পাতলা দাড়ির জন্য ওযুতে দাড়ি খিলাল করা কি জরুরি?

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 5586
Questioner: Sadman
Question Asked: 17 Sep 2026, 10:17 AM
Reviewed & Published: 17 Sep 2026, 11:50 AM
Views: 8
Tokens: 5,182
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

পাতলা দাড়ির জন্য কি দাড়ি খিলাল করতে হবে? নাকি দাড়ির গোড়ায় পানি পৌঁছলেই যথেষ্ট হবে? এবিষয়ে হানাফী সালাফিসহ অন্যান্য মাজহাবের ফতোয়াগুলোও দলিলসহ জানতে চাচ্ছিলাম।

Answer

পাতলা দাড়ির জন্য ওযুর বিধান: খিলাল না কি শুধু পানি পৌঁছানোই যথেষ্ট?

জবাবঃ- পাতলা দাড়ির জন্য দাড়ি খিলাল করা আবশ্যক নয়। দাড়ির গোড়ায় পানি দিলে যদি চামড়ায় ভালোভানে পানি পৌঁছে যায়,তাহলে সেটিই যথেষ্ট হবে।

বিস্তারিত, দাড়ি খিলাল (মুখের ভেতরের অংশে আঙুল প্রবেশ করিয়ে ভেজা আঙুল দিয়ে দাড়ির গোড়া মাসেহ করা) ওযুর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। কিন্তু প্রশ্ন হলো—পাতলা দাড়ির ক্ষেত্রে কী বিধান? এখানে হানাফী মাজহাবের ফতোয়া এবং অন্যান্য মাজহাবের মতামত দলিলসহ উপস্থাপন করা হলো।


১. হানাফী মাজহাবের ফতোয়া

মূল বিধান: দাড়ি খিলাল করা সুন্নত

হানাফী মাজহাব অনুযায়ী, দাড়ি খিলাল করা ওযুর সুন্নত। এটি ঘন বা পাতলা দাড়ি নির্বিশেষে প্রযোজ্য। তবে খিলালের পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে।

দলিল:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«عَشْرٌ مِنَ الْفِطْرَةِ: قَصُّ الشَّارِبِ، وَإِعْفَاءُ اللِّحْيَةِ، وَالسِّوَاكُ، وَاسْتِنْشَاقُ الْمَاءِ، وَقَصُّ الْأَظْفَارِ، وَغَسْلُ الْبَرَاجِمِ، وَنَتْفُ الْإِبِطِ، وَحَلْقُ الْعَانَةِ، وَانْتِقَاصُ الْمَاءِ»

"দশটি বিষয় ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত: গোঁফ ছোট করা, দাড়ি লম্বা করা, মিসওয়াক করা, নাকে পানি দেওয়া, নখ কাটা, আঙুলের জোড়া ধোয়া, বগলের পশম উপড়ানো, নাভির নিচের পশম মুণ্ডানো এবং পানিতে ইস্তিনজা করা।"

— সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৬১; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৫৩

আর ওযুর সুন্নত সম্পর্কে হাদিসে এসেছে:

«إِذَا تَوَضَّأَ الْعَبْدُ الْمُسْلِمُ... فَإِذَا غَسَلَ وَجْهَهُ خَرَجَتْ مِنْ وَجْهِهِ كُلُّ خَطِيئَةٍ نَظَرَ إِلَيْهَا بِعَيْنَيْهِ...»

"যখন মুসলিম বান্দা ওযু করে... যখন সে তার মুখমণ্ডল ধোয়, তখন তার চোখ দিয়ে দেখা প্রতিটি গুনাহ বের হয়ে যায়..."

— সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৪৪

হানাফী ফিকহের বিস্তারিত বিধান

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত:

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, দাড়ি খিলাল করা সুন্নত। মুখ ধোয়ার সময় দাড়ির ভেতরে আঙুল প্রবেশ করিয়ে খিলাল করতে হবে।

ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত:

তাঁরাও দাড়ি খিলালকে সুন্নত বলেছেন। তবে ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) বলেন, যদি দাড়ি এত পাতলা হয় যে, চামড়া দৃশ্যমান হয়, তাহলে শুধু খিলাল নয়, বরং দাড়ির গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরজ

আল্লামা ইবনে আবিদিন শামী (রহ.) বলেন:

«وَالسُّنَّةُ فِي اللِّحْيَةِ الْخِفَافِ أَنْ يُخَلِّلَهَا، وَفِي الْكَثِيفَةِ أَنْ يَغْسِلَ ظَاهِرَهَا وَيُخَلِّلَ بَاطِنَهَا»

"পাতলা দাড়ির সুন্নত হলো তা খিলাল করা, আর ঘন দাড়ির সুন্নত হলো তার বাইরের অংশ ধোয়া এবং ভেতরের অংশ খিলাল করা।"

— রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ১২৫

আরও স্পষ্টভাবে:

«وَلَوْ كَانَتِ اللِّحْيَةُ خَفِيفَةً يَرَى الْبَشَرَةَ فَيَجِبُ إِيصَالُ الْمَاءِ إِلَى الْبَشَرَةِ، وَإِنْ كَانَتْ كَثِيفَةً لَا يَرَى الْبَشَرَةَ فَلَا يَجِبُ»

"যদি দাড়ি পাতলা হয় এবং চামড়া দৃশ্যমান হয়, তাহলে চামড়ায় পানি পৌঁছানো ওয়াজিব। আর যদি ঘন হয় এবং চামড়া না দেখা যায়, তাহলে ওয়াজিব নয়।"

— রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ১২৫; ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ১, পৃ. ১০

