বিবাহের জন্য পাত্রী দেখা ও অনলাইনে দেখা সম্পর্কে ইসলামি নির্দেশনা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
প্রশ্ন একঃ আমি আমার বিবাহের জন্য একজন পাত্রীকে দেখতে যাই, পাত্রীকে প্রথম দেখায় আমার খুব বেশি ভালো লাগেনি, তাই কৌতুহলবশত আমার মনে হচ্ছে যে আরেকবার একটু দেখে নেই, এখন তাদের সাথে আমাদের দূরত্ব অনেক, তাই আমি চাচ্ছি পাত্রীকে আবার একটু দেখতে কিন্তু সেটা অনলাইনে কারণ আমার দূরত্ব অনেক বেশি। এখন অনলাইনে পাত্রীকে দেখতে পারব কিনা ভিডিও কলে?
প্রশ্ন দুইঃ যে পাত্রীকে আমি দেখতে গিয়েছি, তাকে আমার প্রথম দেখায় ভালো লাগেনি! এখন ওই পাত্রীকে কি বিবাহ করা ঠিক হবে আমার জন্য?
Answer
বিবাহের জন্য পাত্রী দেখা ও অনলাইনে দেখা সম্পর্কে ইসলামি নির্দেশনা
প্রশ্ন ১: অনলাইনে (ভিডিও কলে) পাত্রী দেখা যাবে কি?
উত্তর:
ইসলামি শরিয়তে বিবাহের উদ্দেশ্যে পাত্রী দেখা বৈধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীর বিবাহের প্রস্তাব দেওয়ার ইচ্ছা করে, তখন সে যদি তার থেকে এমন কিছু দেখতে পারে যা তাকে বিবাহে উৎসাহিত করে, তবে সে যেন তা করে।" (আবু দাউদ: ২০৮২, মিশকাত: ৩০৯০)
তবে এই দেখার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত রয়েছে:
১. শুধুমাত্র বিবাহের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য দেখা:
- দেখার উদ্দেশ্য হতে হবে শুধুমাত্র বিবাহের সিদ্ধান্ত নেওয়া, অন্য কোনো কামনা-বাসনা নয়।
২. মাহরামের উপস্থিতি:
- দেখা করার সময় পাত্রীর মাহরাম (যেমন: বাবা, ভাই) উপস্থিত থাকা আবশ্যক। খালাতো বা দূরত্বের কোনো স্থানে একান্তে দেখা জায়েজ নয়।
৩. প্রয়োজনীয় অংশ দেখা:
- শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী শুধুমাত্র মুখমণ্ডল ও হাতের কব্জি পর্যন্ত দেখা যাবে।
৪. অনলাইনে ভিডিও কলে দেখা:
- হানাফি ফিকহের আলোকে, ভিডিও কলে পাত্রী দেখা সেই একই নিয়মের অধীন। যদি পাত্রীর মাহরামের উপস্থিতিতে এবং শুধুমাত্র বিবাহের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ভিডিও কলে দেখা হয়, তবে তা জায়েজ হওয়ার অবকাশ রয়েছে। তবে একান্তে (প্রাইভেট) ভিডিও কলে কথা বলা বা দেখা জায়েজ নয়।
মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন: "ভিডিও কলে পাত্রী দেখা যদি বিবাহের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য হয় এবং পাত্রীর পক্ষ থেকে কোনো মাহরাম উপস্থিত থাকে, তবে তা জায়েজ হওয়ার অবকাশ আছে। কিন্তু একান্তে ভিডিও কলে কথা বলা বা দেখা জায়েজ নয়।"
তবে সতর্কতা: ভিডিও কলে দেখা সরাসরি দেখার মতো নয়। এতে ফিতনার আশঙ্কা বেশি থাকে। তাই উত্তম হলো সরাসরি দেখা বা মাহরামের মাধ্যমে ছবি দেখা। যদি সরাসরি দেখা সম্ভব না হয়, তবে মাহরামের উপস্থিতিতে ভিডিও কলে দেখা যেতে পারে, তবে অবশ্যই পর্দা ও শালীনতা বজায় রেখে।
প্রশ্ন ২: প্রথম দেখায় ভালো না লাগলে সেই পাত্রীকে বিবাহ করা ঠিক হবে কি?
