সফরে বাসে অজু ছাড়া পড়া নামাজের কাযা বিধান, কসর না পূর্ণ পড়তে হবে?

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 5557
Questioner: Snigdha Shila
Question Asked: 16 Sep 2026, 06:51 PM
Reviewed & Published: 16 Sep 2026, 07:01 PM
Views: 12
Tokens: 4,506
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

তিন দিন দুই রাতের জন্য সিলেটে সফরে গিয়েছিলাম। প্রায় অধিকাংশ সময় বাসেই থাকতে হয়েছিল। সমস্যা থাকার কারণে এক ওজু দিয়ে দুই সালাত আদায় করা সম্ভব হয়না।আবার বাসে থাকাকালীন ওজু করাও সম্ভব হয়না। সে কারনে বাসে থাকাকালীন দেখা যায় যে অজু ছাড়াও সালাত আদায় করছি। দুরত্বের কারনে কসর করতে হয়েছিল। আবার ওজু থাকাকালীনও বাসেই সালাত আদায় করেছি। এখন সব সালাত কি পুনরায় আবার কাযা পড়তে হবে? পুনরায় পড়লেও কি কসর হিসেব করে পড়বো নাকি প্রতি ওয়াক্তের ফরজ আদায় করবো

Answer

সফরে বাসে নামাজ ও অজু: কাযা ও কসরের বিধান

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: তিন দিন দুই রাতের সফরে সিলেটে গিয়েছিলেন, বেশিরভাগ সময় বাসে কাটাতে হয়েছে। বাসে অজু করা সম্ভব হয়নি, তাই কিছু নামাজ বিনা অজুতে আদায় করেছেন। আবার অজু থাকা অবস্থায়ও বাসে নামাজ পড়েছেন। এখন জানতে চান—সব নামাজ কি পুনরায় কাযা পড়তে হবে? পুনরায় পড়লে কসর হিসেবে পড়বেন নাকি পূর্ণ চার রাকাত পড়বেন?


প্রথম বিষয়: বিনা অজুতে পড়া নামাজের হুকুম

অজু ছাড়া নামাজ শুদ্ধ হয় না। এটি ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সুস্পষ্ট বিধান।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ... "হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা নামাজের জন্য দাঁড়াও, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত করো..." (সূরা মায়িদা: ৬)

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

لَا تُقْبَلُ صَلَاةٌ بِغَيْرِ طُهُورٍ "পবিত্রতা (অজু) ছাড়া কোনো নামাজ কবুল হয় না।" (সহিহ মুসলিম: ২২৪; সুনানে আবু দাউদ: ৬০)

সুতরাং বিনা অজুতে আদায় করা প্রতিটি ফরজ নামাজ অবশ্যই পুনরায় (কাযা) পড়তে হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই।


দ্বিতীয় বিষয়: কসর হিসেবে পড়বেন নাকি পূর্ণ?

এখানে দুটি ভিন্ন অবস্থার বিধান আলাদা:

(ক) বিনা অজুতে পড়া নামাজ — কসর হিসেবেই কাযা

যেহেতু আপনি সফরে ছিলেন এবং সফরের কারণে কসর ওয়াজিব ছিল, তাই কাযা আদায়ের সময়ও কসর হিসেবেই পড়বেন — অর্থাৎ প্রতি ওয়াক্তের ফরজ দুই রাকাত করে। কারণ কাযা আদায়ের সময় মূল আদায়ের সময়ের বিধানই প্রযোজ্য হয়।

ইবনে আবিদিন (রহ.) লিখেন:

وَالْقَضَاءُ يَعْتَبِرُ بِوَقْتِ الْأَدَاءِ "কাযা আদায়ের ক্ষেত্রে (মূল) আদায়ের সময়ের অবস্থা বিবেচ্য।" (রাদ্দুল মুহতার: ২/১২৭)

তবে শর্ত হলো—কাযা আদায়ের সময়ও আপনি মুসাফির থাকবেন। যদি এখন আপনি মুকিম (বাসস্থানে অবস্থানকারী) হয়ে যান, তাহলে কাযা পড়ার সময় পূর্ণ চার রাকাতই পড়তে হবে, কারণ কাযার হুকুম কাযা আদায়ের সময়ের অবস্থার সাথে সম্পর্কিত।

সঠিক মাসআলা: কাযা নামাজের ক্ষেত্রে কসর বা পূর্ণতার বিধান নির্ভর করে কাযা আদায়ের সময় আপনি মুসাফির না মুকিম — তার উপর। (ফাতাওয়া উসমানি: ১/২৪৫; ইমদাদুল ফাতাওয়া: ১/৩৯০)

(খ) অজু থাকা অবস্থায় বাসে পড়া নামাজ — পুনরায় পড়তে হবে কি?

