হায়েজ ৮ দিনের পর ১১ দিনে বাদামী স্রাব দেখলে কি নামাজ পড়তে হবে?
Taharah Purity · Hanafi
Question
Answer
হায়েজের অভ্যাস পরিবর্তন ও ১১তম দিনের বাদামী স্রাব সংক্রান্ত মাসআলা
সংক্ষিপ্ত উত্তর
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো: না, ১১তম দিনে বাদামী স্রাব দেখার কারণে পূর্বের নামাজগুলো (যেগুলো আপনি ৮, ৯, ১০ দিনে পড়েননি বা পড়েছেন) পুনরায় পড়তে হবে না। কারণ আপনার হায়েজের অভ্যাস ৮ দিন ছিল, এবং ১০ দিনের মধ্যে পবিত্রতা এসে গেছে। ১১তম দিনের বাদামী স্রাব ইস্তিহাযা (অসুস্থতার রক্ত) হিসেবে গণ্য হবে, হায়েজ নয়।
তবে বিস্তারিত মাসআলা নিচে দেওয়া হলো, যাতে আপনি পূর্ণ বিষয়টি বুঝতে পারেন।
বিস্তারিত মাসআলা
১. হায়েজের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ সময়
হানাফী মাযহাব অনুযায়ী:
- হায়েজের সর্বনিম্ন সময়: ৩ দিন ৩ রাত (৭২ ঘণ্টা)
- হায়েজের সর্বোচ্চ সময়: ১০ দিন ১০ রাত (২৪০ ঘণ্টা)
দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«الْحَيْضُ عَشَرَةُ أَيَّامٍ فَمَا زَادَ فَهُوَ اسْتِحَاضَةٌ»
"হায়েজ দশ দিন পর্যন্ত; এর বেশি হলে তা ইস্তিহাযা।"
— সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১২৮ (ইমাম তিরমিযী হাসান বলেছেন); সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২৮০; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৬২৪
ইমাম আবু হানীফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর সর্বসম্মত মত হলো, হায়েজের সর্বোচ্চ সীমা ১০ দিন। এর বেশি হলে তা ইস্তিহাযা।
রেফারেন্স:
- আল-হিদায়া (কিতাবুত তাহারাত, বাবুল হায়েজ)
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী) — খণ্ড ১, পৃ. ২৮৫-২৮৭
- ফাতাওয়া আলমগীরী — খণ্ড ১, পৃ. ৩৭
- বাদায়েউস সানায়ে — খণ্ড ১, পৃ. ৪১
২. অভ্যাস (আদত) অনুযায়ী হায়েজ নির্ধারণ
হানাফী মাযহাবের মূলনীতি হলো:
"الْعَادَةُ مُعْتَبَرَةٌ" — অভ্যাস/আদত বিবেচ্য।
যদি কোনো নারীর নির্দিষ্ট অভ্যাস থাকে (যেমন ৮ দিন), এবং কোনো মাসে রক্ত ১০ দিনের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে:
- অভ্যাসের দিনগুলো হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে।
- অভ্যাসের পর থেকে ১০ দিনের মধ্যে যদি সাদা স্রাব (পবিত্রতা) আসে, তাহলে তা পবিত্রতা।
