ঘুষ দিয়ে সরকারি চাকরিতে পোস্টিং নেওয়া কি জায়েয?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
ঘুষ দিয়ে পোস্টিং নেওয়া যাবে কি?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, ঘুষ দিয়ে পোস্টিং নেওয়া কোনোভাবেই জায়েয নয়। এটি সুস্পষ্ট হারাম, কবিরা গুনাহ এবং রাষ্ট্রীয় আমানতের খিয়ানত।
বিস্তারিত আলোচনা
১. ঘুষের সংজ্ঞা ও শরয়ি হুকুম
ঘুষ (রিশওয়াত) হলো—কোনো ব্যক্তিকে তার প্রাপ্য অধিকারের বাইরে বা অন্যায়ভাবে কোনো সুবিধা আদায়ের জন্য সম্পদ প্রদান করা। ইসলামে ঘুষ দেওয়া, নেওয়া এবং এর মধ্যস্থতা করা—তিনটিই হারাম।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"আর তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ গ্রাস করো না এবং জেনে-বুঝে মানুষের সম্পদের কিছু অংশ অন্যায়ভাবে খাওয়ার উদ্দেশ্যে বিচারকদের কাছে পেশ করো না।" — (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার উপর লা'নত করেছেন:
"আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার উপর লা'নত করেছেন।" — (সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৮০; সুনানে তিরমিজি: ১৩৩৭; ইবনে মাজাহ: ২৩১৩)
ইমাম তিরমিজি (রহ.) এই হাদিসকে হাসান সহিহ বলেছেন। ইমাম হাকিম (রহ.) সহিহ বলেছেন।
আরেক হাদিসে:
"আবু হুরাইরা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: 'ঘুষ গ্রহীতা ও ঘুষদাতা উভয়েই জাহান্নামে।'" — (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৮৪৩১; সহিহ আল-জামি: ২৮২৯)
২. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তাঁর ছাত্রগণ (ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ রহ.)-এর ঐকমত্য হলো—ঘুষ সর্বাবস্থায় হারাম, তা বিচারালয়ে হোক বা প্রশাসনিক কোনো কাজে হোক।
আল্লামা ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:
"ঘুষ হলো সেই সম্পদ, যা কোনো হাকিম বা কর্মচারীকে তার দায়িত্বের কাজ সঠিকভাবে করার জন্য বা অন্যায়ভাবে কোনো কাজ করানোর জন্য দেওয়া হয়। এটি হারাম।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৫, পৃ: ৩৬২)
ফাতাওয়া আলমগিরিতে আছে:
"ঘুষ নেওয়া কোনো মুসলিমের জন্য হালাল নয়, চাই সে কাজ করে দিক বা না দিক।" — (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড: ৩, পৃ: ৩৪৭)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ সূরা বাকারার ১৮৮ নং আয়াতের তাফসিরে বলেন:
"ঘুষ একটি জঘন্য পাপ। এর দ্বারা সমাজে অন্যায়, বৈষম্য ও দুর্নীতি ছড়ায়। যে ঘুষ দেয়, সে নিজের যোগ্যতা ও অধিকারকে অর্থ দিয়ে কিনতে চায়—এটি আল্লাহর দেওয়া ইনসাফের ব্যবস্থার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।"
৩. সরকারি চাকরিতে ঘুষের বিশেষ কুফল
আপনি যেহেতু সরকারি চাকুরিজীবী ডাক্তার, তাই কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়:
- আমানতের খিয়ানত: সরকারি পদ একটি আমানত। যোগ্য ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে ঘুষ দিয়ে পদ পাওয়া মানে রাষ্ট্রের আমানতের খিয়ানত।
- যোগ্যতার অপব্যবহার: এতে রোগীদের চিকিৎসার অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়, কারণ অযোগ্য ব্যক্তি বিশেষজ্ঞ হয়ে রোগীর ক্ষতি করতে পারে।
- অন্যায়ের সহযোগিতা: ঘুষ দেওয়া মানে ঘুষ গ্রহীতার অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া এবং তাকে উৎসাহিত করা।
- সমাজে দুর্নীতির বিস্তার: এতে দুর্নীতি প্রথা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।" — (সূরা আল-মায়িদা: ২)
৪. ঘুষের বিকল্প পথ
ঘুষ দেওয়া ছাড়া যোগ্যতার ভিত্তিতে পোস্টিং পাওয়ার জন্য যা করণীয়:
- আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া — রিযিক আল্লাহর হাতে।
- যোগ্যতা বৃদ্ধি করা — উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, দক্ষতা অর্জন।
- সরকারি নিয়ম-কানুন ও বিধি মেনে আবেদন করা — মেধার ভিত্তিতে।
- দুআ করা — বিশেষ করে তাহাজ্জুদে ও ফরজ নামাজের পর।
- সুদ, ঘুষ ও হারাম থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা — কারণ হারাম উপার্জন দুআ কবুল হওয়ায় বাধা দেয়।
- সরকারি তদারকি সংস্থায় অভিযোগ — যদি ঘুষ ছাড়া পোস্টিং না দেওয়া হয়, তাহলে দুর্নীতি দমন কমিশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা।
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন:
"হে আমার বান্দা! আমি তোমাকে হারাম থেকে বিরত থাকতে বলেছি, তুমি বিরত থাকো; আমি তোমার রিযিকের দায়িত্ব নিয়েছি।" — (মুসলিম শরিফের বর্ণনার অনুরূপ মর্ম)
৫. যদি ইতিমধ্যে ঘুষ দেওয়া হয়ে যায়?
যদি কেউ ইতিমধ্যে ঘুষ দিয়ে পোস্টিং নিয়ে ফেলে, তাহলে করণীয়:
- তাওবা করা — আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা, ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প।
- ঘুষের টাকা ফেরত দেওয়া — যদি সম্ভব হয়, গ্রহীতার কাছে ফেরত দেওয়া বা তার কাছে পৌঁছানো সম্ভব না হলে গরিব-মিসকিনকে সদকা করা (তবে এতে ফরজ দায়িত্ব আদায় হবে না, বরং তাওবার অংশ হিসেবে)।
- যোগ্যতা অর্জন করা — পোস্টিংয়ের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা, যাতে আমানতের খিয়ানত পূরণ হয়।
- ভবিষ্যতে বিরত থাকা — আর কখনো ঘুষের আশ্রয় না নেওয়া।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | হুকুম | |------|------| | ঘুষ দেওয়া | হারাম (কবিরা গুনাহ) | | ঘুষ নেওয়া | হারাম (কবিরা গুনাহ) | | ঘুষের মধ্যস্থতা | হারাম | | ঘুষ দিয়ে পোস্টিং নেওয়া | হারাম, আমানতের খিয়ানত | | ঘুষ ছাড়া যোগ্যতায় পোস্টিং | জায়েয ও প্রশংসনীয় |
উস্তাযের নসিহত: আপনি একজন ডাক্তার, মানুষের জীবন-মৃত্যুর সাথে যুক্ত। আপনার হাতের চিকিৎসা সরাসরি রোগীর জীবন বাঁচাতে পারে। এমন পবিত্র পেশায় ঘুষের মতো হারাম জিনিসের সংস্পর্শ আপনার ইলম, আমল ও দুআর বরকত নষ্ট করবে। আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন—তিনি রিযিকের ব্যবস্থা করবেন। হয়তো ঘুষ ছাড়া পোস্টিং পেতে দেরি হবে, কিন্তু তাতে বরকত ও হালাল রিযিকের প্রশান্তি থাকবে।
"যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং এমন জায়গা থেকে রিযিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" — (সূরা আত-তালাক: ২-৩)