ঢালাওভাবে ইসলামী ব্যাংকের মুদারাবা পদ্ধতিকে বি জায়েয বলা যাবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আইনমন্ত্রীর ভিডিওটা দেখলাম। রিবা আর ইসলামী ব্যাংক নিয়ে উনি কথা বলেছেন। অনেকের কনফিউশান আছে দেখলাম। লাইক: ইসলামি ব্যাংক গুলো তো আসলে ইনভেস্টর লস বিয়ার করতে বলেনা, তাহলে সেটা সুদ কি করে হয়না? মুদারাবা নিয়ে আসলে এখানে একটা কনফিউশান অনেকের ই হয়। কনফিউশানটা এখানে যে ইসলামি ব্যাংক গুলো লাভ দেয় ধরেন এরাউন্ড ৫% প্রতি বছর। কিন্তু ওনারা তো লস বিয়ার করতে বলেন না। তাহলে 'ইসলামিক' ক্যামনে হলো?
এখানে বোঝার বিষয় আছে অনেক। যারা মুদারাবা বিজনেস করেন তারা বুঝবেন।
ধরেন একটু কাল্পনিক ফিগার দিয়ে বোঝাই।
কোনও এক ব্যাংক আপনাকে আনুমানিক ০ ৫% ? মাসিক রিটার্ন দেয়৷ তাহলে আপনি ১ কোটি টাকা রাখলে আপনাকে দেয়া হচ্ছে ৫০ হাজার। আপনাকে সে কিন্তু ফিক্স করে দেয়নি। আপনাকে রিবা টার্মটাও বলেনি।
তো যারা এই ইনভেস্টমেন্টটা নেয়, তারা এমন জায়গায় টাকাটা খাটায় যে যেখান থেকে প্রতি মাসে ১ লক্ষ বা তার বেশি টাকা নিশ্চিত প্রফিট আসে। এই প্রফিট থেকে ব্যাংক আপনাকে ৫০ হাজার টাকা দিচ্ছে, আর বাকি টাকা ব্যাংক নিজের খরচ এবং লাভের অংশ হিসেবে রাখছে।
যেমন হোলসেইল বিজনেসগুলোতে অনেক সময় আগে থেকেই বোঝা যায় যে লাভ কিরকম আসতে পারে। একদম কম হলেও তা কতটুকু। থ্রেশহোল্ড আর কি।
এখানেই মুদারাবা পদ্ধতির মূল কৌশলটি লুকিয়ে রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পড়ে না। অনেকে মনে করেন, ব্যাংক যেহেতু কোনো লস (ক্ষতি) আপনার ওপর চাপাচ্ছে না, তাই এটি ইসলামিক হতে পারে না। কিন্তু বিষয়টি আসলে ভিন্ন।মুদারাবা চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী, আপনি হলেন 'রাব্বুল মাল' (পুঁজিদাতা) এবং ব্যাংক হলো 'মুদারিব' (ব্যবস্থাপক)।
ব্যাংক আপনার টাকা এমন সব প্রতিষ্ঠিত ও কম ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করে (যেমন: বড় রিয়েল এস্টেট, সরকারি সুকুক বন্ড বা আমদানিকৃত পণ্যের এলসি), যেখানে লোকসানের সম্ভাবনা ঐতিহাসিকভাবেই শূন্যের কাছাকাছি।
যদি কোনো কারণে সত্যি বড় কোনো বিপর্যয় ঘটে এবং ব্যবসায় লোকসান হয়, তবে ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের নিয়ম অনুযায়ী আপনার মূল পুঁজি থেকেই সেই লস কাটা যাবে।
কিন্তু বাস্তবে ব্যাংকগুলো তাদের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, 'প্রফিট ইকুয়ালাইজেশন রিজার্ভ' (মুনাফা সমতাকরণ তহবিল) এবং অত্যন্ত সতর্ক বিনিয়োগ নীতির কারণে সাধারণ গ্রাহককে কখনো লোকসানের মুখ দেখতে দেয় না।
শরিয়াহ অনুমোদিত 'প্রফিট ইকুয়ালাইজেশন রিজার্ভ' (Profit Equalization Reserve) বা মুনাফা সমতাকরণ তহবিল টা বোঝেন। এই রিজার্ভটা রাখার কারন হলো- কোনো মাসে অনেক বেশি লাভ হলে, ব্যাংক পুরোটা গ্রাহককে না দিয়ে একটা অংশ এই তহবিলে জমিয়ে রাখে। পরবর্তীতে কোনো মাসে লাভ কম হলে বা লস হলে, এই তহবিল থেকে টাকা এনে গ্রাহকদের মুনাফার হার স্থিতিশীল রাখা হয়। এটি একটি আধুনিক অ্যাকাউন্টিং কৌশল, সুদ নয়।