উত্তর:
প্রথম দেখায় ভালো না লাগার অর্থ এই নয় যে, সে পাত্রী হিসেবে খারাপ বা বিবাহের অযোগ্য। ইসলামি দৃষ্টিতে বিবাহের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত:
১. দ্বীনদারি (ধর্মপরায়ণতা): রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"নারীর সাথে চারটি বিষয়ের কারণে বিবাহ করা হয়: তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য এবং তার দ্বীন। তুমি দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও, তোমার হাত ধুলাময় হোক।" (বুখারি: ৫০৯০, মুসলিম: ১৪৬৬)
২. চরিত্র ও আখলাক: সুন্দর চেহারার চেয়ে উত্তম চরিত্র ও নৈতিকতা বিবাহের স্থায়িত্বের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
৩. সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইস্তিখারা: বিবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইস্তিখারা করা সুন্নত। আল্লাহর কাছে হেদায়েত চাওয়া উচিত।
৪. প্রথম দেখায় ভালো না লাগার কারণ বিশ্লেষণ:
- প্রথম দেখায় ভালো না লাগার কারণ কী? সেটি বিশ্লেষণ করা উচিত।
- যদি কারণটি শারীরিক সৌন্দর্য হয়, তবে মনে রাখতে হবে সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু চরিত্র স্থায়ী।
- অনেক সময় প্রথম দেখায় ভালো না লাগলেও পরে ভালো লাগতে পারে। আবার প্রথম দেখায় ভালো লাগলেও পরে সমস্যা হতে পারে।
৫. দ্বিতীয়বার দেখার সুযোগ: প্রথম দেখায় ভালো না লাগলে দ্বিতীয়বার দেখার সুযোগ নেওয়া যেতে পারে, যাতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। তবে তা অবশ্যই শরিয়তের নিয়ম মেনে।
৬. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: বিবাহের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধুমাত্র চেহারা দেখে নয়, বরং দ্বীনদারি, চরিত্র, পারিবারিক পরিবেশ, শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত। যদি পাত্রী দ্বীনদার ও ভালো চরিত্রের হয়, তবে প্রথম দেখায় ভালো না লাগলেও বিবাহ করা যেতে পারে। কারণ বিবাহের মূল উদ্দেশ্য সৌন্দর্য নয়, বরং একটি সুন্দর ও দ্বীনি জীবনযাপন।
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন: "বিবাহের ক্ষেত্রে সৌন্দর্যের চেয়ে দ্বীনদারি ও চরিত্রকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। কারণ সৌন্দর্য বার্ধক্যে হারিয়ে যায়, কিন্তু চরিত্র ও দ্বীনদারি স্থায়ী থাকে।"
সারসংক্ষেপ:
১. বিবাহের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য পাত্রী দেখা জায়েজ, তবে তা হতে হবে মাহরামের উপস্থিতিতে এবং শালীনতা বজায় রেখে।
২. ভিডিও কলে দেখা জায়েজ হওয়ার অবকাশ আছে যদি তা বিবাহের পাকা সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য হয় এবং পাত্রীর মাহরাম উপস্থিত থাকে। তবে একান্তে ভিডিও কলে কথা বলা জায়েজ নয়।
৩. প্রথম দেখায় ভালো না লাগলে দ্বিতীয়বার দেখতে পারেন, তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দ্বীনদারি ও চরিত্রকে প্রাধান্য দিন।
৪. বিবাহের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইস্তিখারা করুন এবং আল্লাহর কাছে হেদায়েত চান।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
দলিলসমূহ:
- আবু দাউদ: ২০৮২ (পাত্রী দেখার অনুমতি)
- বুখারি: ৫০৯০ (বিবাহের ক্ষেত্রে দ্বীনদারির গুরুত্ব)
- রদ্দুল মুহতার: ৩/৬৭ (পাত্রী দেখার শর্তাবলি)
- ফাতাওয়া উসমানি: ২/৪৫২ (ভিডিও কলে পাত্রী দেখা)