কারো মৃত্যু কামনা করা কি গুনাহ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: এক ব্যক্তির কারণে যদি অন্য ব্যক্তি মানসিকভাবে খুব ডিস্টার্ব হয়, মনে এমন কু-ধারণা/কথা আসে যে "এটা মরে গেলেও ভালো হয়" বা "এটা মরে না কেন" — এমন চিন্তা করা বা মনে আনা কি গুনাহ? এ অবস্থায় করণীয় কী?
উত্তর:
সংক্ষেপে বলতে গেলে — কারো মৃত্যু কামনা করা বা তার মরে যাওয়ার কু-ধারণা মনে আনা জায়েজ নয়; এটি অন্তরের একটি মারাত্মক রোগ। তবে শুধু মনে খটকা আসা (ওয়াসওয়াসা) আর ইচ্ছাকৃতভাবে তা পোষণ করা — এ দুটির বিধান আলাদা। বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো:
১) কারো মৃত্যু কামনা করা বা মরে যাওয়ার আশা করা:
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন —
«لَا يَتَمَنَّيَنَّ أَحَدٌ مِنْكُمُ الْمَوْتَ لِضُرٍّ نَزَلَ بِهِ، وَلْيَقُلِ: اللَّهُمَّ أَحْيِنِي مَا كَانَتِ الْحَيَاةُ خَيْرًا لِي، وَتَوَفَّنِي إِذَا كَانَتِ الْوَفَاةُ خَيْرًا لِي»
অর্থ: "তোমাদের কেউ যেন কোনো কষ্টের কারণে মৃত্যু কামনা না করে; বরং সে বলবে: হে আল্লাহ! যতদিন জীবন আমার জন্য কল্যাণকর, ততদিন আমাকে জীবিত রাখুন; আর যখন মৃত্যু আমার জন্য কল্যাণকর হয়, তখন আমাকে মৃত্যু দিন।" (সহিহ বুখারি: ৫৬৭১, সহিহ মুসলিম: ২৬৮০)
তবে হাদিসে একটি ব্যতিক্রম আছে — কেউ যদি ফিতনা-ফাসাদ বা দ্বীন নষ্ট হওয়ার ভয় করে, তাহলে নিজের জন্য মৃত্যু কামনা করতে পারে (বুখারি: ৫৬৭২)। কিন্তু অন্য কারো মৃত্যু কামনা করা — বিশেষত ব্যক্তিগত রাগ-ক্ষোভ বা প্রতিশোধের বশে — তা কখনোই বৈধ নয়। এটা হিংসা ও অন্তরের কঠিনতার লক্ষণ।
২) শুধু মনে খটকা আসা (ওয়াসওয়াসা) — এতে গুনাহ হবে কি?
শরিয়তের মূলনীতি হলো — যে কথা মনে আসে কিন্তু মুখে বলা হয় না এবং অন্তর তা পছন্দ করে না, তা ক্ষমাযোগ্য। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন —
«إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي مَا وَسْوَسَتْ بِهِ صُدُورُهَا، مَا لَمْ تَعْمَلْ بِهِ أَوْ تَتَكَلَّمْ»
অর্থ: "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরে যে ওয়াসওয়াসা আসে তা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা আমলে পরিণত করে বা মুখে বলে।" (সহিহ বুখারি: ৫২৬৯, সহিহ মুসলিম: ১২৭)
সুতরাং যদি কারো প্রতি অতিরিক্ত জুলুম-নির্যাতনের কারণে হঠাৎ মনে এমন কু-ধারণা আসে, কিন্তু আপনি তা ঘৃণা করেন, মুখে বলেন না, এবং তার জন্য বাস্তবে কোনো ক্ষতি কামনা করেন না — ইনশাআল্লাহ এতে গুনাহ হবে না। এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা, যা দমন করা কর্তব্য।
৩) কিন্তু সাবধান! ইচ্ছাকৃতভাবে পোষণ করা বা মুখে বলা হারাম:
যদি কেউ সচেতনভাবে সেই কু-ধারণা লালন করে, বারবার মনে মনে বলে "এটা মরে গেলেই ভালো", কিংবা মুখে বলে ফেলে বা কারো ক্ষতির জন্য দুআ করে — তাহলে তা গুনাহ, হিংসা ও হৃদয়ের ব্যাধি। ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন, অন্তরের এমন কু-ভাব যা ইচ্ছাকৃতভাবে পোষণ করা হয়, তা আখলাক তথা চরিত্রের মারাত্মক ত্রুটি।
৪) করণীয় (আমলি পরামর্শ):
- সবর ও দুআ: যিনি কষ্ট দিচ্ছেন, তার হেদায়াত ও সংশোধনের জন্য দুআ করুন; নিজের জন্য সবর ও শান্তির দুআ করুন। রাগের মুহূর্তে রাসূল ﷺ-এর নির্দেশ — চুপ থাকা, পানি পান করা, দাঁড়িয়ে থাকলে বসে পড়া (মুসলিম: ২৯৯২)।
- জুলুমের প্রতিকার: যদি কেউ সত্যিই জুলুম করছে, তাহলে শরিয়তসম্মত পথে (পরিবারের বড়দের মাধ্যমে, সমাজের দায়িত্বশীলদের মাধ্যমে, প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থায়) প্রতিকার চাওয়া যাবে — কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তার মৃত্যু কামনা করা সমাধান নয়।
- মনে রাখুন: কারো মৃত্যু কামনা করা আপনার কষ্ট কমাবে না; বরং আপনার আমলনামায় গুনাহ যোগ করবে। আর জালিমের হিসাব আল্লাহর কাছে; তিনি ন্যায়বিচারক।
- নিজের মানসিক সুস্থতা: যদি মানসিকভাবে খুব ডিস্টার্ব লাগে, তাহলে অভিজ্ঞ আলেম ও বিশ্বস্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন; এতে দ্বীনি ও দুনিয়াবি উভয় দিকের সমাধান হবে।
- তওবা: যদি কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কু-ধারণা পোষণ করে ফেলেন, তাহলে আল্লাহর কাছে তওবা করুন এবং ওই ব্যক্তির জন্য ক্ষমা ও কল্যাণের দুআ করুন।
সারকথা: কারো মৃত্যু কামনা করা বা মরে যাওয়ার কু-ধারণা ইচ্ছাকৃতভাবে পোষণ করা জায়েজ নয়; এটি হিংসা ও অন্তরের রোগ। তবে শুধু শয়তানি ওয়াসওয়াসা হিসেবে মনে আসা, যা আপনি অপছন্দ করেন — ইনশাআল্লাহ ক্ষমাযোগ্য। সবর, দুআ ও শরিয়তসম্মত প্রতিকারের পথ অবলম্বন করুন।