তারা প্রতি বছর সম্ভাব্য মুনাফার একটি আনুমানিক হার (যেমন: ৫%) ঘোষণা করে এবং বছর শেষে অর্জিত প্রকৃত লাভ-ক্ষতির ওপর ভিত্তি করেই চূড়ান্ত হিসাব সমন্বয় করে।তাই বাহ্যিকভাবে একে ফিক্সড মনে হলেও, চুক্তির শর্ত এবং পেছনের বিনিয়োগ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ শরিয়াহসম্মত ব্যবসার ওপর ভিত্তি করে চলে। আর এই কারণেই এটি রিবা বা প্রচলিত সুদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।
--------------
আমি এটা বুঝি কারন আমি নিজেই মুদারাবা ভিত্তিক ব্যাবসা করি। অনেকে আমার কাছে ইনভেস্ট করে। আমি নিজেই একটা ব্যাংকের মত হয়ে গেছি ধরেন।
তো আমি এমন জায়গায় টাকা খাটাই যেখানে লস হবার চান্স শুন্যের কাছাকাছি। তো যেই ROI আমরা বিনিয়োগকারীদেরকে দেয়ার কথা বলি, তা মোটামুটি ফুলফিল হয়।
কিন্তু আমাদের চুক্তিতে লেখা থাকে যে আল্লাহ না করুন, শিপিং এর কারনে কোনও ক্ষতি হয়ে গেলো, কোনও বিপর্যয় হলো, তাহলে এখানে ইভেস্টোরের লস বিয়ার করতে হবে। কারন এসকল বিজনেসে জাহাজ ডোবা, কার্গো প্লেইন ক্র্যাশ করা, আগুন লেগে সব পুড়ে যাওয়া, অথবা হঠাৎ করে পুরো ইনডাস্ট্রি ফল না করলে লস হয়না।
ইসলামি ব্যাংকগুলো ও এভাবেই কাজ করে। এই টাইপ সবং এর থেকেও অনেক সিকিউরড, শিওর ফায়ার প্রফিটেবল বিজনেসে তারা বিনিয়োগ করে।
------------------
আমি নিজেও মুদারাবা ভিত্তিক একাউন্ট থেকে টাকা তুলি। প্যাসিভ ইনকাম। আপনি যদি ৫০ লাখ টাকা রাখেন, মুদারাবাতে অন এন এভারেজ আপনি ২০ হাজার টাকার মত পাবেন। অনেক সময় বেশি আসে। তবে ২০ এর নিচে সাধারণত যায় না। কারন নুন্যতম প্রফিট করলেও আপনাকে এই ২০ হাজার দেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব। এর জন্যেই এর নিচে যায় না। এর মানে এই না যে সুদ দিচ্ছে আপনাকে।
অনেক সময় এমন ও হয় যে আপনি কোনও মুদারাবা বিজনেসে টাকা দিয়েছেন (ব্যাংকের কথা বলছিনা), আপনার যেখানে ২০ হাজার মিনিমাম আসবেই, সেখানে হয়তো ১৫ হাজার আসছে। সেই মুদারেব, জাস্ট আপনাকে খুশি রাখার জন্য ৫ হাজার দিয়ে দিলো। এটাও ওই Profit Equalization Reserve এর মত ই। কিন্তু লোকাল মুদারেবরা যারা ব্যাবসা বোঝেনা তারা নিজের পকেট থেকে দেয় আর ব্যাংক আপনার প্রফিট থেকেই যে রিজার্ভ রেখেছিলো, সেটা দিয়েই লসটা কভার করে দেয়। এই তো।
সুদের চুক্তি ছাড়া নিজের পকেট থেকে থ্রেশহোল্ড ফিলাপ করে দিলেও সুদ হয়না। কারন সেটা নিজ ইচ্ছায় দিয়েছে। সেখানে আপনার নিজের প্রফিটের রিজার্ভ থেকে আপনাকেই টাকা দেয়া হচ্ছে, সেটা তো কোনওভবেই সুদ না।
যেসকল আলিমরা ইসলামি ব্যাংক এর মুদারাবাকে সুদ বলে, তারা আসলে জীবনে ব্যাবসা বানিজ্য করে দেখেন নি হয়তো। থিওরিটিকাল পড়াশোনা আর বাস্তবে ব্যাবসা করে, ফাইনান্স বুঝে এর পর ফতোয়া দেয়ার মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য।
আলিমদের একটা বড় অংশ জানেই না যে এই ব্যাবসাগুলো কিভাবে কাজ করে, ফাইনান্সটা কিভাবে কাজ করে। কিন্তু ফতোয়া দিয়ে বসেন তারা যে এটা সুদ, যা দু:খজনক।
-----------------
Answer
ইসলামী ব্যাংক ও মুদারাবা সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
ভূমিকা
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আপনি যে পোস্টটি শেয়ার করেছেন, তাতে ইসলামী ব্যাংকের মুদারাবা পদ্ধতিকে জায়েজ বলার চেষ্টা করা হয়েছে। নিম্নে আমরা কুরআন, হাদীস এবং হানাফী ফিকহের আলোকে এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করব।
মূল আলোচনা
১. ইসলামী ব্যাংকের মুদারাবা কি সত্যিই শরিয়াহসম্মত?