- অভ্যাসের পরের দিনগুলোতে যদি রক্ত/বাদামী স্রাব চলতে থাকে, তবে তা ইস্তিহাযা হিসেবে গণ্য হবে (যদি ১০ দিন অতিক্রম না করে এবং অভ্যাস ৮ দিন হয়)।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার — খণ্ড ১, পৃ. ২৯০-২৯২
- ফাতাওয়া উসমানী — খণ্ড ১, পৃ. ১৩৫-১৩৮ (মুফতি তাকী উসমানী)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া — খণ্ড ১, পৃ. ৮৫-৮৮ (মুফতি মুহাম্মাদ শফী)
- বাহিশতী যেওর — তাহারাত অধ্যায়, মাসআলা নং ৪৫-৫০
৩. আপনার নির্দিষ্ট পরিস্থিতির বিশ্লেষণ
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
| দিন | অবস্থা | |-----|--------| | ১-৮ দিন | হায়েজ (অভ্যাস অনুযায়ী) | | ৯-১০ দিন | ভালো হয়ে যায়, সাদা স্রাব আসে | | ১১তম দিন | বাদামী স্রাব দেখা যায় |
মাসআলা:
-
৮ দিন পর্যন্ত: আপনার অভ্যাস অনুযায়ী হায়েজ। এই দিনগুলোতে নামাজ, রোজা বন্ধ থাকবে।
-
৯-১০ দিন: যেহেতু সাদা স্রাব এসেছে এবং রক্ত বন্ধ হয়েছে, তাই আপনি পবিত্র। এই দিনগুলোতে নামাজ পড়তে হবে, রোজা রাখতে হবে।
-
১১তম দিনের বাদামী স্রাব:
- যেহেতু আপনার অভ্যাস ৮ দিন, এবং ১০ দিনের মধ্যে পবিত্রতা এসে গেছে, তাই ১১তম দিনের বাদামী স্রাব হায়েজ নয়।
- এটি ইস্তিহাযা (অসুস্থতার রক্ত) হিসেবে গণ্য হবে।
- ইস্তিহাযার হুকুম: নামাজ পড়তে হবে, রোজা রাখতে হবে। তবে অযু ভেঙে যাওয়ার কারণে প্রত্যেক নামাজের জন্য নতুন অযু করতে হবে (যদি স্রাব চলতে থাকে)।
দলিল: উম্মে আতিয়া (রাযি.) থেকে বর্ণিত:
«كُنَّا لَا نَعُدُّ الصُّفْرَةَ وَالْكُدْرَةَ شَيْئًا»
"আমরা (সাহাবিয়াগণ) হলুদ ও বাদামী স্রাবকে হায়েজ হিসেবে গণ্য করতাম না।"
— সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩০৭; সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং ৩৬৮; সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩২৬ (মুআল্লাক)
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মত হলো, হায়েজের দিনগুলোর মধ্যে বাদামী/হলুদ স্রাব হায়েজের অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু হায়েজের দিনগুলোর বাইরে তা হায়েজ নয়।
রেফারেন্স:
- শরহু মাআনিল আছার (ইমাম তাহাবী) — খণ্ড ১, পৃ. ১৪৫
- আল-হিদায়া — খণ্ড ১, পৃ. ৩৩
- রাদ্দুল মুহতার — খণ্ড ১, পৃ. ২৮৮
৪. পূর্বের নামাজের হুকুম
প্রশ্ন: ১১তম দিনে বাদামী স্রাব দেখার কারণে পূর্বের (৯-১০ দিনের) নামাজগুলো কি পুনরায় পড়তে হবে?
