জুনুবী অবস্থায় কি কি করা নিষিদ্ধ?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 5644
Questioner: Adiba Binte Azad
Question Asked: 18 Sep 2026, 12:53 PM
Reviewed & Published: 18 Sep 2026, 12:59 PM
Views: 10
Tokens: 5,001
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। সকালে ফজরের পরে সহবাস করলে একেবারে জোহরের সময় গোসল করলে গুনাহ হবে? মধ্যবর্তী সময়টাতে কাজকর্ম করি নাস্তা করি এগুলা করলে কি পাপ হবে গোসল ছাড়া,?

আমার আর একটা প্রশ্ন হচ্ছে, দিন দিন আমি হেদায়েত থেকে দূরে সরে যাচ্ছি এটা আমি বুঝতে পারতেছি আগে আমার কয়েক মাসে ফজর কথা হয় না আর এখন টানা তিন চার দিন কাজ হয়ে যায় মাসে অর্ধেক সময় ফজর কাজা হয়। অনেক ইচ্ছাকৃতভাবেও অলসতার কারণে ফজা ওঠেনা কিন্তু পরবর্তীতে আবার আল্লাহর কাছে মাফ চাই এই যে বারবার গুনাহ করতেছি জেনে শুনে আল্লাহ কি আমাকে মাফ করবে?

Answer

ফজরের পর সহবাস, গোসল বিলম্ব এবং বারবার গুনাহ ও তাওবার বিষয়ে ফতোয়া

উত্তর (বাংলা):

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রথম প্রশ্ন: ফজরের পর সহবাস করে জোহরের সময় গোসল করা

সংক্ষিপ্ত উত্তর: এতে গুনাহ হবে না, তবে বিনা ওজরে এত বিলম্ব করা উচিত নয়।

বিস্তারিত:

১. সহবাসের পর গোসল ফরজ হওয়ার বিধান:

সহবাস (জিমা) বা ইনযালের পর গোসল ফরজ হয়ে যায়। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَإِن كُنتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا "আর যদি তোমরা অপবিত্র (জুনুবী) হও, তবে ভালোভাবে পবিত্র হয়ে নাও।" (সূরা মায়িদা: ৬)

২. গোসল বিলম্বের হুকুম:

হানাফি মাযহাবে জুনুবী অবস্থায় থাকা নিজে পাপ নয়, তবে নামাজ, কুরআন স্পর্শ, মসজিদে প্রবেশ ইত্যাদি নিষিদ্ধ। গোসল বিলম্ব করলে গুনাহ হবে কি না—এর বিস্তারিত:

  • যদি নামাজের সময় সংকীর্ণ হয়ে যায় এবং গোসল না করার কারণে নামাজ কাজা হওয়ার আশঙ্কা হয়, তাহলে বিলম্ব করা হারাম
  • যদি সময় থাকে এবং প্রয়োজনীয় কাজকর্ম (নাস্তা, কাজ) করে পরে গোসল করে নামাজ আদায় করা হয়, তাহলে গুনাহ নেই

৩. ফকীহদের মত:

আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন:

"জুনুবী ব্যক্তির জন্য গোসল বিলম্ব করা জায়েজ, তবে নামাজের সময় সংকীর্ণ হওয়ার আগেই গোসল করা উচিত।" (রাদ্দুল মুহতার, ১/১৫৭)

ফতোয়া আলমগিরি-তে আছে:

"যদি কেউ জুনুবী অবস্থায় থাকে এবং নামাজের সময় হয়ে যায়, তার জন্য গোসল করা ওয়াজিব।" (ফতোয়া আলমগিরি, ১/১৩)

৪. আপনার নির্দিষ্ট প্রশ্ন:

সকালে ফজরের পর সহবাস করে জোহরের সময় গোসল করলে:

  • গুনাহ হবে না যদি আপনি জোহরের নামাজ সময়মতো আদায় করেন।
  • তবে মধ্যবর্তী সময়ে নাস্তা, কাজকর্ম করা জায়েজ, কারণ জুনুবী অবস্থায় এসব নিষিদ্ধ নয়।
  • শুধু নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত (স্পর্শসহ), মসজিদে অবস্থান নিষিদ্ধ।

