্ধ। আর প্রয়োজনে কথা বলার সময় কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখবে, কোমল-মিষ্টি করবে না।" (রদ্দুল মুহতার: ৫/২৩৭, কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা)

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:

"যুবক-যুবতীর মধ্যে প্রয়োজন ছাড়া কথাবার্তা মাকরূহ তাহরিমি। আর কামভাব বা ফিতনার আশঙ্কা থাকলে তা সম্পূর্ণ হারাম।" (ফাতাওয়া আলমগিরি: ৫/৩২৯)

ফাতাওয়া উসমানি-তে মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:

"আজকের যুগে মোবাইল, ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নন-মাহরামের সাথে যোগাযোগের ফিতনা অনেক বেশি। প্রয়োজন ছাড়া একটি মেসেজও জায়েজ নয়। আর প্রয়োজন থাকলে সংক্ষিপ্ত, ভদ্র ও সীমিত রাখতে হবে; কোনো অবস্থাতেই গল্প-গুজব, ইমোশনাল আলাপ বা ব্যক্তিগত বিষয়ে আলোচনা করা যাবে না।" (ফাতাওয়া উসমানি: ৩/৪৪৫-৪৪৭)

আপনার করণীয় (ব্যবহারিক নির্দেশনা)

| বিষয় | বিধান | |---|---| | পড়াশোনার প্রয়োজনবিহীন মেসেজ | হারাম/নাজায়েজ | | প্রকৃত প্রয়োজনীয় মেসেজ (গ্রুপ প্রজেক্ট, মার্কের কাজ) | জায়েজ, তবে শর্তসাপেক্ষ | | মেসেজে সালাম-কলাম, হাসি-ঠাট্টা, ইমোজি | নিষিদ্ধ | | ব্যক্তিগত/অপ্রয়োজনীয় আলাপ | নিষিদ্ধ | | প্রয়োজন শেষে যোগাযোগ বন্ধ করা | কর্তব্য | | কণ্ঠ নরম-মিষ্টি করা (ভয়েস মেসেজে) | নিষিদ্ধ | | নির্জনে দেখা বা একান্তে কথা | নিষিদ্ধ (খালওয়া) |

বিশেষভাবে লক্ষণীয়: আপনি লিখেছেন "এটাতে আলাদা মার্ক থাকে"—এটি শরিয়তের দৃষ্টিতে প্রয়োজন হিসেবে গ্রহণযোগ্য, কারণ এতে আপনার দ্বীনি বা দুনিয়াবি বৈধ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। তবে শর্ত হলো:

  1. প্রয়োজন পরিমাণে সীমাবদ্ধ রাখুন — যেমন আপনি করছেন, আলহামদুলিল্লাহ।
  2. কথাবার্তা শুধু কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখুন — "কেমন আছেন", "খেয়াল রাখবেন", "আজ অনেক ভালো লাগছে" ইত্যাদি বাদ দিন।
  3. সম্ভব হলে গ্রুপ চ্যাট বা পাবলিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করুন — একান্তে (private) মেসেজ এড়িয়ে চলুন।
  4. ভয়েস মেসেজ বা কল এড়িয়ে চলুন — লেখার মাধ্যমে যোগাযোগ নিরাপদ।
  5. রাতে বা অপ্রয়োজনীয় সময়ে যোগাযোগ এড়িয়ে চলুন।
  6. নিজের অন্তরে কামভাব বা আকর্ষণ অনুভব করলে সাথে সাথে যোগাযোগ বন্ধ করুন — কারণ তখন তা হারাম হয়ে যায়।

ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভি (রহ.) বলেন: "নন-মাহরামের সাথে প্রয়োজনীয় কথাবার্তাও সংক্ষিপ্ত হবে, যেন তা ফিতনার দরজা না খোলে।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/৩৬৭)


২. নারী শিক্ষকের ক্লাসে দৃষ্টি সংযত রাখা

মূলনীতি

ইসলামে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই দৃষ্টি সংযত রাখা ফরজ। আল্লাহ বলেন:

قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ "মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র।" (সূরা আন-নূর: ৩০)

হানাফি ফিকহের বিধান

রদ্দুল মুহতার-এ আছে:

"নন-মাহরাম নারীর দিকে কামভাব ছাড়া প্রথম দৃষ্টি পড়া ক্ষমাযোগ্য, কিন্তু দ্বিতীয়বার দেখা বা স্থির দৃষ্টিতে তাকানো নিষিদ্ধ।" (রদ্দুল মুহতার: ৫/২৩৬)

বাহিশতী জেওর-এ থানভি (রহ.) বলেন:

"নন-মাহরামের দিকে তাকানো থেকে চোখ বন্ধ রাখা বা দৃষ্টি নামিয়ে নেওয়া কর্তব্য। তবে প্রয়োজনবশত (যেমন সাক্ষী, চিকিৎসা, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ) সীমিত পরিমাণে দেখা জায়েজ।" (বাহিশতী জেওর, বয়ান-১)

আপনার পরিস্থিতির সমাধান

আপনি লিখেছেন—নারীর দিকে না তাকানোর চেষ্টা করলে শিক্ষক তাকাতে বলেন বা বকা দেন। এমতাবস্থায় করণীয়:

১. শিক্ষকের নির্দেশ মানার ক্ষেত্রে: শিক্ষকের কথা শোনা ও তার নির্দেশ মানা সাধারণত কর্তব্য, তবে তা শরিয়তবিরোধী হলে নয়। কিন্তু এখানে লক্ষণীয়—শিক্ষক যদি বলেন "আমার দিকে তাকাও" বা "মনোযোগ দাও", তাহলে আপনি তার মুখের দিকে নয়, বরং তার সামনের বোর্ড, বই বা ডেস্কের দিকে তাকিয়ে মনোযোগ দিতে পারেন। এতে শিক্ষকের নির্দেশও পালিত হবে, দৃষ্টিও সংযত থাকবে।

২. বকা দেওয়ার ক্ষেত্রে: ধৈর্য ধরুন, ভদ্রভাবে দুঃখ প্রকাশ করুন। শরিয়তের সীমা রক্ষা করাই অগ্রগণ্য। তবে বিনয়ের সাথে বোঝানোর সুযোগ থাকলে বলতে পারেন—"স্যার/ম্যাডাম, আমি মনোযোগ দিচ্ছি, শুধু নোট লিখছি/বোর্ড দেখছি।"

৩. দৃষ্টির সীমা:

| অবস্থা | বিধান | |---|---| | কামভাব ছাড়া প্রথম দৃষ্টি | ক্ষমাযোগ্য | | স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা | নিষিদ্ধ | | কামভাব নিয়ে দেখা | হারাম | | পড়াশোনার প্রয়োজনে বোর্ড/বই দেখা | জায়েজ | | শিক্ষকের মুখের দিকে বারবার তাকানো | এড়িয়ে চলুন | | শিক্ষকের নির্দেশে সাময়িক দেখা | জায়েজ (প্রয়োজন পরিমাণ) |

৪. ব্যবহারিক কৌশল:

  • ক্লাসে সামনের দিকে বা বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকুন।
  • নোট লেখায় মনোযোগ দিন।
  • শিক্ষক প্রশ্ন করলে উত্তর দেওয়ার সময় সংক্ষিপ্তভাবে তাকিয়ে আবার দৃষ্টি নামিয়ে নিন।
  • শিক্ষকের সাথে একান্তে (office hours-এ) দেখা এড়িয়ে চলুন; সম্ভব হলে দরজা খোলা রাখুন বা অন্য কেউ উপস্থিত থাকুক।
  • ক্লাসের বাইরে অপ্রয়োজনীয় আলাপ এড়িয়ে চলুন।

মা'আরিফুল কুরআন-এ মুফতি মুহাম্মদ শাফি (রহ.) সূরা আন-নূরের ৩০ নম্বর আয়াতের তাফসিরে বলেন: "দৃষ্টি সংযত রাখা মানে চোখ বন্ধ করা নয়, বরং নন-মাহরামের দিকে কামভাব ও স্থির দৃষ্টিতে না তাকানো। প্রয়োজনীয় দেখা জায়েজ, কিন্তু তা যেন ফিতনার কারণ না হয়।" (মা'আরিফুল কুরআন: ৬/৩৫৩)


সারসংক্ষেপ ও আমলি নির্দেশনা

  1. পড়াশোনার প্রয়োজনীয় যোগাযোগ জায়েজ, তবে সংক্ষিপ্ত, ভদ্র ও কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখুন।
  2. অপ্রয়োজনীয় মেসেজ, হাসি-ঠাট্টা, ব্যক্তিগত আলাপ সম্পূর্ণ বন্ধ করুন।
  3. একান্তে (private) মেসেজের বদলে গ্রুপ চ্যাট ব্যবহার করুন।
  4. ভয়েস মেসেজ/কল এড়িয়ে চলুন।
  5. নারী শিক্ষকের ক্লাসে বোর্ড/বইয়ে মনোযোগ দিন, মুখে স্থির দৃষ্টি নয়।
  6. শিক্ষক তাকাতে বললে সংক্ষিপ্তভাবে তাকিয়ে আবার দৃষ্টি নামিয়ে নিন।
  7. বকা দিলে ধৈর্য ধরুন, শরিয়তের সীমা রক্ষা করুন।
  8. নিজের অন্তরে কামভাব জাগলে সাথে সাথে যোগাযোগ ও দৃষ্টি বন্ধ করুন।
  9. নিয়মিত তাওবা-ইস্তিগফার করুন এবং আল্লাহর কাছে হেফাজতের দোয়া করুন:

اللَّهُمَّ اصْرِفْ عَنِّي السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ "হে আল্লাহ! আমার থেকে মন্দ ও অশ্লীলতা দূর করে দিন।"

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে দৃষ্টি, কণ্ঠ ও অন্তরের হেফাজত করার তাওফিক দান করুন। আমিন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


রেফারেন্স তালিকা:

  • আল-কুরআন: সূরা আন-নূর ৩০-৩১, সূরা আল-আহযাব ৫৩
  • সহিহ বুখারি: ৫০৯৬
  • সহিহ মুসলিম: ২৭৪০
  • সুনানে আবু দাউদ: ২১৫২
  • রদ্দুল মুহতার: ৫/২৩৬-২৩৭
  • ফাতাওয়া আলমগিরি: ৫/৩২৯
  • ফাতাওয়া উসমানি: ৩/৪৪৫-৪৪৭
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/৩৬৭
  • মা'আরিফুল কুরআন: ৬/৩৫৩
  • বাহিশতী জেওর, বয়ান-১

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.