এখানে দুটি দিক বিবেচ্য:

১. কিবলার দিক: বাসে কিবলার দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করা সম্ভব হলে এবং সম্ভবপর হলে দাঁড়িয়ে বা বসে ইশারায় হলেও শুদ্ধ হয়েছে। যদি কিবলার দিক রক্ষা না করা যায়, তাহলে পুনরায় পড়তে হবে।

২. সময়ের ভেতরে আদায়: যদি সময়ের ভেতরেই আদায় করা হয় এবং কিবলা ও অন্যান্য শর্ত রক্ষা হয়, তাহলে পুনরায় পড়তে হবে না


তৃতীয় বিষয়: এক ওজু দিয়ে দুই সালাত

আপনি লিখেছেন—"এক ওজু দিয়ে দুই সালাত আদায় করা সম্ভব হয়নি।" এখানে স্পষ্ট করা প্রয়োজন:

এক ওজু দিয়ে একাধিক ফরজ নামাজ আদায় করা জায়েজ। ওজু ভঙ্গ না হলে একই ওজুতে যত ইচ্ছা নামাজ পড়া যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ এক ওজুতে একাধিক নামাজ আদায় করেছেন। (সুনানে আবু দাউদ: ১৭২; মুসনাদে আহমাদ)

তবে বাসে অজু করা সম্ভব না হলে আপনার করণীয় ছিল:

  1. তায়াম্মুম করা — যদি পানি ব্যবহারের সামর্থ্য না থাকে বা ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
  2. নামাজের সময় বাড়ানো — বাস থেকে নেমে অজু করে নামাজ আদায় করা, যদি সময়ের ভেতরে সম্ভব হয়।
  3. জমা করা — মুসাফিরের জন্য জমা করা জায়েজ (হানাফি মাযহাবে জমা শুধু হজের ময়দানে, তবে কিছু ফকিহ মুসাফিরের জন্য জমার অনুমতি দিয়েছেন)।

তায়াম্মুমের দলিল:

فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا "যদি পানি না পাও, তাহলে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করো।" (সূরা মায়িদা: ৬)


চূড়ান্ত উত্তর ও আমল

| অবস্থা | হুকুম | |---|---| | বিনা অজুতে পড়া ফরজ নামাজ | অবশ্যই কাযা পড়তে হবে | | কাযা পড়ার সময় মুসাফির থাকলে | কসর (২ রাকাত) হিসেবে | | কাযা পড়ার সময় মুকিম হলে | পূর্ণ (৪ রাকাত) হিসেবে | | অজু থাকা অবস্থায় বাসে পড়া নামাজ (শর্ত পূরণ হলে) | পুনরায় পড়তে হবে না | | অজু থাকা সত্ত্বেও কিবলা/শর্ত না মানলে | পুনরায় পড়তে হবে |

আপনার করণীয়:

  1. বিনা অজুতে পড়া প্রতিটি ফরজ নামাজের কাযা পড়ুন।
  2. কাযা পড়ার সময় আপনি যদি এখনো মুসাফির হন (সফরে থাকেন), তবে কসর হিসেবে ২ রাকাত পড়ুন।
  3. যদি মুকিম হয়ে যান, তবে পূর্ণ ৪ রাকাত পড়ুন।
  4. ভবিষ্যতে সফরে বাসে নামাজের সময় হলে—আগে থেকে অজু করে রাখুন, অথবা তায়াম্মুমের ব্যবস্থা করুন, অথবা সময়মতো বাস থেকে নেমে অজু করে নামাজ আদায় করুন।

সতর্কতা

বিনা অজুতে ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ পড়া কবিরা গুনাহ। তবে আপনি সমস্যার কারণে করেছেন, তাই তাওবা করুন এবং কাযা আদায় করুন। আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল।

وَأَقِمِ الصَّلَاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ "নামাজ কায়েম করো; নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।" (সূরা আনকাবুত: ৪৫)


রেফারেন্স:

  • সূরা মায়িদা: ৬
  • সহিহ মুসলিম: ২২৪
  • সুনানে আবু দাউদ: ৬০, ১৭২
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): ২/১২৭
  • ফাতাওয়া উসমানি: ১/২৪৫
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া: ১/৩৯০
  • ফাতাওয়া আলমগিরি: ১/১৩৯
  • আল-হিদায়া: ১/৮০

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.