ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে আয়োজিত ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে ইসলামী বিধান অনুযায়ী নিম্নে উত্তর প্রদান করা হলো—
প্রশ্নের সারমর্ম: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত একটি ক্যালিগ্রাফি আর্ট প্রতিযোগিতায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নাম বা তার সাথে সম্পর্কিত বিষয়বস্তু নিয়ে ক্যালিগ্রাফি করে অংশগ্রহণ করা যাবে কি না এবং এতে অংশগ্রহণ করলে গুনাহ হবে কি না।
ইসলামী বিধান ও বিশ্লেষণ
১. ক্যালিগ্রাফি বা চিত্রকলার বিধান: ইসলামে প্রাণীবিশিষ্ট ছবি আঁকা বা তৈরি করা হারাম। তবে প্রাণীবিশিষ্ট ছবি ব্যতীত অন্য কিছু (যেমন: ফুল, লতা-পাতা, জ্যামিতিক নকশা, আরবি ক্যালিগ্রাফি ইত্যাদি) আঁকা বা তৈরি করা জায়েয। আরবি ক্যালিগ্রাফি বা হাতের লেখা (খুশনবিশি) একটি সম্মানিত শিল্প এবং এটি জায়েয।
২. নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নাম বা বাণী লিখে ক্যালিগ্রাফি করা: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নাম, দরূদ বা তার পবিত্র বাণী (হাদিস) লিখে ক্যালিগ্রাফি করা জায়েয এবং এটি একটি সওয়াবের কাজও হতে পারে, যদি তা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে করা হয়। তবে শর্ত হলো, সেখানে এমন কিছু থাকবে না যা শরীয়তসম্মত নয়।
৩. প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের বিধান: ইসলামে এমন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা জায়েয, যেখানে শরীয়তসম্মত বিষয় থাকে এবং কোনো প্রকার হারাম বা সন্দেহজনক কাজ না থাকে। যেহেতু ক্যালিগ্রাফি প্রতিযোগিতাটি নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নাম বা তার শিক্ষা নিয়ে, তাই এটি শরীয়তসম্মত। তবে কিছু বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি:
- ক) ছবি বা ভাস্কর্য: যদি কোনো প্রতিযোগী নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কোনো শারীরিক ছবি বা ভাস্কর্য তৈরি করে, তবে তা সম্পূর্ণ হারাম এবং কুফরি পর্যায়ের কাজ। কারণ নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কোনো শারীরিক ছবি বা ভাস্কর্য তৈরি করা জায়েয নয় এবং এটি ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
- খ) নাম বা বাণী: শুধুমাত্র নাম, দরূদ বা হাদিসের বাণী লিখে ক্যালিগ্রাফি করলে তা জায়েয।
- গ) বিজয়ী নির্বাচন: বিজয়ী নির্বাচন যদি বিচারকদের মাধ্যমে হয় এবং তাতে কোনো প্রকার ঘুষ, সুদ বা অন্যায় না থাকে, তবে তা জায়েয।
৪. গুনাহ হবে কি না: আপনি যদি শুধুমাত্র নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নাম, দরূদ বা তার শিক্ষা নিয়ে ক্যালিগ্রাফি করেন এবং তাতে কোনো প্রকার শারীরিক ছবি বা ভাস্কর্য না থাকে, তবে ইনশাআল্লাহ এতে কোনো গুনাহ হবে না। বরং এটি একটি ভালো কাজ হতে পারে, কারণ এর মাধ্যমে মানুষের মাঝে নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়ে।
তবে যদি প্রতিযোগিতার নিয়মে এমন কিছু থাকে যা শরীয়তসম্মত নয় (যেমন: নবীজির ছবি আঁকা বা ভাস্কর্য তৈরি করা), তবে সেখানে অংশগ্রহণ করা জায়েয হবে না এবং গুনাহ হবে।
হানাফি ফিকহের কিতাবের আলোকে দলিল:
১. প্রাণীবিশিষ্ট ছবি হারাম:
- সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: "যে ব্যক্তি ছবি আঁকে, তাকে কিয়ামতের দিন শাস্তি দেওয়া হবে এবং বলা হবে, তুমি যা সৃষ্টি করেছ, তাতে প্রাণ দাও।" (সহীহ বুখারী: ২১০৫, সহীহ মুসলিম: ২১০৮)
- ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৬৫০) এ উল্লেখ করেছেন যে, প্রাণীবিশিষ্ট ছবি তৈরি করা হারাম। তবে প্রাণীবিহীন ছবি (যেমন: গাছ, ফুল, নদী ইত্যাদি) জায়েয।
২. ক্যালিগ্রাফি বা খুশনবিশি জায়েয:
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩২৬) তে উল্লেখ আছে যে, দেয়ালে কুরআনের আয়াত বা দরূদ লেখা জায়েয।
- ফাতাওয়া উসমানি (খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৮০) তে উল্লেখ আছে যে, আরবি ক্যালিগ্রাফি একটি সম্মানিত শিল্প এবং তা জায়েয।
৩. নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নাম লিখে সম্মান করা:
- ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ (খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ২৯০) তে উল্লেখ আছে যে, নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নাম লিখে তা সম্মানের সাথে রাখা জায়েয এবং এতে সওয়াব রয়েছে।
৪. প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ:
- ফাতাওয়া উসমানি (খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৪৫) তে উল্লেখ আছে যে, এমন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা জায়েয, যেখানে শরীয়তসম্মত বিষয় থাকে এবং কোনো হারাম কাজ না থাকে।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
- শুধুমাত্র নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নাম, দরূদ বা হাদিসের বাণী লিখে ক্যালিগ্রাফি করা জায়েয এবং এতে অংশগ্রহণ করা যাবে।
- তবে যদি প্রতিযোগিতায় নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কোনো শারীরিক ছবি বা ভাস্কর্য তৈরি করতে বলা হয়, তবে তা হারাম এবং সেখানে অংশগ্রহণ করা যাবে না।
- আপনি যদি শুধুমাত্র নাম বা বাণী লিখে অংশগ্রহণ করেন, তবে ইনশাআল্লাহ গুনাহ হবে না।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। (আমিন)