উমরাহর নিয়তে মীকাত অতিক্রম করার পর ইহরাম না বাঁধলে কী করণীয়?
Hajj and Umrah · Hanafi
Question
আমি সৌদি আরবের দাম্মামে থাকি। আমি হানাফি মাজহাব অনুসরণ করি। আমার একটি উমরাহ-সংক্রান্ত মাসআলা জানতে চাই।
আমি দাম্মাম থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সময়ই পাকা নিয়ত করেছিলাম যে আমি উমরাহ করব। কিন্তু আমি জানতাম না যে মীকাত অতিক্রম করার আগে ইহরাম করতে হয়। এছাড়া দীর্ঘ ভ্রমণের কারণে শরীর খুব ক্লান্ত ছিল।
আমরা মীকাত অতিক্রম করে মক্কায় চলে যাই এবং মক্কায় গিয়ে প্রথমে ঘুমাই। এরপর ঘুম থেকে উঠে মসজিদে আয়েশা (তানঈম) যাই। সেখানে গিয়ে ইহরাম পরিধান করে উমরাহর নিয়ত করি এবং পরে মক্কায় ফিরে উমরাহ সম্পন্ন করি।
আমার প্রশ্ন:
১. আমার উমরাহ কি সহিহ হয়েছে?
২. মীকাত অতিক্রম করার সময় আমার উমরাহ করার নিয়ত থাকা সত্ত্বেও ইহরাম না করার কারণে কি আমার ওপর দম ওয়াজিব হয়েছে?
৩. আমি জানতাম না যে মীকাত থেকে ইহরাম করতে হয়—এই অজ্ঞতার কারণে কি দমের হুকুম পরিবর্তিত হবে?
৪. যদি দম ওয়াজিব হয়ে থাকে, তাহলে আমার আর্থিক অবস্থা হলো: হাতে প্রায় ৬০,০০০ বাংলাদেশি টাকা আছে, কিন্তু আমার প্রায় ৩–৪ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে এবং পরিবারের নিয়মিত প্রয়োজনীয় খরচও এই টাকা থেকেই চালাতে হয়। প্রায় ১৯,০০০ টাকা দিয়ে দমের পশু কিনলে পরিবার চালাতে আমার সমস্যা হবে। এই অবস্থায় কি আমাকে এখনই দম দিতে হবে, নাকি আগে ঋণ ও পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে পারব?
৫. এই দমের পরিবর্তে কি কোনো অবস্থায় ১০টি রোজা রাখা যাবে?
দয়া করে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী আমার নির্দিষ্ট অবস্থার বিস্তারিত হুকুম জানাবেন।
জাযাকাল্লাহু খাইরান।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো:
১. আপনার উমরাহ সহিহ হয়েছে কি? হ্যাঁ, আপনার উমরাহ সহিহ হয়েছে। যেহেতু আপনি তানঈম (মসজিদে আয়েশা) গিয়ে সেখান থেকে ইহরাম বেঁধে উমরাহ সম্পন্ন করেছেন, তাই আপনার উমরাহের আমলটি আদায় হয়ে গেছে। তবে মীকাত অতিক্রম করার পর ইহরাম বাঁধার কারণে আপনার উপর দম (জরিমানা) ওয়াজিব হয়েছে। (রদ্দুল মুহতার, ২/৪৮৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৫৬)
২. মীকাত অতিক্রমের সময় ইহরাম না করার কারণে দম ওয়াজিব হয়েছে কি? জ্বী, আপনার উপর দম ওয়াজিব হয়েছে। কারণ, মীকাত অতিক্রম করার সময় আপনার উমরাহ করার নিয়ত ছিল। মীকাতের আগে ইহরাম না বেঁধে মীকাত অতিক্রম করা এবং পরে মক্কার ভেতরে (তানঈম) গিয়ে ইহরাম বাঁধা—এটি তরকে ওয়াজিব (ওয়াজিব পরিত্যাগ) করার শামিল। এর কারণে একটি দম (একটি গরু বা সাতটি ভাগের একটি অংশ বা একটি বকরী) ওয়াজিব হয়। (আল-হিদায়া, ১/১৬০; ফাতাওয়া উসমানি, ২/২৮০)
৩. অজ্ঞতার কারণে দমের হুকুম পরিবর্তিত হবে কি? না, অজ্ঞতা দমের হুকুম পরিবর্তন করবে না। শুধুমাত্র জবরদস্তি, ভুলে যাওয়া বা অজ্ঞতা—এই তিনটি কারণে যদি কেউ মীকাতের আগে ইহরাম না বাঁধে, তবুও দম ওয়াজিব হয়ে যায়। কেননা, মীকাতের আগে ইহরাম বাঁধা একটি ওয়াজিব, আর ওয়াজিব ত্যাগ করলে দম ওয়াজিব হয়। অজ্ঞতা এই ক্ষেত্রে ওজর হিসেবে গণ্য হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে, ২/১৮৮; ফাতাওয়া উসমানি, ২/২৮১)
৪. ঋণ ও পরিবারের খরচের কারণে দম দিতে বিলম্ব করা যাবে কি? আপনার আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে বলা যায়, আপনার হাতে ৬০,০০০ টাকা আছে এবং ৩-৪ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, ঋণ পরিশোধ করা ফরজ এবং তা দমের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদি দম দেওয়ার কারণে আপনার পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ ব্যাহত হয় এবং ঋণ পরিশোধে সমস্যা হয়, তাহলে আপনি ঋণ ও পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর দম আদায় করতে পারবেন। তবে দম আদায় করা আপনার জিম্মায় থাকবে এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আদায় করা উচিত। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৫৬; রদ্দুল মুহতার, ৩/৪০৫)
৫. দমের পরিবর্তে ১০টি রোজা রাখা যাবে কি? না, হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, মীকাত অতিক্রম করার কারণে যে দম ওয়াজিব হয়, তার পরিবর্তে রোজা রাখার কোনো সুযোগ নেই। এটি শুধুমাত্র পশু কুরবানি দিয়েই আদায় করতে হবে। তবে যদি আপনার কাছে পশু কেনার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে আপনি যতক্ষণ পর্যন্ত সামর্থ্য না হচ্ছে, ততক্ষণ দম আপনার জিম্মায় থাকবে। যখনই সামর্থ্য হবে, তখনই আদায় করবেন। (সূরা বাকারা: ১৯৬; রদ্দুল মুহতার, ২/৪৮৫)
সারসংক্ষেপ:
- আপনার উমরাহ সহিহ হয়েছে।
- মীকাত অতিক্রমের কারণে আপনার উপর একটি দম ওয়াজিব হয়েছে।
- অজ্ঞতা দমের হুকুম পরিবর্তন করবে না।
- ঋণ ও পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর দম আদায় করতে পারেন।
- দমের পরিবর্তে রোজা রাখার সুযোগ নেই।
আপনার করণীয়: আপনি যখনই আর্থিকভাবে সক্ষম হবেন, তখনই একটি বকরী বা গরুর সাত ভাগের এক ভাগ কুরবানি করে দম আদায় করুন। এটি মক্কায় গিয়ে আদায় করা উত্তম, তবে নিজ দেশেও আদায় করা যাবে। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/২৮২)
রেফারেন্সসমূহ:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ২/৪৮৪-৪৮৫
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৫৬
- আল-হিদায়া, ১/১৬০
- ফাতাওয়া উসমানি, ২/২৮০-২৮২
- বাদায়েউস সানায়ে, ২/১৮৮