শাতিমে রাসুল সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো ধারণা না থাকলে তখন বিধান কি হবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২।শাতিমে রাসুল সাঃ নিশ্চিত বা নিশ্চিত ধারনা হয় কাউকে না বললে বা না জানালে কোনো কিছু বা কাজ না করলে গোনাহ বা ইমানে সমস্যা হবে কি?
Answer
উত্তর প্রদানে মূলনীতি:
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শানে বে-আদবী বা শাতিম (গালি দেওয়া) অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। তবে এর ফিকহি হুকুম নির্ভর করে নিয়ত ও অবস্থা (সচেতনতা, ভুল, ভ্রম) ও নিশ্চিততা-র উপর। হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাবসমূহে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
১. প্রথম প্রশ্ন: যদি শাতিমে রাসূল সাঃ হওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত না হন বা নিশ্চিত ধারণা না থাকে
উত্তর:
কোনো ব্যক্তি যদি নিজের কথা বা কাজের ব্যাপারে সন্দেহে থাকে যে, সেটি কি রাসূল ﷺ-এর শানে বে-আদবী হয়েছে কিনা – অর্থাৎ নিয়ত কী ছিল, ভুলে বা বেখেয়ালে হয়েছে কিনা – তাহলে তার উপর কোনো গুনাহ হবে না এবং তার ঈমানেও কোনো সমস্যা হবে না। কারণ ইসলামের মূলনীতি:
"لا يكلف الله نفسا إلا وسعها"
"আল্লাহ কারও ওপর তার সামর্থ্যের বেশি দায়িত্ব চাপান না।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)
"الْمُسْلِمُ بِخَيْرٍ عَلَى نَفْسِهِ حَتَّى يَتَبَيَّنَ"
"মুসলিম নিজের সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখবে যতক্ষণ না বিপরীত প্রমাণিত হয়।" (আল-ইমামুল মুসলিম, হাদীস: ২৬৪৪)
হানাফি ফিকহের নির্দেশনা:
- রদ্দুল মুহতার (৬/৪১২) : “যদি কেউ ভুলে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন কথা বলে যা কুফরি মনে হয়, তাহলে তা কুফর গণ্য হবে না, যতক্ষণ না তার অন্তর সেটির সাথে একমত হয় এবং ইচ্ছাকৃতভাবে বলে।”
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (২/২৯৩) : “কোনো ব্যক্তি যদি নিশ্চিত না হয় যে সে গালি দিয়েছে, তাহলে তার ঈমান বহাল থাকবে।”
এখন প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশ: “কাউকে না বললে বা না জানালে কোনো কিছু বা কাজ না করলে গুনাহ বা ঈমানে সমস্যা হবে কি?”
- উত্তর: না। বরং গুনাহ বা কুফরি সন্দেহ হলে তা গোপন রাখাই উত্তম। হাদীসে এসেছে:
"كُلُّ أُمَّتِي مُعَافًى إِلَّا الْمُجَاهِرِينَ"
“আমার উম্মতের প্রত্যেককেই ক্ষমা করা হবে, তবে যে প্রকাশ্যে পাপ করে (তা নিয়ে বড়াই করে) সে ছাড়া।” (সহীহ বুখারী: ৬০৬৯)
সুতরাং, যদি সন্দেহ থাকে, তবে তওবা করবেন, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবেন, কিন্তু নিজেকে কাফের বা গুনাহগার ভেবে দুশ্চিন্তা করবেন না। মানুষের কাছে বলা বা প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই।
২. দ্বিতীয় প্রশ্ন: যদি নিশ্চিত বা নিশ্চিত ধারণা হয় যে শাতিমে রাসূল হয়েছে
উত্তর:
যদি কোনো ব্যক্তি নিশ্চিত জানে বা প্রবল ধারণা রাখে যে, সে ইচ্ছাকৃতভাবে এবং সচেতনভাবে রাসূল ﷺ-এর শানে বে-আদবী বা গালি দিয়ে ফেলেছে, তাহলে তা কুফর (ঈমান বহির্ভূত) হবে – এমনকি সে কাউকে না বললেও বা কাজ না করলেও।
হানাফি ফিকহের নির্দেশনা:
- রদ্দুল মুহতার (৪/২২৭) : “যে ব্যক্তি রাসূল ﷺ-কে গালি দেয়, সে কাফের হয়ে যায়। ইচ্ছা ও জ্ঞানের শর্ত আবশ্যক।”
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২৪০) : “নিশ্চিতভাবে শাতিমে রাসূল হওয়া মানে ঈমান থেকে বের হয়ে যাওয়া। এর জন্য তওবা ও পুনরায় কালেমা পড়া আবশ্যক।”
এখন প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশ: “কাউকে না বললে বা না জানালে কোনো কিছু বা কাজ না করলে গুনাহ বা ঈমানে সমস্যা হবে কি?”
- উত্তর: এই অবস্থায় কাউকে না বললেও সমস্যা হবে, কারণ কুফর একটি অন্তর ও জিহ্বার কাজ। এটা প্রকাশ করা বা না করার ওপর নির্ভর করে না। যদি ব্যক্তি এই নিশ্চিত অবস্থায় তওবা ও ঈমান পুনঃস্থাপন না করে, তবে সে মৃত্যু পর্যন্ত কাফের থাকবে। তবে গোপন রাখার কারণে বাড়তি কোনো গুনাহ নেই; বরং তাকে গোপনে তওবা ও শাহাদা পুনর্ব্যক্ত করতে হবে। কিন্তু যদি তওবা না করে মারা যায়, তাহলে চিরস্থায়ী জাহান্নাম। সুতরাং দেরি না করে তওবা করাই একমাত্র পথ।
প্রমাণ:
فَإِنْ تَابَا وَأَصْلَحَا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ
“অতএব তারা যদি তওবা করে এবং সংশোধন করে নেয়, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।” (সূরা তওবা: ১০৪)
সতর্কতা:
- কেউ যদি শুধু ধারণা করে যে সে গালি দিয়েছে, কিন্তু নিশ্চিত না হয়, তাহলে প্রথম প্রশ্নের হুকুম প্রযোজ্য – তাকে কাফের মনে করা যাবে না।
- নিশ্চিত হলেও আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়ে অবিলম্বে তওবা-ইস্তিগফার ও কালেমা পুনরায় পাঠ করবেন।
সারসংক্ষেপ:
১. সন্দেহ বা অনিশ্চয়তা থাকলে → কোনো গুনাহ বা ঈমানের সমস্যা নেই, গোপন রাখাই ভালো, শুধু তওবা করবেন।
২. নিশ্চিতভাবে ইচ্ছাকৃত শাতিম হলে → তা কুফর; কাউকে না জানালেও ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেরি না করে গোপনে তওবা ও শাহাদা পুনরায় বলা আবশ্যক।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দিন।
والله أعلم بالصواب
গ্রন্থপঞ্জি:
- রদ্দুল মুহতার (৪/২২৭, ৬/৪১২)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (২/২৯৩)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২৪০)
- বাহিশতি জেওর (বাব: কুফরি কালেমা)
- মাআরিফুল কুরআন (সূরা তওবা: ১০৪)
- সহীহ বুখারী (হাদীস: ৬০৬৯)