ফাতাওয়া উসমানী থেকে

মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেন:

"পাতলা দাড়ি যদি এত পাতলা হয় যে, নিচের চামড়া স্পষ্ট দেখা যায়, তাহলে ওযুতে দাড়ির গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরজ। শুধু বাইরে পানি ঢাললে ওযু হবে না। আর যদি দাড়ি এত ঘন হয় যে, চামড়া দেখা যায় না, তাহলে শুধু বাইরের অংশ ধোয়া এবং খিলাল করা যথেষ্ট।"

— ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ১, পৃ. ২৪৭

ইমদাদুল ফাতাওয়া থেকে

হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন:

"দাড়ি খিলাল করা সুন্নত। তবে যদি দাড়ি এত পাতলা হয় যে, চামড়া দেখা যায়, তাহলে চামড়ায় পানি পৌঁছানো জরুরি। অন্যথায় ওযু অসম্পূর্ণ থাকবে।"

— ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ১, পৃ. ১৪২

বেহেশতী জেওর থেকে

"দাড়ি খিলাল করা সুন্নত। যদি দাড়ি ঘন হয়, তাহলে বাইরের অংশ ধুয়ে ভেতরে আঙুল দিয়ে খিলাল করবে। আর যদি পাতলা হয় এবং চামড়া দেখা যায়, তাহলে চামড়ায় পানি পৌঁছাতে হবে।"

— বেহেশতী জেওর, পৃ. ৪৮


২. অন্যান্য মাজহাবের ফতোয়া

শাফেঈ মাজহাব

ইমাম নববী (রহ.) বলেন:

«وَيُسْتَحَبُّ تَخْلِيلُ اللِّحْيَةِ، وَإِنْ كَانَتْ خَفِيفَةً وَجَبَ إِيصَالُ الْمَاءِ إِلَى الْبَشَرَةِ»

"দাড়ি খিলাল করা মুস্তাহাব। আর যদি দাড়ি পাতলা হয়, তাহলে চামড়ায় পানি পৌঁছানো ওয়াজিব।"

— আল-মাজমু' শারহুল মুহাযযাব, খণ্ড ১, পৃ. ৪০০

দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ ওযু করার সময় দাড়ি খিলাল করতেন:

«أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ كَانَ إِذَا تَوَضَّأَ أَخَذَ كَفًّا مِنْ مَاءٍ فَأَدْخَلَهُ تَحْتَ حَنَكِهِ فَخَلَّلَ بِهِ لِحْيَتَهُ»

"নবী ﷺ যখন ওযু করতেন, তখন এক আজলা পানি নিয়ে তা চিবুকের নিচে প্রবেশ করাতেন এবং তা দিয়ে দাড়ি খিলাল করতেন।"

— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ১৪৫; সুনানে তিরমিজী, হাদিস নং ৩১

মালিকী মাজহাব

ইমাম মালিক (রহ.)-এর মত:

«يُخَلِّلُ لِحْيَتَهُ وَلَا يَجِبُ إِيصَالُ الْمَاءِ إِلَى الْبَشَرَةِ إِلَّا إِذَا كَانَتْ خَفِيفَةً جِدًّا»

"দাড়ি খিলাল করবে। তবে চামড়ায় পানি পৌঁছানো ওয়াজিব নয়, তবে যদি দাড়ি অত্যন্ত পাতলা হয় তাহলে ওয়াজিব।"

— আল-মুদাওয়ানাতুল কুবরা, খণ্ড ১, পৃ. ৫০

হাম্বলী মাজহাব

ইমাম ইবনে কুদামা (রহ.) বলেন:

«وَيُسْتَحَبُّ تَخْلِيلُ اللِّحْيَةِ، وَإِنْ كَانَتْ خَفِيفَةً وَجَبَ غَسْلُ الْبَشَرَةِ تَحْتَهَا»

"দাড়ি খিলাল করা মুস্তাহাব। আর যদি পাতলা হয়, তাহলে নিচের চামড়া ধোয়া ওয়াজিব।"

— আল-মুগনী, খণ্ড ১, পৃ. ৯০


৩. সালাফী/আহলে হাদিস মত

সালাফী আলেমগণও এ বিষয়ে একই মত পোষণ করেন:

শায়খ ইবনে বায (রহ.) বলেন:

"যদি দাড়ি পাতলা হয় এবং চামড়া দেখা যায়, তাহলে ওযুতে চামড়ায় পানি পৌঁছানো ফরজ। আর যদি ঘন হয়, তাহলে শুধু বাইরের অংশ ধোয়া এবং খিলাল করা যথেষ্ট।"

— মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে বায, খণ্ড ১০, পৃ. ৯৫

শায়খ আলবানী (রহ.) বলেন:

"দাড়ি খিলাল করা সুন্নত। তবে পাতলা দাড়ির ক্ষেত্রে চামড়ায় পানি পৌঁছানো জরুরি।"

— সিলসিলাতুল আহাদিস আস-সহীহা, খণ্ড ১, পৃ. ৩৪৫

উপসংহার

পাতলা দাড়ির ক্ষেত্রে শুধু খিলাল যথেষ্ট হবে না—বরং চামড়ায় পানি পৌঁছানো ফরজ**। খিলাল করা সুন্নত। আর ঘন দাড়ির ক্ষেত্রে শুধু বাইরের অংশ ধোয়া এবং খিলাল করা যথেষ্ট। তাই প্রত্যেক মুসলিমের উচিত নিজের দাড়ির অবস্থা বিবেচনা করে ওযু করা এবং সন্দেহ হলে খিলালসহ চামড়ায় পানি পৌঁছানোর চেষ্টা করা।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.