সেমি লেন্থ খিমার পরে পর্দা

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 4847
Questioner: Monira Nisaa
Question Asked: 03 Sep 2026, 12:29 AM
Reviewed & Published: 03 Sep 2026, 02:39 AM
Views: 10
Tokens: 5,272
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ।
১.ঘরে পরার জামা পায়জামার উপর হাটু পর্যন্ত লম্বা হিজাব, নিকাব ও পা মোজা পরে নন-মাহরামের সামনে যাওয়া যাবে? এক্ষেত্রে হাটুর নিচ থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত অংশটুকু ঘরে পরার পায়জামা বেরিয়ে থাকে। যদি পায়জামা ঢোলাঢালা হয় এবং উজ্জ্বল রঙের না হয় তাহলে এভাবে হাটু পর্যন্ত হিজাব পরলে কি পরিপূর্ণ পর্দা হবে?
২. হাতের তালু খোলা রাখলে অর্থাৎ হাত মোজা না পরলে কি গুনাহ হবে?

Answer

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করে নেওয়া প্রয়োজন—পর্দার ক্ষেত্রে শরীয়তের মূলনীতি কী। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا "আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া।" (সূরা আন-নূর: ৩১)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেয়ীনদের থেকে প্রমাণিত, "মা যাহারা মিনহা" (যা সাধারণত প্রকাশ পায়) বলতে চেহারা ও হাতের তালু পর্যন্ত বুঝানো হয়েছে। ইমাম আবু বকর আল-জাসসাস (রহ.) তাঁর 'আহকামুল কুরআন'-এ এবং ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) 'রাদ্দুল মুহতার'-এ এই মতই গ্রহণ করেছেন।

তবে হানাফী মাযহাবের বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ মত হলো—ফিতনা/ফাসাদের ভয় থাকলে চেহারা ও হাতের তালু ঢাকাও ওয়াজিব। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:

وَفِي زَمَانِنَا صَارَ الْعَوْرَةُ مِنَ الْمَرْأَةِ الْحُرَّةِ وَجْهُهَا وَكَفَّاهَا لِكَثْرَةِ الْفَسَادِ "আমাদের সময়ে (ফাসাদের আধিক্যের কারণে) স্বাধীন নারীর চেহারা ও হাতের তালুও সতরের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে।" (রাদ্দুল মুহতার, ৬:৩৭০)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ "হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ ও মুমিনদের নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়।" (সূরা আল-আহযাব: ৫৯)

এই আয়াতের তাফসীরে মুফাসসিরীনগণ বলেন, নারীরা যেন এমনভাবে চাদর/ওড়না পরিধান করে যাতে তাদের সমস্ত শরীর এমনকি চেহারাও ঢাকা পড়ে যায়, যখন তারা ঘর থেকে বের হয়। (তাফসীরে মা'আরিফুল কুরআন, ৭:৭৪৮)


১. হাঁটু পর্যন্ত লম্বা হিজাব পরে নন-মাহরামের সামনে যাওয়া

আপনার প্রশ্নের প্রথম অংশের উত্তর হলো—হাঁটু পর্যন্ত লম্বা হিজাব, নিকাব ও পা মোজা পরে নন-মাহরামের সামনে যাওয়া যাবে কি না, তা নির্ভর করবে নিম্নবর্ণিত শর্তগুলোর উপর:

ক. নিম্নাংশ ঢাকা থাকতে হবে: আপনি বলেছেন, হাঁটুর নিচ থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত অংশটুকু ঘরে পরার পায়জামা বেরিয়ে থাকে। যদি সেই পায়জামা ঢোলাঢালা (আলগা) হয় এবং এমন পুরু কাপড়ের হয় যাতে শরীরের গঠন (পায়ের নল, গোড়ালি ইত্যাদি) বোঝা না যায়, এবং উজ্জ্বল/আকর্ষণীয় রঙের না হয়, তাহলে তা দ্বারা পর্দা আদায় হবে ইনশাআল্লাহ। কারণ শরীয়তে পর্দার মূল শর্ত হলো—শরীরের গঠন ও সৌন্দর্য প্রকাশ না পাওয়া এবং আকর্ষণীয় না হওয়া।

