বাসায় বালেগা ভাতিজিদের সামনে অপরিচিত পুরুষ আনা কি শরীয়তসম্মত? পর্দার বিধান, তাওবার নিয়ম ও করণীয় সম্পর্কে জানতে চাই?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: আপনার করণীয় কী?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনার বাসায় আপনার বালেগা (প্রাপ্তবয়স্কা) ভাতিজিরা তাদের শিক্ষিকার কাছে পড়ছিল। এমন সময় আপনি একজন অপরিচিত পুরুষকে বাসার কাজের জন্য আসতে বলেন। আপনার গাফিলতির কারণে ভাতিজি নিজেই দরজা খুলে দেয়, এবং আপনি সেই তরুণকে ভাতিজিদের সামনে দিয়ে বাসার ভেতরে এনে কাজ করান। বিষয়টি আপনার কাছে খুব খারাপ লেগেছে, তাই কাজ বাকি থাকতেই তাকে বিদায় করেন। এখন আপনি আশঙ্কা করছেন যে এটি আল্লাহর দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় ও গাফিলতির কাজ হয়েছে। আপনার করণীয় কী?
শরীয়তের দৃষ্টিতে বিষয়টির বিশ্লেষণ
১. পর্দার বিধান (হিজাব)
আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেন:
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا
"আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে; আর তারা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না..." (সূরা আন-নূর: ৩১)
وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ ۚ ذَٰلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ
"আর যখন তোমরা তাদের কাছে কোনো কিছু চাও, পর্দার আড়াল থেকে চাও; এটা তোমাদের অন্তর ও তাদের অন্তরের জন্য অধিক পবিত্র।" (সূরা আল-আহযাব: ৫৩)
২. হাদীসের আলো
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ
"আমি আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর কোনো ফিতনা রেখে যাইনি।" (সহীহ বুখারী: ৫০৯৬, সহীহ মুসলিম: ২৭৪০)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ
"কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে মিলিত হবে না, তবে তাদের তৃতীয়জন হবে শয়তান।" (সুনানে তিরমিযী: ২১৬৫)
৩. হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন (রহ.) উল্লেখ করেন:
"নারীদের সাথে পুরুষদের মেলামেশা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা কর্তব্য, বিশেষত যখন ফিতনার আশঙ্কা থাকে।" (রাদ্দুল মুহতার: ৫/২৩৭)
ফাতাওয়া আলমগীরী-তে বর্ণিত আছে:
"যদি কোনো পুরুষ অপরিচিত নারীর দিকে তাকায় বা তার সাথে কথা বলে ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তবে তা নিষিদ্ধ।" (ফাতাওয়া আলমগীরী: ৫/৩২৮)
ফাতাওয়া উসমানী-তে মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেন:
"ঘরে অপরিচিত পুরুষের আগমন-প্রস্থান নারীদের পর্দার বিধানের পরিপন্থী। মুসলিম পরিবারে এ বিষয়ে সতর্ক থাকা অপরিহার্য।" (ফাতাওয়া উসমানী: ২/৩৩৫)
আপনার কাজের মূল্যায়ন
আপনি যা করেছেন, তা নিম্নলিখিত কারণে শরীয়তের দৃষ্টিতে গাফিলতি ও ভুল ছিল:
-
অপরিচিত পুরুষকে ঘরে আনা: যেখানে বালেগা নারীরা উপস্থিত, সেখানে অপরিচিত পুরুষকে ঘরে আনা পর্দার বিধানের পরিপন্থী।
-
ভাতিজির দরজা খোলা: আপনার গাফিলতির কারণে বালেগা ভাতিজি নিজেই দরজা খুলে দিয়েছে, যা আরও বেশি সতর্কতার বিষয় ছিল।
-
ভাতিজিদের সামনে দিয়ে যাওয়া: সেই পুরুষকে ভাতিজিদের সামনে দিয়ে ঘরে আনা ফিতনার দরজা খোলার শামিল।
-
কাজ করানো: ঘরে অপরিচিত পুরুষকে দিয়ে কাজ করানো, যখন বালেগা নারীরা ঘরে আছে, তা শরীয়তসম্মত নয়।
তবে আপনি আলহামদুলিল্লাহ, বিষয়টি বুঝতে পেরে তাকে বিদায় করেছেন এবং অনুতপ্ত হয়েছেন — এটি ঈমানের আলামত।
আপনার করণীয়
১. তাওবা ও ইস্তিগফার
