হজ ও উমরাহর তাওয়াফ কি বাবা-মা বা ভাই-বোনের জন্য নিয়ত করা যায়?
Hajj and Umrah · Hanafi
Question
আমার প্রশ্ন আমরা যে হজে গিয়ে তাওয়াফ করি এটা কি আমি আমার বাবা-মা বা ভাই- বোনের জন্য কি নিয়ত করে একটা একটা করতে পারবো । যে আমি এই তাওয়াফটা আমার বাবার জন্য করছি এভাবে নিয়ত করে কি করতে পারবো। মিন ফাদ্বলিক।
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের সারমর্ম: হজ বা উমরাহর সময় নিজের তাওয়াফ আদায় করার পাশাপাশি বাবা-মা বা ভাই-বোনের জন্য আলাদা আলাদা তাওয়াফ করার নিয়ত করা কি বৈধ? যেমন—"এই তাওয়াফটি আমি আমার বাবার জন্য করছি" এভাবে নিয়ত করা কি শরীয়তসম্মত?
উত্তর:
হজ বা উমরাহর সফরে গিয়ে নিজের হজ/উমরাহর অংশ হিসেবে যে তাওয়াফ (তাওয়াফুল কুদুম, তাওয়াফুল ইফাদা, তাওয়াফুল বিদা, বা উমরাহর তাওয়াফ) আদায় করা হয়—সেটি কারও পক্ষ থেকে নিয়ত করা যায় না। কারণ এগুলো নিজের হজ/উমরাহর অবিচ্ছেদ্য অংশ (আরকান/ওয়াজিবাত)। এগুলো অন্যের পক্ষ থেকে আদায় করলে নিজের হজ/উমরাহই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
তবে হ্যাঁ, নফল তাওয়াফ করা যায় এবং সেটি অন্যের পক্ষ থেকে (বাবা-মা, ভাই-বোন, মৃত-জীবিত যে কারও জন্য) নিয়ত করে করা জায়েজ ও সওয়াবের কাজ। এভাবে নিয়ত করা যাবে: "হে আল্লাহ! আমি এই নফল তাওয়াফটি আমার বাবার (বা মায়ের/ভাই/বোনের) জন্য আদায় করছি, আপনি তা কবুল করুন এবং তার রুহের প্রতি সওয়াব পৌঁছান।"
দলিল:
১. আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأَتِمُّوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلَّهِ "আর আল্লাহর জন্য হজ ও উমরাহ পূর্ণ করো।" (সূরা বাকারা: ১৯৬)
এই আয়াত প্রমাণ করে হজ ও উমরাহর আরকান নিজের জন্য আদায় করা ফরজ—অন্যের পক্ষ থেকে নয়।
২. রাসূলুল্লাহ ﷺ হজের সময় নিজে তাওয়াফ করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও নিজ নিজ হজের তাওয়াফ করতে শিখিয়েছেন; কারও পক্ষ থেকে হজের তাওয়াফ করার নির্দেশ দেননি। (সহিহ বুখারি: ১৬১১, সহিহ মুসলিম: ১২১৮)
৩. হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করল, "আমার মা হজ করতে মানত করেছিলেন, কিন্তু হজ করার আগেই মারা গেছেন; আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ করব?" রাসূল ﷺ বললেন: "হ্যাঁ, তার পক্ষ থেকে হজ করো।" (সহিহ বুখারি: ১৮৫২)
এখানে হজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে—কিন্তু হজের ভেতরের তাওয়াফ আলাদা করে অন্যের জন্য নিয়ত করার কথা কোথাও নেই।
হানাফি ফিকহের বক্তব্য:
- বাদায়েউস সানায়ে ও আল-হিদায়া-তে উল্লেখ আছে, হজের আরকান আদায়কারী নিজেই আদায় করবে; নিয়াবত (প্রতিনিধিত্ব) শুধু ইহরাম বাঁধা ও হজের মূল কাজে সামগ্রিকভাবে প্রযোজ্য, আলাদা আলাদা তাওয়াফে নয়।
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন) ও ফাতাওয়া আলমগিরি-তে বলা হয়েছে: "নফল তাওয়াফ অন্যের পক্ষ থেকে করা যায় এবং তার সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছায়।" (রাদ্দুল মুহতার: ২/৫০০-এর কাছাকাছি; ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/২২৪)
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি) ও ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভি) —এতে স্পষ্ট করা হয়েছে: হজের ফরজ/ওয়াজিব তাওয়াফ নিজের জন্য; নফল তাওয়াফ ও তিলাওয়াত, দান-সদকা, দুআ ইত্যাদি অন্যের জন্য করা যায় এবং সওয়াব পৌঁছানো যায়।
- বেহেশতী জেওর-এ হজ অধ্যায়ে বলা হয়েছে: "নফল তাওয়াফ করিয়া মৃত ব্যক্তির জন্য সওয়াব পৌঁছানো যায়।"
সারসংক্ষেপ:
| বিষয় | হুকুম | |---|---| | নিজের হজ/উমরাহর তাওয়াফ অন্যের জন্য নিয়ত করা | জায়েজ নয়; নিজের হজ/উমরাহ নষ্ট হবে | | নফল তাওয়াফ বাবা-মা/ভাই-বোনের জন্য নিয়ত করা | জায়েজ; সওয়াব পৌঁছাবে | | মৃত ব্যক্তির জন্য নফল তাওয়াফ/দান/দুআ | জায়েজ ও মুস্তাহাব |
পরামর্শ: আপনি নিজের হজ/উমরাহর তাওয়াফগুলো নিজের জন্য আদায় করুন।
এরপর সময় পেলে বাবা-মা বা ভাই-বোনের জন্য আলাদা করে নফল তাওয়াফ করুন এবং প্রতিবার নিয়ত করুন—"হে আল্লাহ, এই তাওয়াফ আমার বাবার জন্য।"
এতে সওয়াব পৌঁছাবে এবং আপনি নিজের হজও পূর্ণভাবে আদায় করতে পারবেন।
والله أعلم بالصواب