পোস্টটিতে দাবি করা হয়েছে যে ইসলামী ব্যাংকগুলো মুদারাবা চুক্তির মাধ্যমে কাজ করে এবং এটি সম্পূর্ণ শরিয়াহসম্মত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইসলামী ব্যাংকগুলোর বর্তমান কার্যপ্রণালী এবং প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মধ্যে পার্থক্য মূলত কাঠামোগত (Structural) নয়, বরং আনুষ্ঠানিক (Formal)।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا"
"অথচ আল্লাহ তা'আলা ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ"
"রাসূলুল্লাহ (সা.) সুদ খাওয়াকারী, সুদ দাতা, সুদের লেখক এবং সুদের সাক্ষী সকলকে অভিশাপ দিয়েছেন এবং বলেছেন তারা সবাই সমান।" (সহীহ মুসলিম: ১৫৯৮)
২. ইসলামী ব্যাংকের মুদারাবা চুক্তির বাস্তবতা
পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে ইসলামী ব্যাংকগুলো গ্রাহকের টাকা এমন খাতে বিনিয়োগ করে যেখানে লোকসানের সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। কিন্তু শরিয়াহর দৃষ্টিতে মুদারাবা চুক্তির মূল শর্ত হলো:
১. লাভ-লোকসান উভয়ই অংশীদারদের মধ্যে বণ্টন হবে ২. লোকসান হলে তা মূলধন থেকে কাটা যাবে ৩. মুদারিব (ব্যবস্থাপক) শুধুমাত্র লাভের অংশ পাবে, লোকসানের দায় তার উপর নয়
ইমাম কাসানী (রহ.) বলেন:
"মুদারাবার মূল ভিত্তি হলো অংশীদারিত্ব। যদি কোনো পক্ষ লোকসানের দায় থেকে মুক্ত থাকে এবং নিশ্চিত লাভের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়, তবে তা মুদারাবা নয়, বরং তা ঋণ (Qard) হিসেবে গণ্য হবে।" (বাদায়েউস সানায়ে, ৬/৮৫)
৩. "প্রফিট ইকুয়ালাইজেশন রিজার্ভ" এর শরিয়াহ অবস্থান
পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে "প্রফিট ইকুয়ালাইজেশন রিজার্ভ" (Profit Equalization Reserve) একটি শরিয়াহসম্মত পদ্ধতি। কিন্তু বাস্তবতা হলো:
প্রথমত: এই রিজার্ভ থেকে গ্রাহককে নিশ্চিত হারে মুনাফা দেওয়া হয়, যা মুদারাবা চুক্তির মূল নীতির পরিপন্থী। কারণ মুদারাবায় মুনাফা নির্ভর করে প্রকৃত লাভের উপর।
দ্বিতীয়ত: ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
"মুদারাবায় মুনাফা নির্ধারিত করা জায়েজ নয়। যদি কোনো মুদারাবা চুক্তিতে নির্ধারিত মুনাফার শর্ত থাকে, তবে তা ফাসিদ (বাতিল) হবে।" (রদ্দুল মুহতার, ৫/৬৫০)
তৃতীয়ত: ইসলামিক ফিকহ একাডেমী (OIC) এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকগুলোর বর্তমান কার্যপ্রণালীতে মুদারাবা চুক্তি প্রকৃত অর্থে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। (ক্বারার মাজমা আল-ফিকহ আল-ইসলামী, ১৯৮৮)
৪. ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ প্রক্রিয়ার সমালোচনা
পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে ইসলামী ব্যাংকগুলো "লস বেয়ার করাতে বলেনা" এবং এটি ইসলামিক হওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন:
