গর্ভপাত করা কি জায়েজ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার এক আত্মীয় ৭-৮ সপ্তাহের প্রেগন্যান্ট। তার দুইটা মেয়ে আছে। একজনের বয়স ৭ বছর আর আরেকজনের ২১ মাস। দুইটা বাচ্চাই সিজারে হয়েছে। রিসেন্টলি তার গলব্লাডারে পাথর ধরা পড়েছে এবং ঠিক তখনই জানতে পারেন যে সে প্রেগন্যান্ট। কিন্তু তিনি বাচ্চা রাখতে চাচ্ছেন না কারণ তিনি জব করেন + ছোটো বাচ্চা আছে আর তার শারীরিক কন্ডিশনও খুব একটা ভাল না। তার বয়স ৩৮-৩৯ বছর হবে। আমার কাছে সাজেশন চায় নাই যে রাখবে কি না, তারা আগে থেকেই ডিসাইড করছে যে এবোরশন করবে। আমার সাথে শেয়ার করছে, আমি তাদেরকে বলছি যে এটা জায়েজ নাই কিন্তু আপনাদের বিষয় আপনারা যা ডিসিশন নিবেন তাই।
এখন আমার প্রশ্ন হলো, তার জন্য কি এবোরশন করা জায়েজ হবে? আর আমি যেহেতু তাদের এই এবোরশনে কোনো মতামত দেই না বা বাঁধা দিচ্ছি না সেজন্য কি আমিও একই গুনাহগার হবো?
Answer
গর্ভপাত (Abortion) সম্পর্কে ইসলামী বিধান
উত্তর (সংক্ষেপে):
৭-৮ সপ্তাহের গর্ভপাত সাধারণ অবস্থায় জায়েজ নয়। তবে যদি নির্ভরযোগ্য মুসলিম বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা স্পষ্টভাবে বলে দেন যে গর্ভধারণ ও প্রসব মায়ের জীবন বা গুরুতর স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনবে, তাহলে শরীয়তের নির্দিষ্ট শর্তে গর্ভপাতের অনুমতি আছে। শুধু চাকরি, ছোট বাচ্চার দেখাশোনা বা আর্থিক অসুবিধার কারণে গর্ভপাত করা জায়েজ নয়। আর আপনি নিজে গর্ভপাত করাচ্ছেন না বা তাতে সরাসরি সহযোগিতা করছেন না—শুধু পরামর্শ চাওয়ার সময় নিষেধাজ্ঞা জানিয়ে দেওয়ার পরও তারা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিলে আপনি তাদের গুনাহের ভাগী হবেন না; বরং নিষেধাজ্ঞা জানানো আপনার দায়িত্ব ছিল, তা আপনি আদায় করেছেন।
বিস্তারিত আলোচনা
১) গর্ভপাতের মূল বিধান
ইসলামে বিবাহবহির্ভূত গর্ভ বা অনৈতিক সম্পর্কের গর্ভপাত সম্পূর্ণ হারাম। আর বৈধ বিবাহের গর্ভ হলেও কারণ ছাড়া গর্ভপাত করা জায়েজ নয়। কারণ গর্ভস্থ সন্তানও একটি জীবন; তাকে ধ্বংস করা নিষিদ্ধ।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ ۖ نَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ
“তোমরা দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না; আমিই তাদের রিযিক দিই এবং তোমাদেরও।”
(সূরা আল-ইসরা: ৩১)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ
“আল্লাহ যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, অন্যায়ভাবে তাকে হত্যা করো না।”
(সূরা আল-আন‘আম: ১৫১; সূরা আল-ইসরা: ৩৩)
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ
“নিজের ক্ষতি করবে না, অন্যেরও ক্ষতি করবে না।”
(সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪১; মুসনাদে আহমাদ: ২৮৬৫—হাসান)
২) গর্ভপাতের অনুমতি কখন?
হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো:
- গর্ভের প্রথম পর্যায়ে (যেমন ৪০ দিনের আগে বা কিছু ফকিহের মতে ১২০ দিনের আগে) যদি কোনো শরীয়তসম্মত ওজর থাকে, তবে সীমিতভাবে অনুমতি আছে।
- ১২০ দিন (৪ মাস) পূর্ণ হওয়ার পর রূহ ফুঁকে দেওয়া হয়। এরপর গর্ভপাত করা সাধারণভাবে নিষিদ্ধ; কেবল মায়ের জীবন রক্ষার জন্য নির্ভরযোগ্য চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তে অনুমতি হতে পারে।
ইবনে আবিদিন (রহ.) লিখেন:
“গর্ভের প্রথম পর্যায়ে ওজর ছাড়া গর্ভপাত করা জায়েজ নয়। আর যদি কোনো ওজর থাকে, তবে ১২০ দিনের আগে অনুমতি আছে।”
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ১৭৬—কিতাবুল হজর/আস-সিয়ার)
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:
“যদি গর্ভের প্রথম পর্যায়ে হয় এবং মায়ের জন্য ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে গর্ভপাতের অনুমতি আছে; তবে ১২০ দিনের পর নয়।”
(ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৫৪)
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:
“শুধু আর্থিক সমস্যা, চাকরি, ব্যস্ততা বা সন্তান লালন-পালনের কষ্টের কারণে গর্ভপাত করা জায়েজ নয়। হ্যাঁ, যদি চিকিৎসকরা确信 করেন যে গর্ভধারণ মায়ের জীবননাশ বা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হবে, তবে অনুমতি আছে।”
(ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩০০-৩০৫)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-ও একই মত দিয়েছেন:
“গর্ভপাত কেবল তখনই অনুমোদিত যখন মায়ের জীবন বিপন্ন হয়, এবং তা নির্ভরযোগ্য চিকিৎসকদের সাক্ষ্যে প্রমাণিত হয়।”
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২৫০)
৩) আপনার প্রশ্নের প্রথম অংশ: তার জন্য গর্ভপাত জায়েজ হবে কি?
প্রশ্নে বর্ণিত কারণগুলো:
- তিনি জব করেন
- ছোট বাচ্চা আছে
- শারীরিক কন্ডিশন ভালো না
- বয়স ৩৮-৩৯
- গলব্লাডারে পাথর
এগুলো শরীয়তসম্মত ওজর হিসেবে গণ্য হবে না, যদি না নির্ভরযোগ্য মুসলিম বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা স্পষ্টভাবে সাক্ষ্য দেন যে:
- গর্ভধারণ ও প্রসব তার জীবননাশের কারণ হবে, অথবা
- তার গুরুতর ও স্থায়ী স্বাস্থ্যহানির কারণ হবে, অথবা
- গলব্লাডারের পাথরের চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার না করলে জীবন বিপন্ন হবে, আর গর্ভাবস্থায় তা করা অসম্ভব।
শুধু “শারীরিক কন্ডিশন ভালো না” বা “জব করেন” বা “ছোট বাচ্চা আছে”—এগুলো দ্বারা গর্ভপাত জায়েজ হবে না। বরং এগুলো ধৈর্য, তাওয়াক্কুল ও আল্লাহর উপর ভরসার বিষয়।
তবে হ্যাঁ, যদি চিকিৎসকরা জীবনসংশয়ী সিদ্ধান্ত দেন, তাহলে ১২০ দিনের আগে গর্ভপাতের অনুমতি হতে পারে। আর ১২০ দিনের পর হলে তা আরও কঠিন; কেবল জীবন রক্ষার জন্যই অনুমতি হবে।
৪) আপনার দ্বিতীয় প্রশ্ন: আপনি কি গুনাহগার হবেন?
আপনি বলেছেন:
“আমি তাদেরকে বলছি যে এটা জায়েজ নাই কিন্তু আপনাদের বিষয় আপনারা যা ডিসিশন নিবেন তাই।” “আমি যেহেতু তাদের এই এবোরশনে কোনো মতামত দেই না বা বাঁধা দিচ্ছি না সেজন্য কি আমিও একই গুনাহগার হবো?”