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
"আর হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" (সূরা আন-নূর: ৩১)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
كُلُّ ابْنِ آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
"প্রত্যেক আদম সন্তানই ভুল করে, আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম তারা, যারা তাওবা করে।" (সুনানে তিরমিযী: ২৪৯৯)
করণীয়: আন্তরিকভাবে তাওবা করুন, ইস্তিগফার করুন, এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ থেকে বিরত থাকার দৃঢ় সংকল্প করুন।
২. ভবিষ্যতে সতর্কতা অবলম্বন
- অপরিচিত পুরুষকে ঘরে আসতে দেবেন না — বিশেষত যখন বালেগা নারীরা ঘরে থাকে।
- দরজা খোলার বিষয়ে সতর্কতা: বালেগা নারীরা যেন নিজে দরজা না খোলে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
- কাজের প্রয়োজন হলে: পুরুষকে বাইরে রেখে কাজ করান, অথবা এমন সময়ে আসতে বলুন যখন নারীরা ঘরে না থাকে।
- পর্দার ব্যবস্থা: ঘরে পর্দার পূর্ণ ব্যবস্থা রাখুন।
৩. পরিবারের সদস্যদের সচেতন করা
আপনার ভাতিজিদের এবং পরিবারের অন্যদের পর্দার বিধান সম্পর্কে সচেতন করুন। তাদের বোঝান যে, অপরিচিত পুরুষের সামনে আসা-যাওয়া করা যাবে না।
৪. শিক্ষিকার বিষয়ে সতর্কতা
শিক্ষিকা যদি বালেগা হন, তবে তার সাথে দেখা-সাক্ষাতের সময়ও পর্দার বিধান মানতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষিকা মহিলা হবেন, অথবা অনলাইনে পড়াশোনার ব্যবস্থা করবেন।
৫. সদকা ও দান
কিছু উলামায়ে কেরাম বলেন, ভুলের কাফফারা হিসেবে সদকা করা উত্তম। আপনি কিছু সদকা করুন, ইনশাআল্লাহ তা আপনার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত হবে।
বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ
আপনি লিখেছেন: "আমার মনে বিষয় টা খুব ই খারাপ লাগায়" — এটি আপনার হৃদয়ে আল্লাহর ভয় ও তাকওয়ার প্রমাণ। আলহামদুলিল্লাহ, আপনি বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন এবং অনুতপ্ত হয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও ভালোবাসেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২২২)
আপনার এই অনুশোচনা ইতিবাচক লক্ষণ। এখন আন্তরিক তাওবা করুন এবং ভবিষ্যতে সতর্ক থাকুন।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | করণীয় | |------|--------| | তাওবা | আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া | | ইস্তিগফার | বেশি বেশি ইস্তিগফার করা | | ভবিষ্যতে সতর্কতা | অপরিচিত পুরুষকে ঘরে না আনা | | পর্দা | ঘরে পূর্ণ পর্দার ব্যবস্থা করা | | পরিবার | ভাতিজিদের সচেতন করা | | সদকা | কিছু সদকা করা (ঐচ্ছিক) |
মূল কথা: আপনি ভুল করেছেন, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা ক্ষমাশীল। আন্তরিক তাওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন। ভবিষ্যতে এমন গাফিলতি থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। আমীন।
রেফারেন্স
- আল-কুরআন: সূরা আন-নূর (২৪:৩১), সূরা আল-আহযাব (৩৩:৫৩), সূরা আল-বাকারা (২:২২২)
- সহীহ বুখারী: ৫০৯৬
- সহীহ মুসলিম: ২৭৪০
- সুনানে তিরমিযী: ২১৬৫, ২৪৯৯
- রাদ্দুল মুহতার: ৫/২৩৭
- ফাতাওয়া আলমগীরী: ৫/৩২৮
- ফাতাওয়া উসমানী: ২/৩৩৫
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/৩৯০
- বেহেশতী জেওর: পর্দার অধ্যায়
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে তাঁর হুকুম মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।