নামাজে কান খোঁচানো, ঘরে কাবা শরীফের ছবি থাকা অবস্থায় সতর খোলা এবং শরিয়ত সম্মত কাল্পনিক চিন্তা মুখে উচ্চারণের বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২.ঘরে ক্যালেন্ডারে কাবা শরীফের ছবি, মসজিদের ছবি বা ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি থাকলে সেখানে সবার অগোচরে কাপড় পাল্টানো, সতর খোলা রাখা বা আঁটোসাঁটো কাপড় পরা জায়েজ কি?(বি:দ্র: এই কাবা শরিফের ছবি , মসজিদের ছবি বা ক্যালিগ্ৰাফি আমি লাগাইনি)
৩. যদি কেউ মন উৎফুল্ল করতে বা ভালো লাগার জন্য শরিয়ত সম্মত কাল্পনিক চিন্তা করে এবং তা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করে তা কি জায়েয?
Answer
উত্তর
১. নামাজে কান আঙ্গুল দিয়ে খোঁচানো
নামাজে কোনো কারণে কান আঙ্গুল দিয়ে একটু খোঁচানো হলে নামাজ আদায় হবে কি না—এই বিষয়ে ইসলামি বিধান হলো:
নামাজে কান খোঁচানো বা চুলকানো যদি সামান্য হয় (একবার বা দুইবার) এবং তা এমন কাজ না হয় যা নামাজের ভঙ্গি নষ্ট করে বা নামাজ থেকে উদাসীনতা সৃষ্টি করে, তাহলে নামাজ আদায় হয়ে যাবে। তবে এটি মাকরূহ (অপছন্দনীয়) কাজ।
রদ্দুল মুহতার (রাদ্দুল মুহতার) -এ উল্লেখ আছে:
"নামাজে অপ্রয়োজনীয় কাজ করা মাকরূহ। তবে প্রয়োজনে সামান্য কাজ করলে নামাজ ফাসিদ হবে না।"
ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া (ফতোয়ায়ে আলমগিরী) -তে আছে:
"যদি কেউ নামাজে একবার বা দুইবার এমন কাজ করে যা নামাজের অন্তর্ভুক্ত নয়, তবে তা মাকরূহ; কিন্তু নামাজ ফাসিদ হবে না। তবে যদি কাজটি তিনবার বা তার বেশি হয় এবং তা এমন হয় যা দেখে মনে হয় ব্যক্তি নামাজে নেই, তাহলে নামাজ ফাসিদ হয়ে যাবে।"
সারকথা: কান আঙ্গুল দিয়ে একটু খোঁচানো যদি একবার বা দুইবার হয় এবং তা সামান্য হয়, তাহলে নামাজ আদায় হবে, তবে মাকরূহ হবে। প্রয়োজনে তা করা যেতে পারে।
২. ঘরে কাবা শরীফের ছবি, মসজিদের ছবি বা ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি থাকলে সেখানে সতর খোলা বা কাপড় পাল্টানো
প্রশ্নের উত্তর: ঘরে কাবা শরীফের ছবি, মসজিদের ছবি বা ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি থাকলে সেখানে সতর খোলা রাখা বা কাপড় পাল্টানো জায়েজ আছে কি না—এ বিষয়ে ইসলামি বিধান হলো:
মূলনীতি: ঘরে ছবি বা ক্যালিগ্রাফি থাকার কারণে ঘরটি মসজিদের মতো পবিত্র স্থান হয়ে যায় না। ঘর সাধারণ স্থানই থাকে। তাই ঘরে সতর খোলা রাখা বা কাপড় পাল্টানো জায়েজ, যদি সেখানে এমন কেউ না থাকে যে আপনাকে দেখতে পারে (অর্থাৎ মাহরাম বা স্বামী ছাড়া অন্য কেউ না থাকে)।
তবে শরীয়তের দৃষ্টিতে ঘরে কাবা শরীফের ছবি, মসজিদের ছবি বা ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি টাঙানো সম্পর্কে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়:
১. ছবি টাঙানো: ইসলামে প্রাণীবিশিষ্ট ছবি (মানুষ, পশু-পাখির ছবি) ঘরে রাখা বা টাঙানো নিষিদ্ধ (হারাম)। তবে কাবা শরীফ, মসজিদ বা ইসলামিক ক্যালিগ্রাফির ছবি প্রাণীবিশিষ্ট নয়, তাই সেগুলো টাঙানো জায়েজ। তবে এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা ভালো, কারণ অনেক আলেম মনে করেন যে, কাবা শরীফের ছবি টাঙানোও উচিত নয়, কারণ মানুষ সেগুলোকে সম্মান দেখাতে গিয়ে শিরকে লিপ্ত হতে পারে।
২. সতর খোলা: ঘরে সতর খোলা রাখা বা কাপড় পাল্টানো জায়েজ, যদি সেখানে গায়রে মাহরাম কেউ উপস্থিত না থাকে। ছবি বা ক্যালিগ্রাফির কারণে ঘরটি পবিত্র স্থান হয়ে যায় না।
ফতোয়ায়ে রহিমিয়া -তে আছে:
"ঘরে ছবি থাকার কারণে ঘরটি মসজিদের মতো পবিত্র হয় না। তাই ঘরে সতর খোলা রাখা জায়েজ, যদি গায়রে মাহরাম কেউ না থাকে। তবে ছবির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য সতর ঢেকে রাখা উত্তম।"
সারকথা: ঘরে কাবা শরীফের ছবি বা ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি থাকলেও সেখানে সতর খোলা রাখা বা কাপড় পাল্টানো জায়েজ, যদি গায়রে মাহরাম কেউ উপস্থিত না থাকে। তবে ছবির প্রতি সম্মান রেখে সতর ঢেকে রাখা উত্তম।
৩. শরিয়ত সম্মত কাল্পনিক চিন্তা করে মুখে উচ্চারণ করা
প্রশ্নের উত্তর: মন উৎফুল্ল করতে বা ভালো লাগার জন্য শরিয়ত সম্মত কাল্পনিক চিন্তা করে তা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করা জায়েজ কি না—এই বিষয়ে ইসলামি বিধান হলো:
মূলনীতি: ইসলামে চিন্তা-ভাবনা ও কল্পনা করা নিষিদ্ধ নয়, বরং ভালো চিন্তা ও কল্পনা উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে শর্ত হলো:
১. চিন্তাটি শরিয়ত সম্মত হতে হবে (অর্থাৎ গুনাহের কাজ নয়) ২. উচ্চারণটি এমন হতে হবে যা শরিয়তের পরিপন্থী নয় ৩. উচ্চারণে এমন কিছু না বলা যা কুফরি বা শিরকের পর্যায়ে পৌঁছে যায়
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তারা আল্লাহর কথা স্মরণ করে দাঁড়ানো, বসা এবং শোয়া অবস্থায় এবং চিন্তা করে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি সম্পর্কে।" (সূরা আলে ইমরান: ১৯১)
হাদিসে আছে:
"তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতের কথা চিন্তা করো।" (তিরমিজি)
ফতোয়ায়ে উসমানি -তে আছে:
"শরিয়ত সম্মত চিন্তা-ভাবনা করা এবং তা প্রকাশ করা জায়েজ। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন তা গুনাহের কাজ না হয় এবং এমন কিছু না বলা হয় যা ঈমানের পরিপন্থী।"
সারকথা: শরিয়ত সম্মত কাল্পনিক চিন্তা করে তা মুখে উচ্চারণ করা জায়েজ, যদি তা গুনাহের কাজ না হয় এবং ঈমানের পরিপন্থী কিছু না হয়। তবে খেয়াল রাখতে হবে, উচ্চারণে যেন এমন কিছু না বলা হয় যা শরিয়তের পরিপন্থী বা ঈমান নষ্টকারী।
সতর্কতা: কোনো অবস্থাতেই এমন কথা বলা যাবে না যা আল্লাহ, রাসূল বা ইসলামের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে। যদি চিন্তাটি শরিয়ত সম্মত হয় এবং উচ্চারণে কোনো সমস্যা না থাকে, তাহলে তা জায়েজ।