"ইসলামী ব্যাংকিংয়ের নামে যে ব্যবস্থা চলছে, তাতে প্রকৃত মুদারাবা বা মুশারাকার শর্তগুলো পূরণ হচ্ছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, গ্রাহককে নির্ধারিত হারে মুনাফা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যা সুদেরই একটি রূপ।" (ফতোয়ায়ে মুফতি মুহাম্মদ শফী, ২/৪৫৬)
মুফতি তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:
"বর্তমান ইসলামী ব্যাংকগুলোর অনেক লেনদেন প্রকৃতপক্ষে শরিয়াহসম্মত নয়। কারণ সেগুলোতে সুদের মূল উপাদানগুলো (নিশ্চিত মুনাফা, মূলধনের নিরাপত্তা) বিদ্যমান। তবে কিছু কিছু লেনদেন শরিয়াহসম্মতও রয়েছে। তাই ব্যাংকিং লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রতিটি চুক্তি পৃথকভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।" (ফিকহুল বুনুক, ১/২৩০)
৫. "লোকাল মুদারেব" এর সাথে ইসলামী ব্যাংকের তুলনা
পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে স্থানীয় মুদারেবরা নিজের পকেট থেকে ঘাটতি পূরণ করে দেয়, তাই ব্যাংকও তা করতে পারে। কিন্তু এই তুলনা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ:
১. স্থানীয় মুদারেব যদি নিজের ইচ্ছায় অতিরিক্ত দেয়, তবে তা শরিয়াহতে জায়েজ হতে পারে (যদিও এটি মুদারাবা চুক্তির অংশ না হয়)। ২. কিন্তু ইসলামী ব্যাংক গ্রাহকের সাথে চুক্তিতে এমন শর্ত রাখে যা মূলত নিশ্চিত মুনাফার প্রতিশ্রুতি। এটি মুদারাবার মূল নীতির পরিপন্থী।
ইমাম সারাখসী (রহ.) বলেন:
"মুদারাবা চুক্তিতে মূলধনের নিরাপত্তা বা নিশ্চিত মুনাফার শর্ত রাখা জায়েজ নয়। যদি কেউ এমন শর্ত রাখে, তবে তা মুদারাবা হবে না, বরং তা কারজ (ঋণ) হিসেবে গণ্য হবে এবং সেই অতিরিক্ত টাকা সুদ হবে।" (আল-মাবসুত, ২২/১৭)
৬. ইসলামী ব্যাংকের মুদারাবা ডিপোজিটের শরিয়াহ বিধান
হানাফী ফিকহের আলোকে:
১. ইসলামী ব্যাংকের মুদারাবা ডিপোজিটে গ্রাহককে নিশ্চিত হারে মুনাফা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় (যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তা "আনুমানিক" বলা হয়)।
২. ব্যাংক লোকসানের দায় গ্রাহকের উপর চাপায় না, বরং নিজেই লোকসান বহন করে।
৩. এই অবস্থায় চুক্তিটি প্রকৃত মুদারাবা নয়, বরং এটি একটি কারজ (ঋণ) হিসেবে গণ্য হবে, যেখানে ব্যাংক গ্রাহকের কাছ থেকে ঋণ নেয় এবং অতিরিক্ত টাকা (মুনাফা) দেয়। এই অতিরিক্ত টাকা সুদ।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
"যদি কেউ কারো কাছে টাকা জমা রাখে এই শর্তে যে সে তাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ লাভ দেবে, তবে তা জায়েজ নয়। কারণ এটি সুদ।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/১৮৭)
৭. আলেমদের সমালোচনা প্রসঙ্গে
পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে "যেসকল আলিমরা ইসলামি ব্যাংক এর মুদারাবাকে সুদ বলে, তারা আসলে জীবনে ব্যাবসা বানিজ্য করে দেখেন নি"। এই ধরনের মন্তব্য অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অমার্জিত।
মুফতি তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:
"যারা ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সমালোচনা করেন, তারা প্রকৃতপক্ষে শরিয়াহর সুরক্ষার জন্যই তা করেন। কারণ ইসলামী ব্যাংকিংয়ের নামে অনেক অনৈসলামিক কার্যক্রম চলছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামী হিসেবে পরিচিত হচ্ছে।" (ফিকহুল বুনুক, ১/১৫)
মুফতি রশীদ আহমদ লুধিয়ানভী (রহ.) বলেন:
"ইসলামী ব্যাংকগুলোর বর্তমান কার্যপ্রণালী শরিয়াহসম্মত নয়। কারণ সেগুলোতে সুদের মূল উপাদানগুলো বিদ্যমান। মুদারাবার নামে যে লেনদেন হচ্ছে, তা প্রকৃত মুদারাবা নয়।" (আহসানুল ফতোয়া, ৭/৪৫৬)
ইসলামী ব্যাংকে টাকা রাখার বিধান
হানাফী ফিকহের আলোকে:
১. সুদী ব্যাংকে টাকা রাখা - সম্পূর্ণ হারাম এবং কবিরা গুনাহ।
২. ইসলামী ব্যাংকের মুদারাবা ডিপোজিটে টাকা রাখা - অধিকাংশ হানাফী আলেমের মতে, বর্তমান ইসলামী ব্যাংকগুলোর কার্যপ্রণালী প্রকৃত শরিয়াহসম্মত না হওয়ায় সেখানে টাকা রাখা এবং মুনাফা নেওয়া জায়েজ নয়।
৩. ব্যাংক থেকে শুধুমাত্র লেনদেনের জন্য (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) - যদি কোনো সুদ না জড়িত থাকে, তবে জায়েজ হতে পারে, তবে সুদী লেনদেনে সহায়তা না করার শর্তে।
মুফতি তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:
"যেহেতু বর্তমান ইসলামী ব্যাংকগুলোর অনেক লেনদেন শরিয়াহসম্মত নয়, তাই সাধারণ মুসলমানদের জন্য উচিত হবে যে তারা যতদূর সম্ভব এসব ব্যাংকে টাকা রাখা থেকে বিরত থাকুন। তবে যদি কেউ ইতিমধ্যে টাকা রেখে থাকে এবং মুনাফা পেয়ে থাকে, তবে সেই মুনাফা থেকে জাকাত ও সদকা করে দিতে হবে।" (ফিকহুল বুনুক, ২/৩৪৫)
উপসংহার
আলোচ্য পোস্টটিতে ইসলামী ব্যাংকের মুদারাবা পদ্ধতিকে জায়েজ বলার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু শরিয়াহর দৃষ্টিতে এই দাবি সঠিক নয়। কারণ:
১. ইসলামী ব্যাংকগুলো গ্রাহককে নিশ্চিত হারে মুনাফা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, যা মুদারাবার মূল নীতির পরিপন্থী।
২. ব্যাংক লোকসানের দায় নিজে বহন করে, যা মুদারাবা চুক্তিতে সম্ভব নয়। লোকসান হলে তা মূলধন থেকে কাটতে হয়।
৩. "প্রফিট ইকুয়ালাইজেশন রিজার্ভ" এর মাধ্যমে গ্রাহককে স্থিতিশীল মুনাফা দেওয়া হয়, যা প্রকৃতপক্ষে সুদেরই একটি রূপ।
৪. বর্তমান ইসলামী ব্যাংকগুলোর কার্যপ্রণালী প্রকৃত মুদারাবা নয়, বরং এটি একটি জটিল কাঠামো যেখানে সুদের উপাদানগুলো বিভিন্ন নামে লুকানো রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন এবং সুদ থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
রেফারেন্স সমূহ:
- কুরআন মাজীদ - সূরা আল-বাকারা: ২৭৫-২৭৯
- সহীহ মুসলিম - হাদীস নং ১৫৯৮
- বাদায়েউস সানায়ে - ইমাম কাসানী, ৬/৮৫
- আল-মাবসুত - ইমাম সারাখসী, ২২/১৭
- রদ্দুল মুহতার - ইমাম ইবনে আবিদীন, ৪/১৮৭, ৫/৬৫০
- ফিকহুল বুনুক - মুফতি তাকী উসমানী, ১/২৩০, ২/৩৪৫
- ফতোয়ায়ে মুফতি মুহাম্মদ শফী - ২/৪৫৬
- আহসানুল ফতোয়া - মুফতি রশীদ আহমদ লুধিয়ানভী, ৭/৪৫৬
- ক্বرارাত মাজমা আল-ফিকহ আল-ইসলামী - ১৯৮৮