উত্তর: না, পুনরায় পড়তে হবে না। কারণ:
- ৯-১০ দিনে আপনি পবিত্র ছিলেন (সাদা স্রাব এসেছিল)।
- ১১তম দিনের বাদামী স্রাব ইস্তিহাযা, যা পূর্বের পবিত্রতাকে প্রভাবিত করে না।
- হায়েজের সর্বোচ্চ সীমা ১০ দিন, তাই ১১তম দিন হায়েজ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
যদি সন্দেহ হয়: যদি আপনার অভ্যাস ৮ দিন হয়, কিন্তু কখনো ১০ দিন পর্যন্ত রক্ত আসে, তাহলে ১০ দিন পর্যন্ত হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে। ১০ দিনের পরের রক্ত ইস্তিহাযা।
রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানী — খণ্ড ১, পৃ. ১৪০-১৪২
- ইমদাদুল ফাতাওয়া — খণ্ড ১, পৃ. ৯০-৯২
- আহকামে হায়েজ ও নিফাস (মুফতি মুহাম্মাদ শফী) — পৃ. ৪৫-৫০
৫. ইস্তিহাযার বিধান
যেহেতু ১১তম দিনের বাদামী স্রাব ইস্তিহাযা:
- নামাজ: প্রত্যেক নামাজের ওয়াক্তে অযু করে নামাজ পড়তে হবে। যদি স্রাব চলতে থাকে, তবে প্রত্যেক ফরজ নামাজের জন্য নতুন অযু করতে হবে।
- রোজা: রোজা রাখতে হবে, ভাঙতে হবে না।
- কুরআন তিলাওয়াত: করা যাবে।
- মসজিদে প্রবেশ: করা যাবে।
- স্বামীর সাথে সম্পর্ক: বৈধ।
দলিল: আয়েশা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, ফাতিমা বিনতে আবী হুবাইশ (রাযি.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন:
«إِنِّي امْرَأَةٌ أُسْتَحَاضُ فَلَا أَطْهُرُ، أَفَأَدَعُ الصَّلَاةَ؟»
"আমি ইস্তিহাযায় আক্রান্ত, পবিত্র হই না। আমি কি নামাজ ছেড়ে দেব?"
রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: «لَا، إِنَّمَا ذَلِكِ عِرْقٌ، وَلَيْسَتْ بِالْحَيْضَةِ...»
"না, এটি একটি শিরার রক্ত, হায়েজ নয়।"
— সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২২৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৩৩
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | ১-৮ দিন | হায়েজ (অভ্যাস অনুযায়ী) | | ৯-১০ দিন | পবিত্র (সাদা স্রাব) | | ১১তম দিনের বাদামী স্রাব | ইস্তিহাযা (হায়েজ নয়) | | পূর্বের নামাজ | পুনরায় পড়তে হবে না | | ১১তম দিনের নামাজ | পড়তে হবে (প্রত্যেক ওয়াক্তে নতুন অযু) | | রোজা | রাখতে হবে |
পরামর্শ: যেহেতু আপনার অভ্যাস কখনো ৮ দিন, কখনো ১০ দিন পর্যন্ত হয়ে থাকে, তাই আপনি ১০ দিন পর্যন্ত হায়েজ হিসেবে গণ্য করবেন। ১০ দিনের পরের যেকোনো স্রাব (বাদামী, হলুদ, বা রক্ত) ইস্তিহাযা হিসেবে গণ্য হবে। যদি আপনার অভ্যাস স্থির ৮ দিন হয়, তবে ৮ দিন পরের স্রাব ইস্তিহাযা।
তথ্যসূত্র:
- আল-কুরআনুল কারীম — সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২২২
- সহীহ বুখারী — হাদীস নং ২২৮, ৩২৬
- সহীহ মুসলিম — হাদীস নং ৩৩৩
- সুনানে আবু দাউদ — হাদীস নং ২৮০, ৩০৭
- সুনানে তিরমিযী — হাদীস নং ১২৮
- সুনানে নাসাঈ — হাদীস নং ৩৬৮
- আল-হিদায়া — ইমাম বুরহানুদ্দীন আল-মারগীনানী
- রাদ্দুল মুহতার — ইমাম ইবনে আবিদীন শামী, খণ্ড ১
- ফাতাওয়া আলমগীরী — খণ্ড ১
- ফাতাওয়া উসমানী — মুফতি তাকী উসমানী, খণ্ড ১
- ইমদাদুল ফাতাওয়া — মুফতি মুহাম্মাদ শফী, খণ্ড ১
- বাহিশতী যেওর — মাওলানা আশরাফ আলী থানভী
- শরহু মাআনিল আছার — ইমাম তাহাবী
- বাদায়েউস সানায়ে — ইমাম কাসানী
আল্লাহ তা'আলা সর্বজ্ঞ।