তবে যদি পায়জামাটি আঁটসাঁট হয় বা শরীরের গঠন প্রকাশ করে, অথবা উজ্জ্বল রঙের হয় যা দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তাহলে তা দ্বারা পর্দা আদায় হবে না। হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا... وَنِسَاءٌ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيلَاتٌ مَائِلَاتٌ "দুই শ্রেণীর মানুষ জাহান্নামী, যাদেরকে আমি দেখিনি... (তাদের মধ্যে এক শ্রেণী হলো) এমন নারী যারা বস্ত্র পরিহিত কিন্তু উলঙ্গ (অর্থাৎ এমন পাতলা/আঁটসাঁট পোশাক পরে যে শরীর প্রকাশ পায়), এবং (চলার ভঙ্গিতে) অন্যদেরকে আকর্ষণ করে ও নিজেও আকর্ষণীয়।" (সহীহ মুসলিম: ২১২৮)

খ. হিজাবের দৈর্ঘ্য: হাঁটু পর্যন্ত লম্বা হিজাব পরা জায়েয আছে, তবে উত্তম হলো পূর্ণ শরীর ঢাকা। হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ 'ফাতাওয়া আলমগীরী'-তে আছে:

وَالْمَرْأَةُ الْحُرَّةُ إذَا خَرَجَتْ لِحَاجَةٍ تَجْتَزِئُ بِثَوْبٍ سَاتِرٍ لِجَمِيعِ بَدَنِهَا "স্বাধীন নারী যখন প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হয়, তখন তার জন্য এমন পোশাক যথেষ্ট যা তার সমস্ত শরীর ঢেকে রাখে।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫:৩২৮)

সুতরাং মূল বিষয় হলো—সমস্ত শরীর ঢাকা থাকা। হিজাব হাঁটু পর্যন্ত হলেও যদি নিচের পায়জামা দ্বারা বাকি অংশ (হাঁটুর নিচ থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত) এমনভাবে ঢাকা থাকে যে শরীরের কোনো অংশ প্রকাশ পায় না এবং আকর্ষণীয় না হয়, তাহলে পর্দা আদায় হবে।

গ. নিকাব ও পা মোজা: নিকাব (চেহারা ঢাকা) এবং পা মোজা পরা অত্যন্ত উত্তম ও সতর্কতামূলক কাজ। বর্তমান যুগে ফিতনার আধিক্যের কারণে হানাফী মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী চেহারা ও হাতের তালু ঢাকাও ওয়াজিব। তাই নিকাব ও পা মোজা পরা আপনার জন্য খুবই উত্তম।

ঘ. "ঘরে পরার জামা" প্রসঙ্গে: আপনি উল্লেখ করেছেন যে, এটি "ঘরে পরার জামা পায়জামা"। ঘরের পোশাক সাধারণত হালকা ও পাতলা হয়ে থাকে। যদি সেই পায়জামা পাতলা হয় এবং শরীরের গঠন প্রকাশ করে, তাহলে তা দিয়ে পর্দা হবে না। তাই বাইরে যাওয়ার সময় এমন পোশাক পরা উচিত যা মোটা ও পূর্ণাঙ্গভাবে শরীর ঢাকে।


২. হাতের তালু খোলা রাখলে কি গুনাহ হবে?

হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী—নারীদের জন্য চেহারা ও হাতের তালু (কব্জি পর্যন্ত) সতরের অন্তর্ভুক্ত নয়, অর্থাৎ এগুলো খোলা রাখা জায়েয, যদি ফিতনার আশঙ্কা না থাকে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, নারীর পা দু'টিও সতরের অন্তর্ভুক্ত নয়, তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে পা সতরের অন্তর্ভুক্ত। (বাদায়েউস সানায়ে, ২:৩৩০)

তবে বর্তমান যুগে ফিতনার ব্যাপক প্রসারের কারণে ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.)-এর উদ্ধৃত মত অনুযায়ী—চেহারা ও হাতের তালুও সতরের অন্তর্ভুক্ত গণ্য হবে। তিনি বলেন:

أَشَدُّ مَا يَجِبُ عَلَى الْمَرْأَةِ سَتْرُهُ فِي الصَّلَاةِ وَعَنْ الْأَجَانِبِ عَوْرَتُهَا وَهِيَ جَمِيعُ بَدَنِهَا حَتَّى وَجْهَهَا وَكَفَّيْهَا عَلَى الْمُعْتَمَدِ "নারীকে যা ঢাকতে হবে—সালাতে ও বেগানা পুরুষের সামনে—তা হলো তার সমস্ত শরীর, এমনকি চেহারা ও হাতের তালুও—এটিই মু'তামাদ (বিশুদ্ধ) মত।" (রাদ্দুল মুহতার, ২:৮৮)

তবে এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়—ইবনে আবিদিন (রহ.)-এর এই উক্তিটি মূলত সালাতের প্রসঙ্গে, তবে তিনি ফিতনার যুগে পর্দার ক্ষেত্রেও একই হুকুম প্রয়োগ করেছেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি:

وَفِي زَمَانِنَا صَارَ الْعَوْرَةُ مِنَ الْمَرْأَةِ الْحُرَّةِ وَجْهُهَا وَكَفَّاهَا لِكَثْرَةِ الْفَسَادِ "আমাদের সময়ে স্বাধীন নারীর চেহারা ও হাতের তালুও সতরের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে—ফাসাদের আধিক্যের কারণে।" (রাদ্দুল মুহতার, ৬:৩৭০)

সুতরাং আপনার প্রশ্নের উত্তরে বলব:

বর্তমান যুগে ফিতনার ব্যাপক প্রসারের কারণে এবং নন-মাহরামের সামনে যাওয়ার ক্ষেত্রে হাত মোজা (গ্লাভস) পরা অত্যন্ত উত্তম ও সতর্কতামূলক কাজ। তবে যদি কেউ হাত মোজা না পরে শুধুমাত্র হাতের তালু খোলা রাখে, তাহলে তাত্ত্বিকভাবে ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে তা জায়েয, কিন্তু বর্তমান যুগের ফিতনার কারণে তা পরিত্যাগ করাই ওয়াজিবের কাছাকাছি। কারণ হাতের তালু খোলা থাকলে তা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে এবং ফিতনার কারণ হতে পারে।

মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) 'মা'আরিফুল কুরআন'-এ বলেন:

"বর্তমান যুগে নারীদের জন্য চেহারা ও হাতের তালু ঢেকে রাখা অপরিহার্য, কারণ ফিতনা ও ফাসাদ অত্যন্ত ব্যাপক হয়ে গেছে।" (মা'আরিফুল কুরআন, ৬:৪৮০)


সংক্ষিপ্ত উত্তর:

১. হ্যাঁ, যদি পায়জামাটি ঢোলাঢালা (আলগা), পুরু (যাতে শরীরের গঠন বোঝা না যায়) এবং উজ্জ্বল/আকর্ষণীয় রঙের না হয়, তাহলে হাঁটু পর্যন্ত হিজাব, নিকাব ও পা মোজা পরে নন-মাহরামের সামনে যাওয়া জায়েয হবে এবং পর্দা আদায় হবে। তবে খেয়াল রাখবেন—পায়জামাটি যেন পাতলা বা আঁটসাঁট না হয় এবং পায়ের গোড়ালির হাড় যেন স্পষ্ট না বোঝা যায়।

২. হাতের তালু খোলা রাখলে তাত্ত্বিকভাবে ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে গুনাহ হবে না, তবে বর্তমান যুগে ফিতনার কারণে হাত মোজা পরা অত্যন্ত উত্তম ও নিরাপদ। হাত মোজা না পরলে গুনাহ হবে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে ফিতনার আশঙ্কার উপর। যদি আশঙ্কা থাকে যে হাতের সৌন্দর্য দেখে কেউ কু-দৃষ্টিতে দেখতে পারে, তাহলে হাত মোজা পরা ওয়াজিব হয়ে যাবে। নিরাপদ ও পূর্ণ পর্দার জন্য হাত মোজা পরাই উত্তম।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক পর্দা পালনের তাওফীক দান করুন। আমীন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.