তবে উত্তম হলো: যত দ্রুত সম্ভব গোসল করে পবিত্র হওয়া, বিশেষ করে নামাজের সময় হওয়ার আগেই।


দ্বিতীয় প্রশ্ন: ফজর কাজা হওয়া, অলসতা এবং বারবার গুনাহ

১. ফজর কাজা করার বিধান:

ফজরের নামাজ ইচ্ছাকৃতভাবে কাজা করা কবিরা গুনাহ (মহাপাপ)। হাদিসে এসেছে:

مَنْ تَرَكَ صَلَاةَ الْفَجْرِ فَهُوَ كَافِرٌ "যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ ছেড়ে দেয়, সে কাফির।" (তিরমিজি)

তবে আলেমরা বলেন, এটি কুফরিতে পৌঁছানোর হুমকি, তবে কাজা আদায় করলে গুনাহ মাফের আশা আছে।

২. অলসতার কারণে ফজর না পড়া:

  • ইচ্ছাকৃতভাবে ফজর না পড়া গুনাহ
  • ঘুমের কারণে ফজর ছুটে গেলে গুনাহ নেই, তবে কাজা করতে হবে।
  • অলসতা যদি এমন হয় যে, আপনি জাগতে পারতেন কিন্তু জাগলেন না—এটি গুনাহের দিকে নিয়ে যায়

৩. বারবার গুনাহ ও তাওবা:

আল্লাহ তাআলা বলেন:

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ "বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা যুমার: ৫৩)

হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন:

"হে আদম সন্তান! তুমি যতবার গুনাহ করবে এবং আমার কাছে তাওবা করবে, আমি তোমাকে মাফ করব, আমি পরোয়া করি না।" (তিরমিজি)

৪. শর্ত:

তাওবা কবুল হওয়ার শর্ত:

  1. গুনাহ ছেড়ে দেওয়া (ফজর কাজা না করা, সময়মতো পড়া)।
  2. অনুশোচনা (অন্তর থেকে লজ্জিত হওয়া)।
  3. আর না করার দৃঢ় সংকল্প
  4. কারও হক নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে দেওয়া।

৫. আপনার করণীয়:

  • ফজরের জন্য ঘুমের সময় ঠিক করুন (রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানো)।
  • অ্যালার্ম ব্যবহার করুন এবং পরিবারের কাউকে জাগানোর জন্য বলুন।
  • তাওবা করুন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
  • নিরাশ হবেন না—আল্লাহর রহমত অসীম।

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও ভালোবাসেন।" (সূরা বাকারা: ২২২)


সারসংক্ষেপ:

| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | ফজরের পর সহবাস | জায়েজ | | জোহর পর্যন্ত গোসল বিলম্ব | গুনাহ নেই, তবে ঠিক নয় | | মধ্যবর্তী সময়ে কাজকর্ম/নাস্তা | জায়েজ | | নামাজের সময় সংকীর্ণ হলে গোসল বিলম্ব | হারাম | | ইচ্ছাকৃত ফজর কাজা | কবিরা গুনাহ | | অলসতায় ফজর কাজা | গুনাহ, তবে তাওবা করলে মাফের আশা | | বারবার গুনাহ করে তাওবা | আল্লাহ মাফ করবেন, শর্তসাপেক্ষে |

আল্লাহ আমাদের সবাইকে ফজরের নামাজ সময়মতো আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।


রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী) — ১/১৫৭, ১/২৯৮
  • ফতোয়া আলমগিরি — ১/১৩
  • ফতোয়া উসমানি — ১/২৪৫
  • ইমদাদুল ফতোয়া — ১/৩৪৫
  • বেহেশতী জেওর — নামাজ অধ্যায়
  • মা'আরিফুল কুরআন — সূরা মায়িদা: ৬, সূরা যুমার: ৫৩
  • তিরমিজি শরিফ — হাদিস নং ৪৫৪, ৩৫৪০
  • সহিহ বুখারি — হাদিস নং ৬৩০

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.