এর উত্তর:
- আপনি যদি নিষেধাজ্ঞা জানিয়ে দেন এবং তাদেরকে গর্ভপাত করতে উৎসাহ না দেন, বরং সতর্ক করেন—তাহলে আপনি দায়ী হবেন না।
- তবে শুধু “জায়েজ নাই” বলে চুপ করে থাকা এবং তাদের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা বা তাদের গুনাহে সহযোগিতা করা জায়েজ নয়। কারণ আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।”
(সূরা আল-মায়িদা: ২)
- আপনি যদি তাদেরকে স্পষ্টভাবে বোঝান যে, শরীয়তসম্মত ওজর ছাড়া গর্ভপাত হারাম, এবং তারা তা না মানে—তাহলে তাদের গুনাহ তাদেরই। আপনি তাদের গুনাহের ভাগী হবেন না।
- কিন্তু আপনি যদি তাদের গর্ভপাতের জন্য ব্যবস্থা করে দেন, টাকা দেন, ক্লিনিকে নিয়ে যান, বা তাদের সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেন—তাহলে আপনি সহযোগী হিসেবে গুনাহগার হবেন।
ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
“পাপের কাজে সরাসরি সহযোগিতা করা জায়েজ নয়; তবে কেউ নিজে থেকে পাপ করলে অন্য ব্যক্তি শুধু নিষেধ না করলে সে সরাসরি গুনাহগার হয় না, যদি না সে তাতে রাজি থাকে বা সহযোগিতা করে।”
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৯১—কিতাবুল হজর)
৫) করণীয়
- তাকে ও তার পরিবারকে বোঝান: গর্ভপাত হারাম, বিশেষত যখন জীবনসংশয়ী কোনো কারণ নেই।
- তাকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলুন: যদি সত্যিই স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে, তবে নির্ভরযোগ্য মুসলিম বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের লিখিত মত নিন।
- তাকে সাহস ও ধৈর্য দিন: আল্লাহ বলেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
“যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।”
(সূরা আত-তালাক: ২)
- আপনি নিজে দোয়া করুন এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে হিদায়াত চান।
- সরাসরি সহযোগিতা করবেন না—না টাকা, না ক্লিনিক, না সিদ্ধান্তে সমর্থন।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |---|---| | শুধু চাকরি/ছোট বাচ্চা/আর্থিক সমস্যার কারণে গর্ভপাত | জায়েজ নয় | | শারীরিক দুর্বলতা, বয়স, গলব্লাডারে পাথর—যদি জীবনসংশয়ী না হয় | জায়েজ নয় | | নির্ভরযোগ্য চিকিৎসকের সাক্ষ্যে মায়ের জীবন বিপন্ন | ১২০ দিনের আগে অনুমতি; পরে কেবল জীবন রক্ষার জন্য | | আপনি নিষেধ করেছেন, সহযোগিতা করছেন না | আপনি গুনাহগার হবেন না | | আপনি সহযোগিতা করলে বা সিদ্ধান্তে সমর্থন দিলে | গুনাহগার হবেন |
দুআ
اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ
“হে আল্লাহ! তোমার যিকির, শোকর ও সুন্দর ইবাদতে আমাকে সাহায্য করো।”
(সুনানে আবু দাউদ: ১৫২২—সহিহ)
আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে হারাম থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন এবং এই পরিবারকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার হিদায়াত দিন। আমিন।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার, ইবনে আবিদিন, খণ্ড ৩, পৃ. ১৭৬; খণ্ড ৬, পৃ. ৩৯১
- ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৫৪
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, মুফতি মুহাম্মদ শফি, খণ্ড ৪, পৃ. ২৫০
- ফাতাওয়া উসমানি, মুফতি তাকি উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩০০-৩০৫
- সূরা আল-ইসরা: ৩১, ৩৩; সূরা আল-আন‘আম: ১৫১; সূরা আল-মায়িদা: ২; সূরা আত-তালাক: ২
- সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪১; মুসনাদে আহমাদ: ২৮৬৫; সুনানে আবু দাউদ: ১৫২২