তিলওয়াতের সর্বনিম্ন আওয়াজ কতটুকু হওয়া চাইঁ?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
আমার প্রশ্ন হচ্ছে, তিলওয়াতের সময় সর্বনিম্ন আওয়াজ কতটুকু হওয়া চাই? যেরকম আমরা শুনেছি তাকবিরে তাহরিমা এমন আওয়াজে পড়তে হবে যেনো নিজের কান পর্যন্ত তা পৌছায়। তাহলে নামাজে বাকী তিলওয়াত কেমন আওয়াজে থাকবে? আওয়াজ বেশি হলে পাশের নামাজিদের অসুবিধে হয়। অথবা এমন অবস্থা থাকবে কি যে শুধু মুখ থেকে বাতাশ বের হবে, কোন শব্দ হবে না? ইউটিউবে একটা ভিডিওতে দেখেছিলাম, তিনি বলেছিলেন শুধু ডাবিং করার সময় যেরকম মুখ নড়ানো হয় সেরকম করলেও নামাজ হবে।
অথবা নামাজের বাইরে নফল তিলওয়াতের সময় শুধু মুখের দ্বারা বাতাশ বের করে তিলওয়াত করলে তিলওয়াতের সোয়াব পাওয়া যাবে?
নামাজ ও নামাজের বাইরে উভয় ক্ষেত্রে কতটুকু আওয়াজ করাই লাগবে বা মুখের হরকত কেমন হবে তা জানানোর জন্য অনুরোধ করছি।
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। তিলওয়াতের সময় সর্বনিম্ন আওয়াজ কতটুকু হওয়া উচিত এবং নামাজের ভিতরে ও বাইরে এর বিধান কী—এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছি।
নামাজের ভিতরে কিরাতের (তিলওয়াতের) বিধান:
হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, নামাজের ভিতরে কিরাত (কুরআন তিলাওয়াত) এমন আওয়াজে পড়তে হবে যাতে নিজের কান পর্যন্ত শব্দ পৌঁছায়। শুধু মুখ না নাড়িয়ে বা শুধু মনে মনে পড়লে নামাজ শুদ্ধ হবে না। কারণ, কিরাত হচ্ছে এমন উচ্চারণ যা অক্ষরগুলোকে তার মাখরাজ (উচ্চারণস্থল) থেকে সঠিকভাবে উচ্চারণ করা এবং তাতে শব্দ সৃষ্টি করা।
তবে, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজের কানে শব্দ পৌঁছানোর অর্থ এই নয় যে, জোরে আওয়াজ করতে হবে। বরং এর অর্থ হলো, শব্দগুলো এমনভাবে উচ্চারণ করতে হবে যেন তা শ্রবণযোগ্য হয়—অর্থাৎ, অক্ষরগুলোর উচ্চারণ স্পষ্ট হয় এবং নিজের কানে তা পৌঁছায়। এটি সাধারণত "আহওয়াত" বা "সিররি" (নিম্নস্বরে) পড়ার পর্যায়ে হয়ে থাকে।
আপনি ইউটিউবে যে ভিডিওটি দেখেছেন, যেখানে বলা হয়েছে শুধু মুখ নাড়ালেই নামাজ হবে—এটি সঠিক নয় এবং এটি একটি ভুল ধারণা। শুধু মুখের নড়াচড়া করলে বা নিঃশব্দে অক্ষরগুলো মনে মনে উচ্চারণ করলে কিরাত আদায় হয় না, ফলে নামাজ শুদ্ধ হবে না।
রদ্দুল মুহতার (আল-হিদায়া)-এর ব্যাখ্যায় উল্লেখ আছে:
"পড়ার অর্থ হলো অক্ষরগুলোকে তার মাখরাজ থেকে উচ্চারণ করা, যাতে শ্রবণযোগ্য শব্দ সৃষ্টি হয়। শুধু মনে মনে পড়া বা মুখ নাড়ানো যথেষ্ট নয়।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৪৫৪)
ফতোয়ায়ে হিন্দিয়াতেও বলা হয়েছে:
"নামাজে কিরাত এমনভাবে পড়তে হবে যেন নিজের কানে শব্দ পৌঁছায়। এর চেয়ে কম (অর্থাৎ শুধু মনে মনে) পড়লে নামাজ জায়েজ হবে না।" (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, ১/৭২)
নামাজের বাইরে তিলওয়াতের বিধান:
নামাজের বাইরে (নফল তিলওয়াত বা সাধারণ কুরআন পড়া) শুধু মুখের দ্বারা বাতাস বের করে বা নিঃশব্দে তিলাওয়াত করলে কি সওয়াব পাওয়া যাবে?
এক্ষেত্রে মূল কথা হলো, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পাওয়ার জন্য শব্দগুলো সঠিকভাবে উচ্চারণ করা শর্ত। তবে, নামাজের বাইরে তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে বিধান কিছুটা সহজ। যদি কেউ নিঃশব্দে বা খুব আস্তে কুরআন পড়ে, যেখানে শুধু নিজে শুনতে পায়, তাতেও তিলাওয়াতের সওয়াব পাওয়া যাবে। কিন্তু শুধু মুখ নাড়িয়ে বা মনে মনে পড়লে সেটি তিলাওয়াত হিসেবে গণ্য হবে না, বরং তা হবে "নজর করা" বা দেখা। তাই সওয়াবের ক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নামাজের বাইরে তিলাওয়াতের সময়ও অন্তত নিজের কানে শব্দ পৌঁছানো উচিত, যাতে উচ্চারণ সঠিক হয়। তবে, নামাজের বাইরে কেউ যদি খুব আস্তে পড়ে, যাতে তার নিজের কান ছাড়া আর কেউ না শোনে, তাতেও তিলাওয়াতের সওয়াব পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ।
পাশের নামাজিদের অসুবিধা প্রসঙ্গে:
আপনি উল্লেখ করেছেন, আওয়াজ বেশি হলে পাশের নামাজিদের অসুবিধা হয়। এটি একটি সঠিক উদ্বেগ। নামাজের ভিতরে কিরাত এমনভাবে পড়া উচিত নয় যাতে পাশের মুসল্লিদের মনোযোগ নষ্ট হয়। ইমামের পিছনে মুক্তাদির জন্য নীরবে পড়া এবং নিজের কিরাত নিজে শোনা সুন্নত। তবে, একাকী নামাজ পড়ার সময়ও খুব জোরে আওয়াজ করা মাকরূহ (অপছন্দনীয়) যদি অন্য কাউকে কষ্ট দেয়। তাই, সর্বদা মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা উচিত—যেন নিজের কানে শব্দ পৌঁছায় এবং উচ্চারণ স্পষ্ট হয়, কিন্তু অন্যদের বিরক্ত না করে।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
১. নামাজের ভিতরে: কিরাত এমন আওয়াজে পড়তে হবে যেন নিজের কানে শব্দ পৌঁছায়। শুধু মুখ নাড়ানো বা মনে মনে পড়া যথেষ্ট নয়। তবে, এত জোরে পড়াও জরুরি নয় যে পাশের লোক শুনতে পায়। সাধারণ নিম্নস্বরে (যা নিজে শোনা যায়) পড়লেই হবে।
২. নামাজের বাইরে: তিলাওয়াতের সওয়াব পাওয়ার জন্য শব্দগুলো সঠিকভাবে উচ্চারণ করা জরুরি। নিঃশব্দে বা শুধু মুখ নাড়ালে পূর্ণ সওয়াব পাওয়া যাবে না। তবে, খুব আস্তে পড়লেও (নিজে শুনতে পেলে) সওয়াব পাওয়া যাবে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।